মোল্লাকান্দি চরাঞ্চলে আতঙ্ক গামছা বাহিনী!

মোল্লাকান্দির এক ইউনিয়নেরই ২২ গ্রামের ৩০ হাজার মানুষ গামছা বাহিনীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। শুধু মোল্লাকান্দিই নয়, আশপাশ এলাকায়ও গামছা বাহিনী দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে। গামছা বাহিনীর দল নেতা ইউসুফ ও তার বাহিনীর কাছে খোদ ইউপি চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে সেখানকার দলীয় শীর্ষ নেতারাও তটস্থ। এই বাহিনীর দল নেতা ইউসুফ এক সময় কাতারে বোরখার ব্যবসা করতেন। ২০১০ সালে গামছা বাহিনী নামে এলাকায় তার আর্বিভাব ঘটে। গ্রামের পর গ্রামে তার সন্ত্রাসী কর্মকান্ড শুরু হয়। পাশাপাশি চলে মাদক ব্যবসা, অতপর শুরু হয় সাধারণ মানুষের জমি দখল, চাঁদাবাজি।

এ বাহিনী একসঙ্গে ১০-১৫টি মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে মাথায় হলুদ কাপড় বেঁধে গ্রামের পর গ্রাম দাবড়িয়ে আতঙ্ক সৃস্টি করছে। তাদের কোমড়ে থাকে অস্ত্র। গাছমা বাহিনীর দলনেতা ইউসুফ ফকির মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের মহেশপুর গ্রামের লাল মিয়া ফকিরের ছেলে। তাঁর বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ৩০-৪০ জন। এরমধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য তার ছোট ভাই খলিল ফকির, মিল্টন মল্লিক, জনি মল্লিক, টুন্ডা জাহাঙ্গীর, মকবুল মাঝি, রুইকা চোরা, জাহাঙ্গীর সরকার। এ সন্ত্রাসী বাহিনীর কাছ থেকে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ও প্রতিকার চেয়ে ইউনিয়নের মাকহাটি গ্রামের মৃত জয়নাল আবেদীন বেপারীর ছেলে ভুক্তভোগী নজরুল ইসলাম বেপারী গত ৬ ই অক্টোবর স্ব-রাষ্ট্র মন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন (ডাইরি নং-২৪৩)। এই অভিযোগের ভিত্তিতে স্ব-রাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল অভিযোগ যাচাই বাছাই করে পুলিশের আইজিপিকে ব্যবস্থা নিতে বলেন।

এদিকে, এই বাহিনীর দৌরাত্ম্য সদর উপজেলার মোল্লাকান্দি ছেড়ে টঙ্গীবাড়ি উপজেলার আলদিবাজার, কাঠাদিয়া, ছোট কেওয়ার, হাটখান ও লৌহজং থানার শিমুলিয়া ইউনিয়ন পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। ইউসুফের বিরুদ্ধে মুন্সীগঞ্জ সদর এবং টঙ্গীবাড়ী থানায় হত্যা ও বিস্ফোরণ মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে বলে স্ব-রাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে দায়ের করা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে, গত মাসখানেক আগে মাকহাটি হাইস্কুল সংলগ্ন মুক্তিযোদ্ধা সেন্টু ঢালীর প্রায় ৩০ শতাংশ ও গত ১৫-২০ দিন আগে আলদীবাজার ব্রিজ সংলগ্ন হামিদ গাজীর প্রায় ৩০ শতাংশ জমি দখল করে নিয়েছে ইউসুফ গং।

এ ব্যাপারে মোল্লাকান্দি ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের কোষাধ্যক্ষ ও ঢাকা মহানগর শ্রমিক লীগের সহ-সভাপতি নজরুল ইসলাম বেপারী স্ব-রাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ দায়ের করার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শাহ আলম মল্লিক ও মোল্লাকান্দি ইউপি চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা রিপন পাটোয়ারি গ্রুপের মধ্যে ঐক্যসৃস্টি করার জন্য শাহআলম মল্লিকের বাড়িতে কর্মীসভা আহবান করা হয়। কিন্তু এ কর্মীসভা ও ঐক্য ভন্ডুল করার জন্য ইউসুফ ফকির আমাকে গত ২০ শে আগস্ট মাকহাটি বাজারে প্রকাশ্যে পিস্তল ঠেকিয়ে হুমকি দিয়ে বলে হাতে চুরি পড়। আগামী এক সপ্তাহ পর তোকে গাছের সঙ্গে টাঙাবো। মোল্লাকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রিপন হোসেন পাটোয়ারি জানান, ইউসুফ ফকিরের মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধ কর্মকান্ডে মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের মানুষ এখন আতঙ্কিত।

তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় কাবাডি দলের খেলোয়ার আবুবক্কর মোল্লা (৮৫) জানান, গত ৩০ শে জুলাই মাকহাটির পশ্চিমপাড়ায় রাধা শ্যাম ঘোষের মেয়েকে উত্যক্ত করা নিয়ে বিচার সালিশ হয়। সেখানে দুই অভিযুক্তকে জুতাপেটা করা হলে ইউসুফ সালিশ বৈঠকে প্রকাশ্যে আমাকে শারীরিক ও মানুষিকভাবে নির্যাতন করে। ইউসুফ মোল্লাকান্দির জঘন্য একটা মানুষ বলে তিনি জানান।

জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শাহ আলম মল্লিক জানান, ইউসুফ বাহিনীর নামে চাঁদাবাজি, জমি দখল, এলাকার সম্মানিত লোকদের অশ্স্র দেখিয়ে ভয় দেখানো এবং তাদের মারধর করা থেকে শুরু করে নানা ধরনের শত শত অভিযোগ তার কাছে আসলেও এর কোন সমাধান দিতে পারেননি। ইউসুফ বাহিনীর কাছে গোটা ইউনিয়ন ও আশপাশ এলাকার মানুষ জিম্মি বলে তিনি জানান। এদিকে, ইউসুফ বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পাননি মাকহাটি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মরহুম নজরুল ইসলাম মোল্লার ছেলে উজ্জল ও তার পরিবার। গেল কোরবানির ঈদের পরের দিন সন্ধ্যায়, আলদি বাজারে প্রকাশ্য-দিবালোকে গাড়ি থেকে টেনে নিয়ে উজ্জলের কলেজ পড়–য়া ছেলে আসিক ১৫কে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করে এবং উজ্জলের স্ত্রীকে তুলে নিয়ে অপকর্মের হুমকিও দেয় এই বাহিনী। সদর উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নূর ইসলাম মোল্লার ছেলে লায়ন-সাংবাদিক ফজলুল হক ফিটুকে এ বাহিনী লাঞ্ছিত করে বলে ফিটু জানান। তিনি জানান, ইউসুফ বাহিনী তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে। এলাকায় তার ভাই বারডেম হসপিটালের ডা. জিয়াউল হক জুয়েল সপ্তাহে একবার ফ্রি চিকিৎসা দেবার কথা থাকলেও ইউসুফ বাহিনীর কারনে তা হয়ে উঠছে না।

মুন্সীগঞ্জ সদরের দায়িত্বপ্রাপ্ত র‌্যাব-১১’র সিপিসি-১ এএসপি শাহ্ শিবলী সাদিক জানান, ইউসুফ বাহিনীর নামে আমাদের কাছে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। এ ব্যাপারে সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. ইউনুস আলী জানান, ইউসুফের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ আমাদের কাছে পৌছলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কারও বিরুদ্ধে যে কেউ অভিযোগ দিতে পারে। তার সত্যতা আছে কিনা-তা তদন্তে জানা যাবে। বর্তমানে মোল্লাকান্দি শান্ত রয়েছে।

ওয়ান নিউজ

Comments are closed.