জাপান: ঈদ পুর্নমলিনী ২০১৫

রাহমান মনি: ত্যাগের মাধ্যমে আনন্দ সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার অন্যতম বিধান ‘ঈদুল আজহা’ ইসলামে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লিখিত। তা সত্ত্বেও প্রবাসের ব্যস্ততম দিনে এবং ভিন্ন পরিবেশে ধর্মীয় আয়োজন, আচার পালন, ইচ্ছা ও সামর্থ্য থাকার পরও অনেক সময় হয়ে ওঠে না। আর দিনটি যদি হয় কর্মদিবস তাহলে তো কোনো কথা-ই আর থাকে না। ইসলামি দেশগুলোতে প্রবাসীরা কিছুটা সুবিধা ভোগ করতে পারলেও জাপানের মতো দেশে যেখানে ধর্মীয় আচার পালনের জন্য, এমনকি মে দিবসেও কোনো সরকারি ছুটি থাকে না, সেখানে ঈদের ছুটি আশা করাটা বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। অনেকেই হয়তো পূর্ব ছুটি নিয়ে কিংবা অর্ধবেলা ছুটি ভোগ করে ঈদের নামাজটা আদায় করে থাকেন।

কিন্তু ভিন্ন পরিবেশ হলেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সংস্কৃতিপ্রিয় এবং ধর্মভীরু বাঙালি জাতি যে বসে থাকার নয় তা আরেকবার প্রমাণ করল জাপান প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে।

প্রতিবছরের মতো এবারও মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর সোসাইটি জাপান ঈদ-উত্তর এক ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ৪ অক্টোবর রোববার টোকিওর অইয়ামা বুনকা কাইকান-এ আয়োজিত ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে প্রায় অর্ধসহস্রাধিক প্রবাসী বাংলাদেশি এবং স্থানীয় জাপানিজ সুহৃদরা স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করেন। খোদ রাজধানীতে এবারের আয়োজন হওয়ায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার উৎসবমুখর অংশগ্রহণে আয়োজনস্থলটি হয়ে ওঠে এক চিলতে বাংলাদেশ।

ঈদ পুনর্মিলনী ২০১৫ আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে সস্ত্রীক উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন। পুরো অনুষ্ঠানটিকে ৩টি পর্বে ভাগ করা হয়। অনুষ্ঠান পরিচালনায় ছিলেন নাজমুল হোসেন রতন এবং জুয়েল আহসান।

প্রথম পর্বে সংগঠনের সভাপতি বাদল চাকলাদারের সভাপতিত্বে শুভেচ্ছা বক্তব্য পর্বে মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন, এশিয়ান পিপল্স ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটির (এপিএফএস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কাৎসুও ইয়োশিনারি, সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এমডি এস. ইসলাম নান্নু, বর্তমানে জাপান সফররত ব্রিটেন প্রবাসী খুররম আহমেদ এবং রাষ্ট্রদূত পতœী ফাহমিদা জাবিন সোমা।

শুভেচ্ছা বক্তব্যের শুরুতেই অতিসম্প্রতি পবিত্র হজ পালনকালে মিনাতে বহু প্রাণহানি, ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকাতে ইতালিয়ান নাগরিক তাভেল্লা সিজার এবং ৩ অক্টোবর রংপুরে জাপানিজ নাগরিক হোশি কোনিও আততায়ীর হাতে আকস্মিক মৃত্যুতে তাদের পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা এবং বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এ সময় স্থানীয় জাপানি অতিথিরাও একাত্মতা প্রকাশ করেন।

বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, ব্যবসায়িক ও আঞ্চলিক সংগঠনের প্রধানগণ ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করে বক্তব্য প্রদান করেন। জাপান সফররত অস্ট্রেলিয়ান প্রবাসী মনোয়ার মৃধা মুন্না অস্ট্রেলিয়াতে ঈদ উদযাপন তুলে ধরে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। জাপান রিক্কিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তেৎসুও মিজুকামি অতিসম্প্রতি বিক্রমপুর ভ্রমণের কথা উল্লেখ করে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার কাজে ইয়োশিনারি কাৎসুও’র সঙ্গে বাংলাদেশের বিক্রমপুর এলাকা সফরে স্থানীয়দের কাছ থেকে যে উষ্ণ আতিথেয়তা ও অভ্যর্থনা, আন্তরিকতা পেয়েছি তা ভোলার মতো নয়। কাৎসুও ইয়োশিনারি বলেন, আমি গত ২০ বছরে মোট ১৩ বার বাংলাদেশে গিয়েছি শুধু বাংলাদেশকে ভালোবাসার কারণে।

দ্বিতীয় পর্বে কোরবানির মাংসে এবং বিক্রমপুর অঞ্চলের ঈদের আমেজে হরেক রকম খাবার পরিবেশনে অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয়। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী এবং নিরামিষ ভোজীদের জন্য ব্যবস্থা রাখা হয় প্রতিবারের মতোই। বাদল চাকলাদারের নেতৃত্বে পূর্ব রাত জেগে রন্ধন কাজে অংশ নেন দেলোয়ার হোসেন, নাজমুল হোসেন রতন, আলমগীর হোসেন মিঠু, শেখ আনোয়ার হোসেন, মোল্লা অহিদুল ইসলাম, শেখ রনি লিটন, তানভীর আহমেদ, মোল্লা দেলোয়ার হোসেন, আজম খান, মাসুদ আলম, মো. টিপু হোসেন, আকতার হোসেন প্রমুখ। সহযোগিতায় ছিলেন খন্দকার আসলাম হিরা এবং মাসুম।

তৃতীয় পর্বে ঈদ ভ্যারাইটিতে প্রবাসীদের প্রিয় সাংস্কৃতিক দল স্বরলিপি এবং উত্তরণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মনোমুগ্ধ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা উপহার দেন। এছাড়াও তানভীর আহমেদ গান এবং মিল্টন কবিতা আবৃত্তি করেন। তবে পুরো আয়োজনে কৃতজ্ঞতাচিত্তে যার কথা না বললেই নয় তিনি হচ্ছেন বিক্রমপুরের বধূ কাজমি চাকলাদার। বাদল চাকলাদারের সহধর্মিণী। প্রতিবছর প্রতিটি আয়োজনেই তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে থাকেন।

rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক

Comments are closed.