সিরাজদিখান এসিল্যান্ড: নিজের অবস্থানে থেকেও অনেক কিছু করা সম্ভব

সুলতানা আখতার: পরিপাটি কার্যালয়। টাইলস করা গেট।তার এক পাশে রঙ্গন, গোলাপ, কৃষ্ণচূড়া, বাগাণসহ বিভিন্ন ফুলের গাছ। প্রধান ফটকের একেবারে ডান দিকে একটি রুম। এটি সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহিনা পারভীনএর অফিস।

কার্যালয়ের বাইরে দালালের দৌরাত্ম্য। কাজ মানেই টাকা, বাড়তি টাকা। সেবাপ্রার্থীর প্রতি কর্মচারীদের অবহেলা। ভ্রুক্ষেপহীন কর্মকর্তা। দিনের পর দিন হয়রানি ভুক্তভোগীদের কাছে সারা দেশে এই হলো ভূমি কার্যালয়ের সাধারণ চিত্র। সিরাজদিখানের ভূমি অফিসও একসময় তা-ই ছিল। কিন্তু সবকিছু বদলে দিয়েছেন শাহিনা পারভীন।

অথচ ভাবতে অবাক লাগে মাত্র কিছুদিন পূর্বেও সিরাজদিখান ভূমি অফিস মানেই ভুমি মালিকদের জন্য আতঙ্ক ছিল। এখানে একটি নামজারি মানে লক্ষ টাকার খেলা ছিল। সিরাজদিখান বাজারের অবৈধ টাকা লেনদেনের বাহন মিষ্টির খালি প্যাকেট সন্কট দেখা দিত। এখন কোন খালি প্যাকেট আর আসে না ভূমি আফিসে । জমি মালিকরা অপেক্ষায় থাকত কোনদিন একজন ভাল কর্মকর্তা আসবে এ ষ্টেশনে ।তিনি এলেন জয় করলেন।

এ জয় করার জন্য তাকেও অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়েছে কেননা খ তফসিলের নামজারীর দালালী করতেন এমন কিছু ব্যক্তি তাদের চাপের মুখে এসিল্যান্ড চলেও যেতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেও ছিলেন অনেককে, “আমাকে তদবীর করে এখান থেকে সরিয়ে দিন তাহলে আপনারা সব করিতে পারবেন”

জমি মালিকদের কান্না আল্লাহ শুনেছেন যে কারণে মুন্সীগঞ্জের সফল, দক্ষ ও সৎ জেলা প্রশাসক কারও কথায় কর্ণপাত না করে এসিল্যান্ড শাহীনা পারভীনকে রেখে দেন। শুধু তাই নয় তিনি উপজেলা অফিসার্স কোয়ার্টারে থাকার ব্যবস্থা করে নেন যাতে সেবা কার্যক্রম আরও ত্বরান্বিত হয় ।

সম্প্রতি এই ভূমি কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, চত্বরে বোর্ডে নাগরিক সনদ টাঙানো। তাতে জমির নামজারি করতে কত টাকা লাগে, খতিয়ান তুলতে কত টাকা লাগে, খাসজমি বন্দোবস্ত নিতে কী করণীয়, কোন বিষয়ে কার সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করতে হবে—সব তথ্য লেখা।

কার্যালয়ের বিভিন্ন কক্ষের ওপরে কর্মচারীদের নাম, শাখার নাম, কার কাছে কোন সেবা পাওয়া যাবে—তা লেখা।

ভূমি কার্যালয়ের চিরচেনা দালাল ও জাল দলিল ও পর্চা তৈরীকারকের দল কোথায় গেল—জানতে চাইলে একজন কর্মচারী বললেন, তাঁরা এখন আর এখানে ঢুকতে পারেন না। অনেকে পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। দু-একজন এলেও বাইরে দোকানে বসে থাকেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজনকে বাইরে পাওয়াও গেল।

তিনি ক্রাইমভিশণকে বললেন, ‘কয়েক দিন আগে এসিল্যান্ড ২ জনকে জেল দিয়েছেন তাঁদের অবস্থা দেখে এই পেশাই ছেড়ে দিয়েছি।’

সিরাজদিখান ভূমি কার্যালয় সূত্র জানায়, নামজারি রিভিউ (মিস কেস) এর পাইলটিং এর আওতায় ৬ মাসের মধ্যে মিস কেস সম্পন্ন করা হয়। নতুন প্রক্রিয়ায় সেবাপ্রাথী মোবাইলে এসএমেস এর মাধ্যমে তার পরবতী শুনানীর ডেট জ়ানতে পারবে, ওয়েবসাইত এর মাধ্যমে যে কোন জায়গা থেকে মিস কেস এর আবেদন করতে পারবে, ৬ মাসের মধে তার পুরোপুরি সেবা পাবে।

গত ৮ মাসে প্রায় ১০২০ জনেরও বেশি সেবাপ্রার্থীকে প্রতিকার ও পরামর্শ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। আগের আট মাসে বিবিধ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ৬২ টি।বর্তমানে ৮ মাসে ১২০ টি মামলার নিস্পত্তি হয়েছে।

সিরাজদিখান ভূমি কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কানুনগো আবু হানিফ বলেন, আগে সেবাপ্রার্থীদের এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘুরতে হতো, কর্মচারীদেরও হাতের কাজের ক্ষতি হতো। কর্মচারীদের পরামর্শে সন্তুষ্ট না হলে শেষ পর্যন্ত তারা সহকারী কমিশনারের কাছেই যেত। এখন তারা আগেই সর্বোচ্চ কর্মকর্তা সহকারী কমিশনারের কাছে যাচ্ছে। তিনি তাৎক্ষণিক পরামর্শ দিচ্ছেন অথবা নির্দিষ্ট কর্মচারীকে ডেকে কাজটা বুঝিয়ে দিচ্ছেন। এতে কাজের গতি বেড়েছে। ঝামেলা কমেছে।
এই সময়ে সহকারী কমিশনার মতো নথি ক্রমানুসারে সাজিয়ে প্রতিটির সঙ্গে ট্যাগ লাগিয়ে দিয়েছেন। নথিগুলোকে প্রথমা, দ্বিতীয়া ও তৃতীয়া নামের তিনটি কক্ষে এমনভাবে সাজিয়েছেন, এখন যেকোনো নথি এক মিনিটের মধ্যে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। আগে একটা নথি খুঁজে বের করতেই দিন পার হয়ে যেত। নথি খোঁজার জন্য কাউকে কাউকে ‘খুশি’ করতে হতো।

ভূমি কার্যালয়ের পরিদর্শন খাতায় উপজেলার গোয়ালখালী গ্রামের খেটে খাওয়া বিধবা আনোয়ারা বেগম লিখেছেন ‘আমার জীবনে এই প্রথম বাড়তি টাকা ছাড়া অল্প সময়ে “খ” তফসিলভূক্ত জমি নামজারী করতে পারলাম সরকারী ফিসে। আমি অত্যন্ত খুশি।’ আমি দোয়া করি যেন এ রকম এসিল্যান্ড সারা দেশেই থাকে তাহলে জমির মালিকদের আর জমি বিক্রি করে নামজারী ও খাজনা দিতে হবে না ।

শাহীনা পারভীন ক্রাইমভিশণকে বললেন, জেলা প্রশাসক মহোদয়ের প্রেরণায় এই কাজটি শুরু করেছিলাম। ইতিমধ্যে সমস্ত রেজিস্টার নির্ধারিত সরকারি ফরমে লাল সালু কাপড়ে বাঁধাই করে সংরক্ষণ ও হালনাগাদ করা হয়েছে। নামজারি ও বিবিধ মামলার শুনানির তারিখ বাদী ও বিবাদীকে মোবাইলে খুদে বার্তার (এসএমএস) মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা ভূমি অফিসের একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নামজারি ও বিবিধ মামলাসহ অন্যান্য আবেদন অনলাইনে দাখিল করার সুযোগ করা হয়েছে। বিভিন্ন মামলার সর্বশেষ অবস্থাও ওয়েবসাইট থেকে জানা যাবে। জানানো যাবে যেকোনো অভিযোগ। উপজেলা ভূমি অফিসের ফেসবুক পেজেও এসি ল্যান্ডের কাছে যেকোনো সমস্যা জানানো যাবে।’ তিনি বলেন, আরেকটি বড় কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। অফিসের সামনে একটি বসার জায়গা করা হবে যেখানে সেবা গ্রহিতারা আরামে বসতে পারবে, সুপেয় পানি পান করতে পারবে। সেখানে একাটি লাইব্রেরি থাকবে যেখানে লান্ড এর বই থাকবে , যে কেউ বই পড়তে পারবে এবং এ বিষয়ে জানতে পারবে।

সিরাজদিখান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রওনক আফরোজা সোমা বলেন, এটি শাহিনা পারভীনের একটি উদ্ভাবনী উদ্যোগ। এই মডেলটাকে তিনি মুন্সীগঞ্জ জেলার সকল উপজেলায় চালু করার উদ্যোগ নিতে জেলা প্রশাসক মহোদয়কে অনুরোধ জানাবেন ।

গত ১০ সেপ্টেম্বর সিরাজদিখান ভূমি কার্যালয়ে কাজে এসেছিলেন কোচিয়ামোড়ার মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন তিনি বলেন, ‘৭০ বছরের জীবনে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই সেবা আমাকে মুগ্ধ করেছে। বাংলাদেশের জনগণ এ ধরনের সেবাই প্রত্যাশা করে।’ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করাটা কিছুটা হলেও বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে বলে আমি মনে করি ।

ক্রাইম ভিশন

Comments are closed.