মহিউদ্দিনের রাজ্যে চিড় ধরিয়েছেন সাংসদ মৃণাল!

আরিফ উল ইসলাম: মুন্সীগঞ্জে আওয়ামী লীগে রয়েছে দুই পক্ষ। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের মধ্যকার বিবদমান এ দুপক্ষ প্রশাসনে সমান প্রভাব অক্ষুণ্ণ রেখেছে। এ জেলায় পুরনো নেতা জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোহাম্মদ মহিউদ্দিন। জেলা আওয়ামী লীগে তার প্রভাব রয়েছে। তবে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের উপ-দফতর সম্পাদক অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস এ রাজ্যে নতুন শক্তি রূপে আবির্ভূত হয়েছেন। এক সময় মোহাম্মদ মহিউদ্দিন মুন্সীগঞ্জে আনপ্যারালাল থাকলেও সে অবস্থায় চিড় ধরিয়েছেন সাবেক এই ছাত্র নেতা।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চিফ সিকিউরিটি অফিসার ও ঘনিষ্ঠ সহচর মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ১৯৮০ সাল থেকে জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। ২০০৮ সাল পর্যন্ত সদরসহ জেলায় তার একক কর্তৃত্ব ছিল। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে এক সময়ের ছাত্রনেতা সরকারি হরগঙ্গা কলেজের সাবেক ভিপি ও আওয়ামী লীগের উপ-দফতর সম্পাদক অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে জেলা সদরে নেতৃত্বের বিরোধ দেখা দেয়। মোহাম্মদ মহিউদ্দিন এবং মৃণাল কান্তি দাসের বিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যদিও আওয়ামী লীগকে গুছানোর ক্ষেত্রে মৃণাল কান্তি দাস সরাসরি মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের বিরোধিতা করেন না। ২০১৪ সালের ২১ জুন অনুষ্ঠিত জেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে বক্তৃতায় মৃণাল কান্তি দাস মহিউদ্দিকে নেতা মেনে তার হাতেই আগামী কমিটি করার দায়িত্ব অর্পণ করেন। সেময় অনেকে মনে করেছিলেন, মৃণাল কান্তি দাস জেলায় নেতৃত্ব পরিবর্তনের কথা বলবেন। কিন্তু তা তিনি বলেননি। শেখ লুৎফুর রহমান দীর্ঘদিন যাবত জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলয়ে থাকায় তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

৭৫এর পটপরিবর্তনের পর মুন্সীগঞ্জে আওয়ামী লীগ আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। প্রতিটি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা বিএনপি প্রার্থীদের কাছে পরাজিত হন। দীর্ঘ ৩০ বছর পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে জেলার ৩টি আসন পুনরুদ্ধার করে আওয়ামী লীগ। ১৯৫৪ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত এখানে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়েছেন কফিলউদ্দিন চৌধুরী, কোরবান আলী, শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেন, আবদুল করিম বেপারী, ডা. এমএ কাদের, শামসুল হক ও হারুন অর রশিদ। সংসদ নির্বাচনগুলোতে পরাজয়ের পেছনে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।

টঙ্গীবাড়িতে উপজেলা চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াহিদের সঙ্গে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জগলুল হাওলাদার ভুতুর বিরোধ রয়েছে। অন্যান্য নেতাকর্মীও এ বিরোধে সম্পৃক্ত। এখানে আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হতে পারছে না। শ্রীনগরে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। এক পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বর্তমান সংসদ সদস্য সুকুমার রঞ্জন ঘোষ, অপর পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন গোলাম সারোয়ার কবীর। উভয় পক্ষের মধ্যে হামলা-পাল্টাহামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবাদে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কর্মসূচিও পালিত হয়েছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখেই মূলত এ বিরোধ। সিরাজদিখানে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে। উপজেলা চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহম্মেদ এবং হাফেজ ফজলুল হকের মধ্যকার বিরোধে হামলা-পাল্টাহামলার ঘটনা ঘটেছে, আহত হয়েছেন নেতাকর্মীরা।

জেলায় উপজেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে চরম বিরোধ রয়েছে গজারিয়ায়। এখানে আওয়ামী লীগের দুটি কমিটি রয়েছে। একটির সভাপতি স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাসের অনুসারী গজারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান রেফায়েত উল্লাহ খান তোতা এবং অপরটির সভাপতি জেলা কমিটি ঘোষিত আমিরুল ইসলাম। দুই কমিটিই সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস এবং জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের সমর্থনপুষ্ট হয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছেন। জেলা সদরে মোহাম্মদ মহিউদ্দিন এবং তার ছোট ভাই সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আনিসুজ্জামান আনিসের মধ্যে বিরোধ থাকলেও বর্তমানে পারিবারিক রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষায় সে বিরোধ কমেছে।

মুন্সীগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ও মৃণাল কান্তি দাসের বিরোধ আরও চরম আকার ধারণ করে। ইতিমধ্যে মুন্সীগঞ্জ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। রাজনীতির হাওয়া বইছে উল্টো দিকে। আওয়ামী লীগের সভাপতির নিকটাত্মীয়রা রাজনীতির নিজেদের ঘর ছেড়ে সংসদ সদস্য মৃণাল কান্তি দাসের শিবিরে ভিড়ছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকীর অনুষ্ঠান নিয়ে একই স্থানে পৃথকভাবে দুটি মঞ্চ তৈরি করে আলোচনা সভার আয়োজন নিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি সমর্থিত ও স্থানীয় এমপি সমর্থিত নেতাকর্মীরা মুখোমুখি অবস্থান নেয়। শহরে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

মুন্সীগঞ্জ শহরের থানারপুল এলাকায় জুবলি রোডে একদিকে মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের উপ-দফতর সম্পাদক অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাসের সমর্থকরা এবং তাদেরই গা ঘেঁষে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ প্রশাসক মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের সমর্থক যুবলীগ নেতাকর্মীরা পৃথক মঞ্চ তৈরির কার্যক্রম চালায়। এক সময়ের বাকশালের রাজনীতির সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন তারা এখন এমপির দলে। একই সঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের খালাতো ভাইয়ের ছেলে আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান নামক সংগঠনের নেতা রেজাউল ইসলাম সংগ্রামসহ একঝাঁক নেতাকর্মীও মৃণাল কান্তি দাসের শিবিরে যোগ দিয়েছেন।

অবশ্য এ ব্যাপারে মোহাম্মদ মহিউদ্দিনে বক্তব্য ভিন্ন। এ প্রসঙ্গে তিনি যুগান্তরকে বলেন, এরা কখনও আওয়ামী লীগের কাজে লাগেনি। তারা যখনই আওয়ামী লীগে এসেছে তখনই বিশৃংখলা সৃষ্টি করেছে।

যুগান্তর

Comments are closed.