মনের যন্ত্র্রনা !

আরিফ হোসেন: এইতো কাল রাতে বাবার পাতে তরকারির ঝোল ঢেলে দিতে দিতে সেলিনা বলেছিল, বাবা কত দিন একটা জামা দেওনা। দুলা ভাইরা আইবো। কাল সংসারের বাজার করতে সদরে গেলে আমি একটা জামা কিনুম।

মেয়ের কথায় প্রথমে কোন জবাব দিতে পারেনি দিন মজুর মিলন শেখ। কিন্তু মেয়ের পিড়াপিড়িতে এক সময় বলে, মা-রে জামা কিনার টেকা আমি কই থিকা দিমু?

মিলন শেখের কথার পর সেলিনা আর কোন কথা বলেনি।

মিলন শেখ খাওয়া শেষ করে উঠানে বসে একটা বিড়ি ধরায়। জোড়ে জোড়ে কয়টা টান দেওয়ার পর কিছুক্ষন বিরতি নিয়ে কাশে। আবার বিড়িতে টান দেয়। ধুয়া ছাড়তে ছাড়তে ভাবে, সংসারে এখন দুইজন মানুষ, তার পরও অভাব যায়না। দুই বছর হয় অভাবে জর্জড়িত সংসারের মায়া ছেড়ে দুনিয়া ছেড়েছেন তার স্ত্রী। এরপর দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেটাকে একটু পড়ালেখা না করালে কেমন দেখায়। আর মা মরা ছেলে সারাদিন এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়। ্এসব ভেবেই একমাত্র ছেলেকে মাদ্রাসায় দিয়েছেন। এখন সংসারে সেলিনা আর সে। মেয়েটি একদম ওর মায়ের মতো হয়েছে। না খেয়ে থাকবে কিন্তু কাউকে বুঝতে দেবেনা। ১৫ বছরের সেলিনা। এইটুকু মেয়ে বাবার এতটুকু কষ্ট তার সহ্য হয়না।সংসারটা সামলায়। এটা ভেবে মিলন শেখের মনটা ভাড়ি হয়ে উঠে।

এই বাবা আর কত বিড়ি খাইবা, আহ, ঘরে আহ।

তোমার বিছানা করছি। তুমি শোও আমি তোমার পা টিপ্পা দেই।

নারে মা তুই শুইয়া পড়। আমি পরে ঘুমামু।

মিলন শেখ পরের দিন কামে যাওনের কথা চিন্তা করে রাত ১ টার দিকে ঘুমাতে যায় ।

সেলিনা একটা চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে আছে। মুখটার দিকে তাকিয়ে চোখ মুছে মিলন শেখ।

আজে বাজে চিন্তায় তার ঘুম আসেনা।

সকালে সেলিনার ডাকেই তার ঘুম ভাঙ্গে।

বাবা, অনেক বেলা হইছে।

কামে যাইবা না, তোমার ভাত রেডি।

কার্তিক মাসের এই সময়ে মজাা পানিতে কোমড় ভিজিয়ে কাম করার পর প্রায়দিন সকালেই আর নতুন করে কামে যাইতে ইচ্ছা করেনা।

তারপরও পেটের দায়ে যাইতে হয়। কিন্তু আজ কেন জানি আর যাইতে ইচ্ছা হয়না।

নারে মা আইজ আর কামে যামু না।

না বাবা যাও, কালতো কিস্তি, টাকা পাইবা কই?

তুমি কামে গেলে আমি একটু সদরে যামু,

পাচশ টেকা ধার করছি। তারাতারি চইলা আমু তুমি চিন্তা কইরোনা।

মিলন শেখ কাজে যাওয়ার পর সেলিনাও বেড়িয়ে পরে।

একটা ছোট হাত ব্যাগে সাড়ে তিন হাজার টাকা, সংসারের বাজার করে যে টাকা বাচবে তা দিয়ে একটা জামা কেনা হবে। এটা ভেবে সেলিনার চোখে আনন্দ ঝিলিক দেয়। ইজি বাইকে বসে অনেক দুর আসার পর হঠাৎই খেয়াল হয় হাত ব্যাগটি তার হাতে নেই। ইজি বাইক থামিয়ে নেমে পরে সেলিনা। রাস্তা ধরে খুজতে খুজতে বাড়ি পর্যন্ত আসে। কোথাও ব্যগটি নেই। মুষড়ে পরে সেলিনা।

এইটা কি হইলো?

এত গুলো টেকা।

বাবারে কি কমু?

নানা চিন্তায় একদম ভেঙ্গে পড়ে সে।

চিৎকার করে কাঁদে।

দুপুরে ঘরে ঢুকে নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারেনা। মানসিক যন্ত্রনা কোন ভাবেই নেভানো যাচ্ছে না। এত টানা টানির সংসারে এতো গুলি টেকা আমি হারাইয়া ফেললাম?

ওড়নাটা হাতে নিয়ে ঘরের আড়ার সাথে বেধেঁ ফেলে।

কারো কথা তার মনে আসেনা।

বাবা! বাড়িতে এসেইতো ভাত চাইবে। আমি না থাকলে কে ভাত দিব?

কিন্তু টাকার কথা কি কমু?

ওড়নায় গিট দিয়ে ঝুলে পড়ে সেলিনা।

দুপুর গড়িয়ে গেলে রাজ্যের ক্ষুধা পেটে নিয়ে বাড়িতে আসে মিলন শেখ।

ঘরের দরজা বন্ধ দেখে ভাবে মেয়ে হয়তো সদর থেকে ফিরেনি।

দরজা ধাক্কা দিয়ে দেখে ভেতর থেকে বন্ধ। কয়েক বার ডাক দেয়, সেলি ,এই সেলি, ঘুমাইছস নি। দরজা খুল।

মিলন শেখের ডাকাডাকিতে পাশের বাড়ির কিশোরী তামান্না জানায়, সিলিনা টাকা হারিয়ে ফেলছে। বাড়িতে এসে অনেক কান্না কাটি করেছে।

তামান্নার কথা শেষ হওয়ার আগেই মিলন শেখ দরজা ভেঙ্গে ফেলে।

ঘরে ঢুকে থ হয়ে যায়। সেলিনার লাশ ঝুলছে।

তার চিৎকারে আশ-পাশের লোকজন এসে লাশ নামিয়ে বাইরে নিয়ে আসে । মুখটা খালি রেখে চাদর দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় সেলিনার দেহ।

মা রে কাইল রাইতে তো এমনেই ঘুমাইয়া আছিলি। ঢুকরে কেদে উঠে মিলন শেখ।

পুলিশ আসে, সেলিনার লাশটি থানায় নিয়ে যায়।

রাত হয়ে যাওয়ায় জেলা হাসপাতালে আজ আর লাশ পাঠানো যাবেনা বলে জানিয়ে দেয় পুলিশের এক কর্মকর্তা। তাই রাত জেগে লাশ পাহাড়া দেওন লাগবো।

একে একে সবাই চলেল যায়। থানা চত্তরের বাইরে মেয়ের লাশ নিয়ে একাই বসে থাকে মিলন শেখ।

দুপুরে আনেক ক্ষিধা ছিল। অহন আর ক্ষিধা নাই। ভাত বাইড়া কে ডাক দিব,

বাবা তোমার ভাত ঠান্ডা হইয়া গেল।

মিলন শেখ মেয়ের মাথায় হাত রেখে বিলাপ করে কাঁদে, মা- রে তোর নতুন জামা আমি দিতে পারি নাই…….

Comments are closed.