অপরাধনামা : শ্রীনগরে বেপরোয়া এমপির পার্টনার

এমপি সুকুমার রঞ্জন ঘোষের ব্যবসার পার্টনার (অংশীদার) সিরাজুল ইসলাম ও তার পরিবার এবার দখলে নেমেছে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে। এর আগে সিরাজুল ইসলাম নিজেই দখল করে নিয়েছেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং মসজিদের জায়গা। এবার তার ভাই সরকারি পুকুর ভরাট করেছেন। ভেঙে ফেলেছেন একটি মাজারে যাওয়ার কাঠের পুল। আর উপজেলা পরিষদের পূর্বপাশে বেইলি ব্রিজের নিচে ১২ শতাংশ জলাশয় ভরাট করেছেন সিরাজুল ইসলামের এক আত্মীয় শাহজাহান। এখন তা বিক্রির পাঁয়তারা চলছে। বলাবলি হচ্ছে, মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে এখন চলছে দখলের মহোৎসব।

জানা গেছে, গত কয়েকদিন ধরে উপজেলা ভূমি অফিস সংলগ্ন মাজারের উত্তর পাশের প্রায় তিন একর আয়তনের পুকুরটি ভরাট শুরু করেন জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের এমপি সুকুমার রঞ্জনের বিজনেস পার্টনার সিরাজুল ইসলামের ভাই মোশারফ হোসেন খোকন। পুকুর ভরাটের সুবিধার্থে ভেঙে ফেলা হয়েছে উপজেলার দেউলভোগ বাজারের হযরত শাহ বকশী (রহ.) মাজারে চলাচলের জন্য নির্মিত শত বছরের পুরনো কাঠের একটি পুল। এ নিয়ে মাজার ভক্তদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ। উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার হাবীবুর রহমান জানান, পুকুরে প্রায় ২৭৫ ফুট দীর্ঘ ও ৬০ ফুট প্রস্থ প্রায় ৪০ শতাংশ সরকারি জায়গা। এটা সরকারের ১ নম্বর খাস খতিয়ানে ৫১০ দাগে বাজার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত।

শ্রীনগর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রমেন্দ্র নাথ বিশ্বাস জানান, তিনি জায়গাটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। ১ নম্বর খতিয়ানভুক্ত হওয়ায় এটি কারও মালিকানাধীন সম্পত্তি নয়। জায়গাটি পরিমাপ করে সার্ভেয়ারকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনের আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, পুকুরে মাজারের জায়গা থাকলেও তাদেরকে কিছু না জানিয়েই তা ভরাট করা হচ্ছে। অপর একটি সূত্র জানায়, মাজারের পূর্ব পাশে প্রায় ২০০ ফুট দীর্ঘ ও ২০ ফুট প্রস্থ সরকারের নয়নজলি জায়গা রয়েছে। ওই জায়গা ইতিমধ্যে ভরাট করা হয়েছে। শত বছর ধরে ওই জলাশয়ের ওপর একটি কাঠের পুল পেরিয়ে মাজারে যাতায়াত করা হচ্ছিল। সেতুটি দিয়ে মাজারের বিপরীত পাশে বসবাসকারী শতাধিক বেদে পরিবার তাদের খাবার পানি আর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনা-নেওয়া করত। পুকুরটি ভরাট ও পুলটি ভেঙে ফেলার কারণে নৌকায় ভাসমান ও রাস্তার পাশে বসতি স্থাপনকারী বেদে সম্প্রদায়ের পরিবারগুলো চরম বিপাকে।

ব্যবসায়ীরা জানান, জলাশয়কে ঘিরে বহু বছর ধরে এলাকার সবচেয়ে বড় নৌকার হাট বসলেও জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ায় নৌকার হাটটি আর বসতে পারবে না। শ্রীনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল বারেক ব্যাপারী জানান, তিনি উনিশ বছর ধরে চেয়ারম্যান রয়েছেন। মাজার ভক্ত ও বেদে পরিবারগুলোর জন্য প্রতি বছরই ইউনিয়ন পরিষদের অর্থে সেতুটি মেরামত করা হয়েছে। পুকুরটি ভরাট করে ফেলায় সেতুটি ভেঙে ইউনিয়নের অন্যত্র স্থাপন করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, মাজারে চলাচলের জন্য ভরাটকৃত পুকুর থেকে রাস্তা দেওয়া হবে বলে মোশারফ হোসেন খোকনের ভাই সিরাজুল ইসলাম তাকে কথা দিয়েছেন। পুকুরটির সরকারি অংশের উত্তর পাশের অংশে মোশারফ হোসেন খোকন ছাড়াও আরও দুজন মালিক রয়েছেন। এদের একজন দেউলভোগ এলাকার মো. মাহমুদুল হাসান সোহাগ জনান, ক্ষমতার অপব্যবহার করে আমার অংশসহ পুকুরটি ভরাট করা হচ্ছে। আমরা চেয়ে চেয়ে দেখছি। কিছুই বলতে পারছি না। এ ব্যাপারে মোশারফ হোসেন খোকন জানান, তিনি খরিদ সূত্রে মালিক হয়ে পুকুরটি ভরাট করছেন।

শ্রীনগরে মাটি ভরাট করে সরকারি পুকুর দখল

তবে এখানে যদি মাজার বা সরকারের জাগয়া থাকে তা ভরাট করলেও তিনি ওই জায়গা ছেড়ে দেবেন বলে জানান। সেতু ভাঙা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি সেতু ভাঙার সঙ্গে জড়িত নই। বরং এটি মাজার কমিটির লোকজনেই ভেঙেছে। উপজেলা পরিষদের লাগোয়া পূর্ব পাশে বেইলি ব্রিজের নিচে প্রায় ১২ শতাংশ জলাশয় ভরাট করেছে প্রভাবশালী ওই সিরাজুল ইসলামের এক আত্মীয় শাহজাহান। এ ১২ শতাংশ জায়গা এখন বিক্রির পাঁয়তারা চলছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এক শতাংশ জায়গার মূল্য ১৪ থেকে ১৫ লাখ টাকা।

এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, সিরাজুল ইসলাম দেউলভোগ টিএন্ডটি অফিসের জমি দখল করলে পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। উপজেলা নির্বাচনে তার ভাগ্নে সেলিম হোসেন খান বিএনপির ব্যানারে নির্বাচন করে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। নির্বাচনে সিরাজুল ইসলাম আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তার ভাগ্নেকে জয়ী করান। এর ফল হিসেবে নির্বাচনের পরদিনই তার ভাগ্নেকে দিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের পেছনের জায়গা দখল করিয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, উপজেলার পাটাভোগ ইউনিয়নের জশুরগাঁও মৌজার আরএস ৫৫ দাগের ৬৩ শতাংশ খেলার মাঠসহ ১১২ শতাংশ সরকারি জমি জাল দলিলের মাধ্যমে সরকারদলীয় লোকজনের নামে নামজারি করিয়ে সেখান থেকে ৩৩ শতাংশ জমিতে স্থানীয় এমপির স্ত্রী আভা রানী ঘোষের নামে বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য উপজেলা শিক্ষা অফিসে দানপত্রের মাধ্যমে বরাদ্দ করেন। বাকি জমি ৭৯ শতাংশ জমি প্রায় ২ কোটি টাকায় বিক্রি করে তা ভাগবাটোয়ারা করে নেন।

সিরাজুল ইসলামের ভাই মোশারফ হোসেন খোকন যে পুকুর ভরাট করেছেন, এ প্রসঙ্গে এমপির পার্টনার সিরাজুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, পুকুর থাকলে তো ভরাট করবেই। এটা দোষের কিছু না। তিনি বলেন, আমার ও আমার পরিবারের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হচ্ছে সবই মিথ্যা। যারা এসব দখল-জাল-জালিয়াতিতে যুক্ত তারা সব ম্যানেজ করে চলে। আমার ও আমার পরিবারের বিরুদ্ধে কুৎসা রটাচ্ছে। তিনি বলেন, আমি আপনাকে আগেও বলেছি, এখনো বলছি, আমি বা আমার পরিবার জমি দখলের কোনো অভিযোগ নেই। আমি কি এতই ক্ষমতাবান হয়ে গেছি, সরকারি সম্পত্তি দখল করতে পারি? অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় এসব আমার বিরুদ্ধে বলা হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমার তিন জেনারেশনের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। এমপির ব্যবসায়ী এ পার্টনার ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, শ্রীনগরে এখন সবচেয়ে ক্ষমতাধর হলেন ইউএনও, এসিল্যান্ড এবং ওসি। ইউএনও অফিস কোথায় তা আমি বলতেই পারব না। কখনোই ওই অফিসের ত্রিসীমানায় পা দেইনি।

বাংলাদেশ প্রতিদিন

Comments are closed.