পরিবেশ দূষিত হচ্ছে সিমেন্ট ফ্যাক্টরির ফ্লাই এ্যাশে

নানা রোগে ভুগছে এলাকার বাসিন্দারা
মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল: মুন্সীগঞ্জ শহরসংলগ্ন চরমুক্তারপুরে ৫টি সিমেন্ট ফ্যাক্টরির অনবরত পরিবেশ দূষণ করে চলছে। খোলা ক্রেনে করে জাহাজ থেকে ক্লিংকার অপসারণে নদীর পানি, নদীর তলদেশ ও বায়ু মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। এতে জেলা শহর ও আশপাশের মানুষ নানা রোগে ভুগছে। ধলেশ্বরীর পানির দুর্গন্ধে নদী তীরের মানুষের টিকে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। জলজ প্রাণীগুলোর অবস্থাও বিপন্ন। মাছ মরে ভেসে উঠছে। ধলেশ্বরীর সুস্বাদু রিঠা মাছের আর এখন দেখা মিলে না। দূষণের প্রভাবে এখানে হলুদ বৃষ্টির ঘটনা পর্যন্ত ঘটছে। আশপাশের জমি উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গাছপালা।

প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার বস্তা সিমেন্ট উৎপাদনের ধারণ ক্ষমতার এই ৫টি সিমেন্ট ফ্যাক্টরি লাখ লাখ টন ক্লিংকার জাহাজ থেকে খোলা ক্রেনে করে অপসারণ করছে। ক্লিংকারের ডাস্ট উড়ে গিয়ে পড়ছে নদী, জমি, বাড়িঘরে। মানবদেহের ক্ষতি করছে মারাত্মকভাবে। যথাযথ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ না করে কর্মরত থাকায় এই সিমেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোতে কর্মরত প্রায় চার হাজার শ্রমিকও ভুগছেন নানা রোগে। মুন্সীগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. কাজী শরিফুল আলম জানান, শুধু শ্রমিকরাই নন, এই অঞ্চলে বসবাসরতরা ফুসফুসের বিভিন্ন রোগ ভুগছে। মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক ক্লিংকারের ফ্লাই এ্যাশ এ্যাজমা, শ্বাসকষ্টসহ ফুসফুসজনিত নানা রোগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই ক্রমেই এই অঞ্চলে এই রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এ সংক্রান্ত শিশু রোগীও আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

মুন্সীগঞ্জ পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক নুর আলম ধলেশ্বরী তীরের সিমেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোর পরিবেশ দূষণের সত্যতা স্বীকার করে জানান, কয়েকটি সিমেন্ট ফ্যাক্টরিকে প্রায় ৫৮ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে সম্প্রতি। তাদের কাজ-কর্ম মনিটর করা হচ্ছে। পরিবেশ দূষণের সার্বিক চিত্র তুলে ধরে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট প্রেরণ করা হয়েছে। দূষণরোধে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অন্যদিকে একটি সিমেন্ট ফ্যাক্টরির চীফ কো-অর্ডিনটর বলেন, ‘কল কারখানা থাকলে কিছুটা পরিবেশ দূষণ হবেই। কিন্তু তা সহনীয় পর্যায়ে কিনা সেটাই বিবেচ্য বিষয়। প্রতি বস্তায় ৬২ টাকা সরকারকে ট্যাক্স দেয়া হচ্ছে। সিমেন্ট ফ্যাক্টরি থেকে তেমন কোন দূষণ হয় না। এর তরল কোন বর্জ্য নেই। তবে ক্লিংকারের ডাস্টগুলো ডাস্ট কালেক্টর দিয়ে সাধ্যানুযায়ী প্রতিরোধ করা হচ্ছে। ক্লিংকারের নদীর তলদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগও ঠিক নয়, কারণ ডেজিং করে নাব্য বজায় রাখা হয়। নয়ত জাহাজ আসতে পারত না।’

এদিকে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় চরমুক্তারপুরের এই পাঁচ সিমেন্ট ফ্যাক্টরির অনবরত পরিবেশ দূষণ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। সিমেন্ট ফ্যাক্টরিগুলো খোলা ক্রেনে করে জাহাজ থেকে ক্লিংকার অপসারণের নদীর পানি ও বায়ু মারাত্মকভাবে দূষণের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের সর্বসম্মতি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুল হাসান বাদলের সভাপতিত্বে এতে আলোচনা করেন জেলা পরিষদ প্রশাসক আলহাজ মোঃ মহিউদ্দিন, এ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস এমপি, ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মোঃ জাকির হোসেন মজুমদার প্রমুখ এতে উপস্থিত ছিলেন। সভায় বিষয়টি উত্থাপন করেন প্রেসক্লাব সভাপতি মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল। পরে এ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস এমপি বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, দূষণ রোধ করা না করা গেলে পরিবেশ ও মানব সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। এ ব্যাপারে তাঁর কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন। জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুল হাসান বাদল জানান, আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে পত্র দেয়া হয়েছে। দূষণের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।

আগে নদীতে কিছু সময় পরপর শুশুক মাছ ভেসে উঠত। কিন্তু সেই শুশুক মাছ তথা ডলফিন মাছ এ নদীতে বিলুপ্ত। সিমেন্টের ফ্লাই এ্যাশ ও বিভিন্ন কারখানার বর্জ্য ধলেশ্বরীকে বিপন্ন করে তুলছে। পরিবেশ বিজ্ঞানী আরিফুর রহমান জানান, ক্লিংকারের ফ্লাই এ্যাশ ও বর্জ্য মুন্সীগঞ্জ শহর ও আশপাশের এলাকার পরিবেশ অতিমাত্রায় ক্ষতিসাধন করে চলেছে। যা খালি চোখে বোঝা যাচ্ছে না। শীঘ্রই ব্যবস্থা গ্রহণ করা না গেলে এই অঞ্চলের মানব সম্পদ, উদ্ভিদ ও পশুপাখির অপূরণীয় ক্ষতিসাধিত হবে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) মুন্সীগঞ্জ জেলার সভাপতি এ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান জানান, বিষাক্তবর্জ্য তথ্য ফ্লাই এ্যাশ সভ্যতার জনপদ মুন্সীগঞ্জ তথা বিক্রপুরের পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলছে। বর্জ্য পরিশোধিত ট্রিমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি) ব্যবহার না করে সরাসরি ওই বিষাক্ত বর্জ্য নদীতে ফেলছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের এই প্লান্ট থাকলে বন্ধ করে রাখা হয়। পরিদর্শনের টের পেলেই চালু রাখে।

জনকন্ঠ

Comments are closed.