জাল পাসপোর্ট :৬ মাসে ৫ শতাংশ পাসপোর্ট জাল

অফিশিয়াল পাসপোর্ট
এ বছরের প্রথম ছয় মাসে দেওয়া তিন হাজার অফিশিয়াল পাসপোর্ট পরীক্ষা করে দেখা গেছে এর ১৫০টিই (৫ শতাংশ) জাল। এ বছর দেওয়া সব পাসপোর্ট পরীক্ষা করলে এ সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছে পাসপোর্ট ও বহিরাগমন অধিদপ্তর। তুরস্ক থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই জালিয়াতির ঘটনা ফাঁস হয়ে যায়।

সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি পাসপোর্ট জালিয়াতির বিষয়টি তুরস্ক থেকে জানতে পারাটাই লজ্জার। আর এতে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। তাঁরা আরও বলেন, সাধারণ পাসপোর্ট নিয়ে বাইরে বাংলাদেশিদের হয়রানির শেষ নেই। এখন অফিশিয়াল পাসপোর্টে এ ধরনের জালিয়াতি ধরা পড়ায় ভবিষ্যতে বাংলাদেশিদের হয়রানির আশঙ্কা আরও বাড়বে।

পাসপোর্ট ও বহিরাগমন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এন এম জিয়াউল আলম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, জাল কাগজপত্র দিয়ে তৈরি ১০৮টি পাসপোর্টের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যাঁরা পাসপোর্ট নিয়েছেন, তাঁরাই আসামি হবেন। যাঁরা এই জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত, তাঁরা আসামি হবেন কি না জানতে চাইলে জিয়াউল আলম বলেন, তদন্তে যাঁদের নাম আসবে, তাঁরা অবশ্যই আসামি হবেন।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, ধরা পড়া এসব পাসপোর্ট প্রথমে সাধারণ এমআরপি হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। পরে জাল কাগজপত্র দিয়ে সংশোধনের নামে সাধারণ পাসপোর্ট থেকে ‘অফিশিয়াল পাসপোর্ট’-এ রূপান্তর করা হয়। মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত একটি চক্র পাসপোর্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে এ ধরনের পাসপোর্ট তৈরি করে। প্রতিটি পাসপোর্টের জন্য নেওয়া হয় চার লাখ টাকা। পাসপোর্ট অধিদপ্তরের একজন পরিচালক ও কয়েকজন কর্মকর্তা এর সঙ্গে জড়িত। প্রতিটি জাল পাসপোর্ট ফরম পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সব ফরম একই হাতে লেখা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২৭টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সমঝোতা স্মারক রয়েছে। এর আওতায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ওই সব দেশে যাওয়ার পর বিমানবন্দরেই (অনঅ্যারাইভাল ভিসা) ভিসা পেয়ে থাকেন। মানব পাচারকারীরা এই সুযোগ নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের সরকারি কর্মকর্তা বানিয়ে বিদেশে পাচার করছেন। বিশেষ করে তুরস্ক, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপসহ কয়েকটি দেশে অনেক লোককে অফিশিয়াল পাসপোর্টের মাধ্যমে পাচার করা হয়।

অনেকেই ভুয়া সরকারি কর্মকর্তা সেজে প্রথমে তুরস্ক, পরে সেখান থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলে যান। এভাবে তিন বেকার যুবক সরকারি কর্মকর্তা সেজে তুরস্কে গিয়ে বিপদে পড়েন। পরে তাঁরা সেখানকার পুলিশকে জানালে সবকিছু ফাঁস হয়ে যায়। তুরস্ক সরকার বিষয়টি বাংলাদেশকে জানায়। এরপর জাল পাসপোর্ট তৈরির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ঢাকা বিভাগীয় পাসপোর্ট পরিচালক মুনশি মুয়ীদ ইকরাম, সহকারী পরিচালক এস এম শাহজামান, উচ্চমান সহকারী সাইফুল ইসলাম-১ এবং মো. শাহজাহান মিয়া ও আবুল হোসেন সরকারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

তুরস্কের ঘটনার পর সরকারি পাসপোর্ট ব্যবহার করে ব্যক্তিগত কাজে বিদেশ ভ্রমণে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। এখন সরকারি কাজে যেসব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বিদেশে যাবেন, শুধু তাঁদেরই অফিশিয়াল পাসপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। এই পাসপোর্ট নিতে হচ্ছে বিদেশ ভ্রমণের জন্য দেওয়া সরকারি আদেশ (জিও) দেখিয়ে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলেছে, বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে পিয়ন থেকে শুরু করে অতিরিক্ত সচিব পর্যন্ত কর্মকর্তারা অফিশিয়াল পাসপোর্ট পেয়ে থাকেন। সচিবেরা পান লাল কূটনৈতিক পাসপোর্ট। প্রতিবছর গড়ে প্রায় দেড় লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বিদেশে যান। বিদেশে যাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ দেশে ফেরেন না।

বিষয়টি জানাজানির পর একটি গোয়েন্দা সংস্থা তদন্তে নামে। তাদের প্রতিবেদনে পরিচালকসহ আটজনের জড়িত থাকার তথ্য মেলে। এরপর পাসপোর্ট অধিদপ্তর এ ঘটনা তদন্তে গত ১৭ মে পরিচালক সেলিনা বানুকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু কমিটির তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই অজ্ঞাত কারণে সেলিনা বানুকে সরিয়ে দেওয়া হয়। যুগ্ম সচিব ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের প্রকল্প (ভবন নির্মাণ) পরিচালক আতিকুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের নতুন কমিটি করা হয়।

তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ‘অফিশিয়াল পাসপোর্ট’ নিয়ে অনেকেই বিদেশে চলে গেছেন। কেউ কেউ ফিরে এসেছেন দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে, কেউবা ঘটনা জানাজানির পর গা ঢাকা দিয়েছেন।

বিদেশে চলে যাওয়া ব্যক্তিদের একজন মো. শামসুদ্দিন। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি থানার নদনা এলাকার এই বাসিন্দা গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর তাঁর সাধারণ পাসপোর্টটি সরকারি পাসপোর্ট হিসেবে রূপান্তর করেন। পাসপোর্ট অধিদপ্তর জানতে পারে, তিনি ব্রাজিলে চলে গেছেন। আরেকজন সিলেটের গোলাপগঞ্জের মান্নান মিয়া। কোনো কাগজপত্র জমা না দিয়েও তিনি সাধারণ পাসপোর্ট সরকারি পাসপোর্ট হিসেবে বদল করেছেন। মুন্সিগঞ্জ সদরের বাসিন্দা মিলন ব্যাপারী নিজেকে কর কমিশনারের অফিস সহকারী পরিচয় দিয়ে জাল অফিশিয়াল পাসপোর্ট করেন। ১২ এপ্রিল তাঁর বই ইস্যু হয়।

পাসপোর্টের নথিতে থাকা মোবাইল ফোন নম্বর ধরে যোগাযোগ করা হলে মিলন ব্যাপারী প্রথম আলোকে বলেন, কয়েক মাসে আগে মিরপুর ১২ নম্বরের জাহাঙ্গীর নামের এক যুবকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তিনি কোরিয়ায় পাঠানোর লোভ দেখান। এ জন্য সাত লাখ টাকার চুক্তি হয়, তিন লাখ টাকা জাহাঙ্গীরকে অগ্রিম দেন। কিন্তু তার আগেই ঘটনা জানাজানি হলে জাহাঙ্গীর তাঁর পাসপোর্ট পানিতে ফেলে নষ্ট করে দেন।

জাল অফিশিয়াল পাসপোর্ট নিয়ে তুরস্ক থেকে ফিরে এসেছেন দিনাজপুরের ফুলবাড়ী থানার বাসিন্দা মায়ানুর রশিদ। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, মতিঝিলের মানব পাচারকারী চক্রের নেতা মাহবুবুল আলম তাঁদের তুরস্কে যাওয়ার কথা বলে সাত লাখ টাকার চুক্তি করেন। সেই মতো চার লাখ টাকা তাঁর হাতে তুলে দেন। মাহবুবই তাঁকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের কর্মচারী দেখিয়ে সাধারণ পাসপোর্ট বদলে অফিশিয়াল পাসপোর্ট করিয়ে নেন। তাঁর সঙ্গে তারিকুল ইসলাম, জাহিদুল ইসলাম নামের আরও দুই যুবক ছিলেন। চুক্তিমতো প্রথমে তাঁদের ভারতে নিয়ে যান। এরপর মুম্বাই থেকে বিমানে করে নিয়ে যান তুরস্কে। সেখানে যাওয়ার পর পাচারকারীরা তাঁকে জিম্মি করে বাড়ি থেকে টাকা আদায়ের চেষ্টা করেন। একদিন তিনি কৌশলে পালিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসে গিয়ে আশ্রয় নেন।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অভিবাসন গবেষণা সংস্থা ‘রামরু’র চেয়ারম্যান তাসনীম সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি খুবই উদ্বেগের। যেখানে সাধারণ মানুষকে পাসপোর্ট পেতে পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয়, সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের নামে কী করে জাল পাসপোর্ট বের হলো, সেটা তদন্ত করা উচিত। এর সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তিও জড়িত।

প্রথম আলো

Comments are closed.