মুন্সীগঞ্জে দ্বন্দ্ব-নিষ্ক্রিয়তার রাজনীতি: আওয়ামী লীগে চরম কোন্দল

লাবলু মোল্লা: মুন্সীগঞ্জে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন চরম আকার ধারণ করছে। তবে জেলা নেতৃত্বে অভ্যন্তরীণ কোন্দল থাকলেও দলটির জেলাময় রয়েছে একচ্ছত্র আধিপত্য। দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে জেলার চারটি সংসদীয় আসনে বিএনপি প্রার্থীরা বিজয়ী হলেও ২০০৮ সালের ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ জেলার সবকটি আসনেই আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা বিপুল ভোটে বিজয়ী হন।

এরপর ২০১৪ সালের ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জেলার সবকটি আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে এমপি হিসেবে রয়েছেন সুকুমার রঞ্জন ঘোষ, মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি এবং মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপ-দফতর সম্পাদক অ্যাডভোকেট মৃণালকান্তি দাস। বর্তমানে মুন্সীগঞ্জের চারটি আসন ভোটার সংখ্যা অনুযায়ী তিনটি আসনে রূপান্তর করা হয়েছে। মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের এমপি সুকুমার রঞ্জন ঘোষের এলাকায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড হলেও দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে টেন্ডারবাজি থেকে শুরু করে মসজিদ, বিদ্যালয়, হাটবাজারসহ সরকারি খাস সম্পত্তি লুটপাটের একাধিক অভিযোগ রয়েছে। মুন্সীগঞ্জ-২ আসনের এমপি অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলির এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। তার এলাকায় বর্তমানে দলে অভ্যন্তরীণ কোন্দল নেই।

এ ছাড়া তিনি দেশবাসীর বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা সেতু প্রকল্পকে বাস্তবায়নে এলাকার মানুষের বসতভিটে জমিজিরাত অধিগ্রহণে সহায়তাসহ কঠোর পরিশ্রম করে সরকার ও দেশবাসীর দৃষ্টি কেড়েছেন। পদ্মায় ভাঙনকবলিত মানুষের পাশে দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে প্রাণান্ত কাজ করে যাচ্ছেন। এ বছর তার নেতৃত্বে এলাকায় বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দলের সহস্রাধিক নেতা-কর্মী আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন। মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের এমপি অ্যাডভোকেট মৃণালকান্তি দাসের নির্বাচনী এলাকা গজারিয়ায় দেশের অন্যতম গার্মেন্ট পল্লী ‘বাউশিয়া গার্মেন্ট পল্লী’, ওষুধ শিল্পপার্ক এবং মীরকাদিমে বিদুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখে সুনাম অর্জন করেছেন।

এ ছাড়া এলাকায় উন্নয়নের স্বার্থে জেলায় নতুন পাসপোর্ট অফিস ভবন, নতুন ফুড অফিস ভবন, নতুন পোস্ট অফিস ভবন, আলু গবেষণাগার চালুকরণ, গজারিয়ার ফুলদি নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণের এবং মুন্সীগঞ্জ-গজারিয়া সরাসরি যোগাযোগের জন্য ফেরি সার্ভিস চালুকরণ, সদর হাসপাতাল থেকে মুক্তারপুর দেড় কিলোমিটার রাস্তা মেরামত ও আধুনিকায়নসহ নানাবিধ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড হাতে নিয়েছেন। তার সবচেয়ে বড় অর্জন এলাকার শতাধিক নেতা-কর্মীসহ মীরকাদিম পৌর মেয়র, ধনকুবের মো. শহিদুল ইসলাম শাহীনের নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন বিএনপি কাউন্সিলরকে নিজ দলে আনতে সক্ষম হয়েছেন।

এদিকে জেলা সদরের আওয়ামী রাজনীতির ওপর জেলা আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র প্রভাব রয়েছে। বছরের পর বছর ধরেই জেলা আওয়ামী লীগ মহিউদ্দিন পরিবারের কুক্ষিগত। বেশ কয়েক বছর ধরে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. মহিউদ্দিন এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বর্তমান সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আনিসুজ্জামান আনিস পরিবারের আপন দুই ভাইয়ের মধ্যে দা-কুমড়া সম্পর্ক ছিল। দুই ভাইয়ের এ বিরোধকে কেন্দ্র করে জেলার আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, মহিলা লীগসহ আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনে জমে ওঠে চরম বিরোধ। রাজনীতির নানা কারণে উপেক্ষিত ও সুবিধাবঞ্চিত নেতারা এখন মোড় ঘুরতে বসেছেন।

এ কারণে নতুন করে মুন্সীগঞ্জ আওয়ামী লীগের রাজনীতি দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। এক দিকের নেতৃত্বে রয়েছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চিফ সিকিউরিটি অফিসার, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও জেলা পরিষদ প্রশাসক মো. মহিউদ্দিন ও তার ভাই মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আনিসুজ্জামান আনিস। এ ছাড়াও তাদের উত্তরসূরি হিসেবে এ শিবিরে উদীয়মানদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মো. মহিউদ্দিনের বড় ছেলে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপ-কমিটির নেতা ফয়সাল বিপ্লব ও তার চাচাত ভাই জেলা যুবলীগ সভাপতি মো. আকতারুজ্জামান রাজীব।

এ ছাড়া অপর শিবিরের নেতৃত্বে রয়েছেন মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের এমপি, হরগঙ্গা কলেজের সাবেক ভিপি, অ্যাডভোকেট মৃণালকান্তি দাস। দেশের প্রধান রাজনৈতিক সংগঠন এবং এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ আর গণতন্ত্রের সংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জেলায় নিজস্ব কার্যালয় নেই। এ নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের মধ্যে রয়েছে ক্ষোভ।

বিডি-প্রতিদিন

Comments are closed.