দুর্ভোগ: সব সড়ক বেহাল, রাস্তায় নামলেই দুর্ভোগ

সড়কজুড়ে পিচ ওঠা গর্ত। গাড়ি গেলে যেন ধুলাবালুর ঝড় ওঠে। আর বৃষ্টি হলে পানি জমে জলাবদ্ধতা। মাঝেমধ্যেই উল্টে যায় গাড়ি। মুন্সিগঞ্জ-মানিকপুর-মুক্তারপুর সড়কটির এই দশা দুই বছর ধরে।

মুন্সিগঞ্জ জেলা শহরের সঙ্গে এই সড়ক দিয়েই চার উপজেলা লৌহজং, টঙ্গিবাড়ী, সিরাজদিখান ও শ্রীনগরের যোগাযোগ। মুন্সিগঞ্জ থেকে ঢাকায় যাতায়াতের পথও এটি। এর বাইরে উপজেলাগুলোর বাকি সড়কের বিভিন্ন অংশের অবস্থাও বেহাল।

কার্পেট উঠে গিয়ে যেন মেঠোপথে পরিণত হয়েছে সড়কটি। মুন্সিগঞ্জ-মানিকপুর-মুক্তারপুর সড়কের এ ছবিটি জেলা শহরের প্রবেশমুখ জোড়পুকুর এলাকার। গতকাল বেলা চারটার দিকে তোলা ছবি

স্থানীয় সাংসদসহ জনপ্রতিনিধিরা বললেন, যাতায়াতের এই দুর্ভোগ নিয়ে প্রতিমুহূর্তে তাঁদের এলাকার মানুষের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। এর মধ্যে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার ভবেরচর থেকে রসুলপুর সড়কটি ঠিক করার জন্য সাংসদসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা একবার সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের পথ রোধ করে দাবিও জানিয়েছেন।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের (এলজিইডি) তথ্য অনুযায়ী, জেলায় তাদের অধীন সড়কের দৈর্ঘ্য ২ হাজার ২৮৩ কিলোমিটার। এর মধ্যে পাকা ৫৬৭ কিলোমিটার, ইটের রাস্তা ১৯০ কিলোমিটার। বাকি ১ হাজার ৫২৬ কিলোমিটার মাটির রাস্তা। এলজিইডির সূত্র বলছে, পাকা সড়কগুলোর মধ্যে ২২৫ কিলোমিটারের অবস্থাই খারাপ। এগুলোর জরুরি মেরামত দরকার।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) বলছে, মুন্সিগঞ্জ সড়ক বিভাগের আওতায় মোট ৩৩৪ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে ১২টি সড়কের বিভিন্ন অংশ সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এগুলো মেরামতের জন্য স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে ৫৭ কোটি টাকা প্রয়োজন।

মুন্সিগঞ্জ-মানিকপুর-মুক্তারপুর সড়কে গিয়ে দেখা যায়, মুক্তারপুরে পেট্রলপাম্প থেকে শহরের প্রবেশমুখ মানিকপুরের আলু গবেষণাকেন্দ্র পর্যন্ত তিন কিলোমিটার সড়ক এবড়োখেবড়ো। সড়কের এই অংশটি যে কখনো পিচঢালা ছিল, বোঝাই দায়। ধুলার কারণে পথচারীরা নাক চেপে হাঁটছেন। স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইফুল্লাহ ভূঁইয়া প্রথম আলোকেবলেন, ‘বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের ওই পথে চলাচল করতে হয়। জেলার একমাত্র জেনারেল হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসার জন্য এই রাস্তা দিয়ে যেতে হয়। ফলে অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ রোগীদের দুর্ভোগ হয় অনেক।’

স্থানীয় দোকাদার শরীফ আহমেদ বলেন, ‘জেলা শহরের অফিস-আদালত, ব্যাংক-বিমাসহ নানা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করতে এই রাস্তার বিকল্প নেই।’

মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনের সাংসদ মৃণাল কান্তি দাস বলেন, ‘রাস্তাটি এলজিইডির। আমি স্থানীয় সরকারমন্ত্রীকে বলেছি। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন ঠিক হয়ে যাবে।’

মুক্তারপুর সেতুর পশ্চিমে পেট্রলপাম্প থেকে সিপাহীপাড়া চৌরাস্তা হয়ে আলদীবাজার পর্যন্ত প্রায় আট কিলোমিটার সড়কের বিভিন্ন স্থানেও অসংখ্য খানাখন্দ। এলাকাবাসী জানান, এক বছর ধরে সওজের এই সড়কটি বেহাল।

মুক্তারপুর থেকে ইয়াজউদ্দিন রেসিডেনসিয়াল স্কুল পর্যন্ত এবং হাতিমারা চৌরাস্তা থেকে টঙ্গিবাড়ী উপজেলার কুন্ডেরবাজার হয়ে শ্রীনগর পর্যন্ত সড়কটিরও একই দশা। টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বলই মোড় থেকে ফজুশাহ বাজার পর্যন্ত চার কিলোমিটার সড়কে কত যে গর্ত আছে, সেই হিসাব করা দায়। কুন্ডেরবাজার থেকে আবদুল্লাহপুর হয়ে হাতিমারা পর্যন্ত সড়কের অবস্থাও করুন।

টঙ্গিবাড়ী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী ওয়াহিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা এই সড়ক দুটি মেরামতের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার বলেছি। কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়নি।’

টঙ্গিবাড়ী উপজেলার আলদী এলাকার বাসিন্দা ও সরকারি হরগঙ্গা কলেজের ছাত্র মো. ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাযোগে প্রতিদিন কলেজে যাওয়ার সময় মনে হয় এই বুঝি উল্টে পড়ে যাচ্ছি। প্রায়ই দেখি কোনো না কোনো দুর্ঘটনা ঘটছে।’

সিরাজদিখান উপজেলা পরিষদ থেকে নিমতলা পর্যন্ত আট কিলোমিটার সড়কের ইটের খোয়া উঠে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। পুরো সড়ক এখন ধুলার রাজ্য। সিরাজদিখান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রওনক আফরোজ বললেন, ‘প্রায় এক বছর ধরে সড়কটির এই হাল। এই আট কিলোমিটার সড়ক ঠিক করার জন্য জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় কয়েকবার বলা হয়েছে।’

লৌহজং উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ওসমান গনি তালুকদার বলেন, লৌহজং উপজেলা পরিষদ থেকে নওয়াপাড়া ও সিরাজদিখান হয়ে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের শ্রীনগরের তেজগাঁও পর্যন্ত সড়কটির অবস্থা খারাপ। এটি জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করা প্রয়োজন। এই সবগুলো রাস্তাই সওজের।

সওজের হিসাব অনুযায়ী, মুন্সিগঞ্জ সড়ক বিভাগের আওতায় তাদের ৩৩৪ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে একটি জাতীয়, ছয়টি আঞ্চলিক ও দশটি জেলা সড়ক। সওজের মুন্সিগঞ্জ বিভাগীয় কর্মকর্তা আবু হেনা মোহাম্মদ তারেক বলেন, ‘সাম্প্রতিক বর্ষায় ১২টি রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্বল্প মেয়াদে ১০ কোটি টাকা এবং দীর্ঘ মেয়াদে ৪৭ কোটি টাকা চেয়েছি। এই বরাদ্দ পেয়ে গেলে সড়কগুলো শতভাগ ঠিক হয়ে যাবে।’ তিনি বলেন, এই মুহূর্তে নিমতলী-সিরাজদিখান-কাকালদি, হাতিমারা-কুণ্ডেরবাজার-শ্রীনগর এবং সিপাহীপাড়া-আলদি-দীঘিরপাড়া সড়কটি ঠিক করা জরুরি।

গজারিয়া উপজেলার ভবেরচর থেকে রসুলপুর পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার সড়কের যানবাহন চলাচলই দায়। তবে এটি পড়েছে সওজের নারায়ণগঞ্জ বিভাগে। গজারিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রেফায়েত উল্লাহ খান বলেন, ‘এলাকার যার সঙ্গেই দেখা হয়, সড়কটি মেরামতের কথা বলেন। বিব্রত হতে হয়। নিরুপায় হয়ে আমরা একবার সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে অনেকটা পথ রোধ করে সমস্যাটির কথা বলেছি। মন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন সড়কটি ঠিক হবে। আমরা সেই আশায় আছি।’

শ্রীনগরের আটপাড়া ইউনিয়নের কল্লীগাঁও থেকে কুকুটিয়া পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়কে শুধু ইট বিছানো। অনেক জায়গায় ইটও নেই। তিনটেক থেকে সতেরপাড়া এলাকার আনোয়ারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি এখনো কাঁচা।

আটপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী খান বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের পাঁচটি সড়কের খুব খারাপ অবস্থা। এর মধ্যে কল্লীগাঁও থেকে কুকুটিয়া সড়কে কয়েক বছর ধরে শুধু ইট বিছিয়ে রাখা হলেও ঢালাই দেওয়া হয়নি। ফলে ইট উঠে রাস্তা আরও খারাপ হয়েছে।’

সদর উপজেলার রামসিং-চম্পাতলা-কাটাখালী, টঙ্গিবাড়ী-বলই-কালমা-ফজুশাহ বাজার, শ্রীনগরের শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. বোরহানউদ্দিন খান রোডের গোয়ালিমান্দ্রা এবং সিরাজদিখানের কুচিয়ামারা-লতাবদী-সিরাজদিখান-কুচিয়ামাড়া-লতাবদী ইউনিয়ন সড়কও বেহাল।

এলজিইডির জেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ওয়াহিদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘চলতি অর্থবছরে ১২ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছি। এই টাকা দিয়ে ৭৩ কিলোমিটার সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। আরও প্রায় ৩০ কোটি টাকা দরকার।’ শহরের প্রবেশপথের মুন্সিগঞ্জ-মুক্তারপুর-জেনারেল হাসপাতাল সড়কটির অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই রাস্তাটি সবার আগে ঠিক করা হবে।’

শরিফুল হাসান ও তানভীর হাসান
প্রথম আলো

Comments are closed.