সেবার চেয়ে টাকা বড়!

সিরাজদিখান স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত
সিরাজদিখান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলছে রমরমা বাণিজ্য। রোগীদের সেবা দেয়ার থেকে এখানে আর্থিক উপার্জনটাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টরা ডাক্তারদের সহযোগিতায় প্রতিদিন হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা। সরকারী হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার করে রসিদ না দিয়ে টাকা নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, উচ্চহারে গরির রোগীদের থেকে প্যাথলজি পরীক্ষার টাকা নেয়া হচ্ছে। যার কোন রসিদই দেয়া হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কাউন্টারে টাকা জমা দেয়ার বিধান থাকলেও এখানে টেকনোলজিস্টরা নিজেদের ইচ্ছেমতো নগদ টাকা নিয়ে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ করছে। চাহিদা মতো টাকা না দিলে পরীক্ষা করাতে পারেন না ভুক্তভোগী রোগী। এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।

সরেজমিনে জানা যায়, হাসপাতালটির নানা অনিয়ম অব্যবস্থাপানা আর মানহীন চিকিৎসা সেবার কাহিনী। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং আবাসিক মেডিক্যাল অফিসারের বিরুদ্ধেও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। স্বাস্থ্য কর্মকর্তা অফিস সময়ে হাসপাতাল চত্বরে তাঁর বাসায় বসে রোগী দেখেন বলে জানা গেছে। হাসপাতালের জিনিসপত্র ও ওষুধ ক্রয়ের জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রতি অর্থবছরে বেশ কয়েকবার বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সে অনুযায়ী জিনিসপত্র ও ওষুধ কেনেন না বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের কয়েকজন স্টাফ। উপজেলা প্যাথলজি বিভাগের কোন খবরও রাখেন না তিনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইছাপুরা চৌরাস্তার এক ওষুধ ব্যবসায়ী বলেন, অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনা জেঁকে বসেছে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট সিরাজদিখান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এক্স-রে মেশিন কখনও নষ্ট কখনও ভাল। নেই অন্য কোন মেশিনারিজ। ডাক্তার থাকলেও ওষুধ নেই। প্রসূতি রোগীদের সিজার হলেও অনেক টাকা নেয়া হয় রোগীদের নিকট থেকে। ভাল সেবা রোগীরা শেষ কবে পেয়েছেন তা বলা কঠিন। আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) নিয়মিত থাকেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি মোবাইল ফোনে শুধু সেভ করা নম্বরে কথা বলেন। কোন রোগী প্রয়োজনে তাকে ফোন দিলেও ফোন রিসিভ না করায় রোগীরা তাদের প্রয়োজনীয় কথা বলতে পারে না আরএমওর সঙ্গে। একই সঙ্গে হাসপাতাটিতে চলছে দালাল আর আয়াদের আধিপত্য। দালাল আর আয়াদের দৌরাত্ম্যে রোগীদের দুর্ভোগের শেষ নেই।
অভিযোগ রয়েছে দুপুর ১২টার পর এ হাসপাতালটিতে ডাক্তার থাকে না।

জানা যায়, সৌদি প্রবাসী সাজাহানের স্ত্রী মাকসুদা বেগম গত ৩০ সেপ্টেম্বর টিকিট কেটে সিরাজদিখান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তার দেখান। ডাক্তার তাকে হিমোগ্লোবিন, ইএসআর, ব্লাডগ্রুপিং, আরবিএস, ইউরিন সুগার পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য লিখেন। মাকসুদা মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট প্যাথলজিস্ট তোফাজ্জল হোসেনের কাছে গেলে তিনি মাকসুদাকে জানান, এখানে সব কিছু করা যাবে। তবে টাকা দিতে হবে। মাকসুদা শুধু হিমোগ্লোবিন ও ব্লাডগ্রুপিং পরীক্ষা করলে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট তার নিকট থেকে ৪৬০ টাকা দাবি করেন। কিন্তু মাকসুদা টাকা দিয়ে টাকার রশিদ চাইলে এখান থেকে পরীক্ষা করে কোন টাকার রসিদ দেয়া হয় না বলেও জানান তোফাজ্জল। গত বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় রিপোর্ট নিতে আসা মাকসুদা ও ৫/৬ মহিলা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য টাকা দিলেও সে টাকার কোন রশিদ পাননি তারা। রক্ত পরীক্ষা করতে আসা কলেজ ছাত্রী হাবিবা আক্তার বলেন, প্রতিদিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাম, এক্স-রে, রক্তসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়। অথচ এখানে পরীক্ষা-নীরিক্ষার জন্য টাকা নিলেও কোন মানি রিসিট দেয়া হয় না।

এ বিষয়ে তোফাজ্জল হোসেন জানান, ভুলক্রমে ওই দিন মানি রসিদ দেয়া হয়নি। তাছাড়া তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগও সঠিক নয় বলে তিনি দাবি করেন।
সিরাজদিখান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক নূরুন-নবী বিল্লাহ বলেন, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট প্যাথলজিস্ট মোঃ তোফাজ্জল হোসেন রসিদ ছাড়া টাকা নিয়েছেন এটা নিয়ম বহির্ভূত কাজ। লিখিত অভিযোগ দিলে আমরা বিষয়টি দেখব। তাছাড়া তার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ উলফাত আরা বেগম বলেন, রসিদ ছাড়া টাকা নেয়ার একটি ঘটনা আমি জানতে পেরে রেজিস্টার মিলিয়ে দেখেছি, সেখানে সবকিছু ঠিকঠাক আছে। কোন অনিয়ম হয়নি। তাছাড়া আরএমও সাহেবের মোবাইল অনেক সময় সাইলেন্স থাকলে হয়তো তিনি মোবাইল রিসিভ নাও করতে পারেন। তাছাড়া আমি ও আরএমও সাহেব এখানে বাসা নিয়ে থাকি। বাসায় বসে রোগী দেখার অভিযোগ সঠিক নয় বলে তিনি দাবি করেন। সকল ডাক্তারই আড়াইটা পর্যন্ত রোগী দেখেন। পরে শুধু ইমার্জেন্সি বিভাগে ডাক্তার থাকেন।

জনকন্ঠ

Comments are closed.