বল্লাল সেনের দিঘি বাস্তবে নেই, ওয়েবসাইটে আছে

খালের মতো দেখতে এই জমিটি এখন বল্লাল সেনের দিঘির স্মৃতিচিহ্ন। দিঘির জায়গায় বাড়ি তুলেছেন একজন l প্রথম আলোসরকারি তথ্য বাতায়নে মুন্সিগঞ্জ জেলার অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে হাজার বছরের পুরোনো রাজা বল্লাল সেনের দিঘি বা রামপালের দিঘির নাম আছে। ঢাকা থেকে কীভাবে এই দিঘি দেখতে আসতে হবে, তারও নির্দেশনা সেখানে দেওয়া আছে। চমৎকার এই বর্ণনা পড়ে কেউ এই দিঘি দেখতে এলে ভুল করবেন। কারণ, এখানে কোনো দিঘি নেই। উল্টো দেখতে পাবেন ভরাট করা জায়গায় একাধিক ভবন।

তবে নামে দিঘি হলেও শত শত বছর ধরে পলি জমতে জমতে এটি নিচু জমিতে পরিণত হয়। ভূমি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ওই দিঘি ও দিঘি-সংলগ্ন সম্পত্তি ব্যক্তির নামে রেকর্ড করে নিয়েছে স্থানীয় একটি মহল। ১০০ বছর আগের সিএস রেকর্ডে (১৮৯০ থেকে ১৯১২) একে ব্যক্তিমালিকানায় দেখানো হলেও ঠিক কখন এই পরিবর্তন করা হয়েছে, তা খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি। প্রাকৃতিকভাবে আস্তে আস্তে দিঘিটি ভরাট হয়েছে। স্থানীয় লোকজন তাতে চাষবাস করছেন। এখন খালের মতো সরু একটি পানির ধারা দিঘিটির স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে অবশিষ্ট আছে। যাঁরা এই দিঘি ও সংলগ্ন জায়গা রেকর্ড করে নিয়েছেন, তাঁরা বিভিন্ন সময় ওই জমি বিক্রিও করছেন।

মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার রামপাল ইউনিয়নের রামপাল কলেজের দক্ষিণ পাশে বল্লাল সেন বা রামপালের দিঘি। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, রামপাল ইউনিয়নের রামপাল ও গোবিন্দপুর—এই দুটি মৌজায় প্রায় ৪৬ একর সম্পত্তির ওপর দিঘিটি ছিল। এর মধ্যে খালের মতো দেখতে মাত্র ১৪ শতাংশ জমি খাস খতিয়ানভুক্ত। বাকি জমি বিভিন্ন ব্যক্তির নামে রেকর্ড করা আছে।

কিন্তু সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেল, দিঘির পশ্চিম অংশে মাটি ফেলে দ্বিতল ভবন করা হচ্ছে। দক্ষিণ প্রান্তে ধলাগাঁও বাজার-সংলগ্ন দিঘির জমির ওপরে চলে এসেছে স্থানীয় আলু সমিতির মার্কেটসহ কয়েকটি মার্কেট। দিঘির চার পাড়ে নির্মাণ হচ্ছে ঘরবাড়ি। আগে দিঘি ছিল, এমন আরেকটি স্থানে একটি ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে।
জনশ্রুতি আছে, বল্লাল সেনের শাসনামলে এ অঞ্চলে পানির তীব্র কষ্ট দেখা দেয়। ওই সময় বল্লাল সেনের মা স্বপ্নে দেখেন, তাঁর ছেলেকে দিয়ে একটি দিঘি খনন করা হলে এই সমস্যা লাঘব হবে। কিন্তু দিঘি খনন করার পরেও দিঘিতে পানি ওঠেনি। এ সময় বল্লাল সেনের বন্ধু রামপাল স্বপ্ন দেখেন, দিঘিতে তিনি নামলে দিঘিতে পানি উঠতে পারে। এ অঞ্চলের মানুষের পানির কষ্টের কথা ভেবে রামপাল দিঘির অতলে নামেন। আর সঙ্গে সঙ্গে দিঘিতে পানি উঠতে থাকে। সেই পানি তোড় এমনই ছিল যে রামপাল দিঘি থেকে আর উঠতে পারেননি। সলিলসমাধি হয় তাঁর। বল্লাল সেন তাই দিঘির নামকরণ করেন রামপালের নামে।
আবার কেউ কেউ বলেন, এই দিঘি পাল আমলেই খনন করা হয়েছিল। পাল যুগে রামপাল ছিল এ অঞ্চলের রাজধানী। সেই থেকে এই দিঘির নামকরণ করা হয় রামপালের দিঘি।

এলাকার লোকজন জানান, সাড়ে ৩০০ বছর আগে স্থাপিত মুন্সিগঞ্জের ইদ্রাকপুর দুর্গটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ তাদের তালিকাভুক্ত করলেও ঐতিহ্যবাহী বল্লাল সেনের দিঘিটি তালিকাভুক্ত করেনি।

স্থানীয় রামপাল ইউনিয়নের দালালপাড়া এলাকার মো. সালাউদ্দিন দেড় বছর আগে দিঘির ২৬ শতাংশ জমি একই এলাকার মরণ দালালের পরিবারের কাছ থেকে কিনে নেন বলে দাবি করেন। সালাউদ্দিন এখন তাঁর ওই জমিতে বাঁশ পুঁতে মাটি ভরাট করে ভবন নির্মাণ করছেন।

কীভাবে জমি কিনলেন জানতে চাইলে মো. সালাউদ্দিন প্রথম আলোকে জানান, ‘আমি জমির আগের মালিক মৃত মরণ দালালের ছেলেদের কাছ থেকে কিনেছি।’ এই দিঘির ইতিহাস সম্পর্কে জানেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা ছোট সময় থেকে শুনে আসছি এটা বল্লাল সেনের আমলের রামপালের দিঘি। কিন্তু এসব সম্পত্তি কীভাবে ব্যক্তির নামে হলো তা বলতে পারব না।’

দিঘির ওপর একটি সাইনবোর্ডে লেখা, ক্রয়সূত্রে জমির মালিক আবদুর রহমান। জমির পরিমাণ ৩৮ শতাংশ। দিঘির জমির মালিক হলেন কীভাবে, জানতে চাইলে আবদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা গত চার বছরে কিনেছি এই জমি।’ এটি তো রাজা বল্লাল সেনের দিঘি—এই তথ্য জানালে আবদুর রহমান বলেন, ‘সিএস ও আরএস রেকর্ডে এই জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন। তাই আমরা কিনেছি।’

স্থানীয় ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে যে স্থানে স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে, তা আরএস রেকর্ড অনুসারে রামপাল ইউনিয়নের গোবিন্দপুর মৌজার ৩১৮ নম্বর দাগের অন্তর্ভুক্ত। এই দাগের সম্পত্তি মরণ দালালের নামে রেকর্ড করা আছে। মরণ দালাল ছাড়াও আরএস রেকর্ডে দিঘির সম্পত্তিতে মালিকানায় নাম রয়েছে ইসমাইল গং ৩৩ শতাংশ, পুনাই দালাল ও হাজী অখিল উদ্দিন দালাল গং ১ একর ৩ শতাংশ, কালাচান দেওয়ান ও আবদুল হাই দেওয়ান গং ১৬ শতাংশ, আবদুর রহমান ও মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল গং ৩৮ শতাংশসহ কমপক্ষে পাঁচ শতাধিক ব্যক্তির নাম।

মুন্সিগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বলেন, ‘যাঁরা দিঘির সম্পত্তি ভরাট ও দখল করেছেন, তাঁদের তালিকা করা হচ্ছে। দিঘিটি সংরক্ষণের বিষয়ে শিগগিরই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

রিকাবীবাজার ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (রামপাল ইউনিয়নের ভূমি এর নিয়ন্ত্রণে) মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘রামপালের দিঘি তো ঐতিহ্যবাহী দিঘি। কী করে এই দিঘির সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকে রেকর্ড হলো তা আমরা বলতে পারব না।’

মুন্সিগঞ্জের ভূমি কার্যালয়ের সার্ভেয়ার রেজাউল করিম বলেন, ‘বল্লাল সেনের আমল ছিল ১২০০ বা ১৪০০ বছর আগের। আর আমাদের সিএস রেকর্ড হয়েছে মাত্র ১০০ বছর আগে। সিএস রেকর্ডের সময় এগুলো ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ডভুক্ত করা হয়।’

রামপাল কলেজের অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর হাসান বলেন, ‘এই দিঘিটি আবার খননের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। ইন্টারনেট ঘেঁটে দিঘি দেখতে এসে পর্যটকেরা ফিরে যাচ্ছেন, এটা আমাদের জন্য লজ্জার।’

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ঢাকা অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক রাখি রায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা দ্রুত অধিদপ্তর থেকে দিঘিটি পরিদর্শন করে একটি প্রতিবেদন দেব। এরপর একে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

শরিফুল হাসান ও তানভীর হাসান

Comments are closed.