রেডিও জকি: তারুণ্যের পেশা

আওলাদ হোসাইন খান শিবলী: নাগরিক জীবনের ব্যস্ততায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বড় একটি সময় কেটে যায় ট্রাফিক জ্যামে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকা যেন এক অমোঘ নিয়তি। দীর্ঘ সময়ের এই ট্রাফিক জ্যামে বসে বসে বিরক্ত হওয়া থেকে কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দিয়েছে ভার্চুয়াল কিছু বন্ধু। এফএম রেডিওগুলোতে এসব বন্ধুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে কথার মাধুর্যে মুগ্ধ করে রাখে বিভিন্ন বয়সী মানুষকে। তবে তরুণদের কাছেই এসব এফএম বন্ধুরা অনেক বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে আসছে। কেবল কথাই নয়, পছন্দের গানও শুনিয়ে থাকেন এসব বন্ধুরা। কথা আর গানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাতিয়ে রাখা এসব বন্ধুরাই হলেন রেডিও জকি, সংক্ষেপে আরজে।

বাংলাদেশে রেডিও জকি’র ধারণাটি খুব বেশি পুরোনো নয়। কয়েকবছর আগেও আমাদের এখানে অনেকেই ধারণা করতে পারেনি আমাদের দেশেও রেডিও তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করবে। গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত অবশ্য একমাত্র রেডিও চ্যানেল হিসেবে ‘বাংলাদেশ বেতার’ ধরে রেখেছিল বিপুল পরিমাণ শ্রোতা। পরে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর আগমন রেডিওর এই রাজত্বকে খর্ব করে। বেসরকারি টেলিভিশনের পাশাপাশি স্যাটেলাইট চ্যানেলের আধিক্যও রেডিও থেকে নজর সরিয়ে দেয় মানুষের। একটা পর্যায়ে রেডিও’র শ্রোতাগোষ্ঠী বিলুপ্তির পথ ধরে। এর মধ্যেই যাত্রা শুরু করে ব্যক্তিমালাকানায় উন্নত বিশ্বের মানসম্পন্ন এফএম রেডিও স্টেশন। উন্নত অনুষ্ঠান এবং উপস্থাপনের ভিন্নতা দ্রুত শ্রোতাপ্রিয় করে তোলে এইসব রেডিও স্টেশন। বলতে গেলে রেডিও বিষয়টিও প্রাণ ফিরে প্রায়। ক্রমেই শ্রোতা বাড়তে থাকে রেডিও স্টেশনগুলোর। আর রেডিও স্টেশনগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়াতে যারা মূল ভূমিকা রাখে, তারাই হলো রেডিও জকি।

এফএম রেডিও স্টেশনে প্রাণ হিসেবে রেডিও জকিরা দর্শকদের নিকট তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সচেষ্ট এবং সক্ষম হয়েছে। শুধুমাত্র বৈচিত্র্যপূর্ণ উপস্থাপনা নয় বরং শ্রোতাদের সাথে একাত্ম হয়ে অনুষ্ঠান উপস্থাপনের মাধ্যমে তারুণ্যের কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে রেডিও জকিরা। টিভি-সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের মতো এখন অনেক তরুণের মুখে মুখেই পছন্দের রেডিও জকির নাম। সেই হিসেবে অন্যসব তারকাদের মতো সকলের সামনে দৃশ্যমান না হয়েও কেবল কথার ফুলঝুড়ি ছুটিয়েও তারকায় পরিণত হয়েছেন অনেক রেডিও জকিরাই। তাই একটা সময় যেমন তরুণদের মধ্যে নায়ক-নায়িকা হওয়ার তাড়না তৈরি হয়েছে, তেমন এখন রেডিও জকি হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ে তোলার অদম্য ইচ্ছাও তৈরি হয়েছে অনেকের মধ্যেই।

রেডিও জকি কথাটি বর্তমানে বহুলভাবে প্রচলিত হলেও কিছুদিন আগেও এই পেশাটি সমন্ধে আমাদের দেশে খুব বেশি মানুষের ধারণা ছিল না। ভালো একজন রেডিও জকি তৈরিতে তেমন কোনো কর্মকাণ্ডও দেখা যায়নি কিছুদিন আগেও। তবে সময়ের সাথে সাথে তরুণদের আগ্রহ যেমন বেড়েছে এই পেশায়, তেমনি রেডিও জকি হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার মতো নানা ধরনের কর্মকাণ্ডও শুরু হয়েছে।

শিক্ষাগত ও বাড়তি যোগ্যতা
বাংলাদেশে মূলত বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত এফএম রেডিও স্টেশনে রেডিও জকিদের কাজের চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত নতুন এই পেশাতে যোগ্যতা হিসেবে বিভিন্ন রেডিও স্টেশন অনুসারে স্নাতক পাশকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়ে থাকে। তবে যোগ্যতাসম্পন্ন স্নাতক অধ্যায়নরতরাও এই পেশায় ক্যারিয়ার শুরু করার জন্য আবেদন করতে পারেন। তবে একটি কথা মাথায় রাখা প্রয়োজন, শিক্ষাগত যোগ্যতা এই পেশায় মূল নয়। বরং এই পেশায় সফল হওয়ার জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতার বাইরের অনেক বিষয়েই নজর দিতে হবে।

পরিষ্কার ও স্পষ্ট উচ্চারণ, উপযুক্ত শব্দ ব্যবহার, জড়তাহীনভাবে কথা বলার ক্ষমতা, যেকোনো প্রশ্নের উত্তর উপস্থিত বুদ্ধি সহকারে দ্রুত দিতে পারা, মিউজিক্যাল সেন্স, সেন্স অব হিউমার, নিরপেক্ষতা বজায় রেখে কথা বলা, সৃজনশীলতা প্রভৃতি গুণাবলী থাকা অত্যন্ত জরুরি একজন রেডিও জকি হওয়ার জন্য। আর প্রয়োজন সমসাময়িক বিষয়গুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা। দেশ এবং দেশের বাইরের খবরগুলোতে নিয়মিত তাই নজর রাখা দরকার। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে পেশা হিসেবে নতুনরূপে পরিচিত এই রেডিও জকিদের নিজস্বতা এবং শ্রোতাদের আকৃষ্ট করণের লক্ষ্যে স্বাতন্ত্র্য জনপ্রিয়তা অর্জনে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছে। আসলে একজন রেডিও জকিকে তার শ্রোতাবন্ধুদের মুগ্ধ করতে হয় কেবল কথার মাধ্যমেই। কাজেই নানা ধরনের মানুষকে লক্ষ্য রেখেই কথা বলতে হয় রেডিও জকিকে। বিভিন্ন মানুষের সাথে কথা বলার সেই ধরণটা অর্জন করতে হয় এই পেশার জন্য। আরেকটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, একজন রেডিও জকিই কিন্তু তার প্রোগ্রামকে জনপ্রিয় করবে। এর পুরো দায়টাই তার একারই বহন করতে হয়।

প্রশিক্ষণ
কিছুদিন আগে পর্যন্তও রেডিও জকি হতে হলে নিজ উদ্যোগের কোনো বিকল্প ছিল না। একমাত্র নিজেদের প্রচেষ্টাতেই রেডিও জকি হতে হতো। তবে সময়ের সাথে সাথে এই পেশার প্রতি তরুণ-তরুণীদের আগ্রহের কারণে বর্তমানে বেশ কয়েকটি প্রশিক্ষণ সংস্থা তৈরি হয়ে গেছে। এর মধ্যে মানসম্মত প্রশিক্ষণও প্রদান করে আসছে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান। তবে একটি কথা মনে রাখা ভালো, আপনার যদি নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস থাকে এবং যেকোনো বিষয়কে আপনি যদি সকলের নিকট সঠিক শব্দচয়নের মাধমে উপস্থাপন করার যোগ্যতা রাখেন, তবে আপনি সরাসরি যেকোনো রেডিও স্টেশনে যোগাযোগ করতে পারেন রেডিও জকি হিসেবে কাজ করার জন্য। আপনার স্বাতন্ত্র্য এবং উপস্থাপনের কৌশলই আপনাকে এই পেশাতে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম।

আয়-রোজগার
বাংলাদেশে এই পেশাটি তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও এই পেশায় ভালো করার বেশ সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন রেডিও স্টেশন সূত্রে জানা যায়, প্রাথমিকভাবে একজন রেডিও জকি পার্টটাইম এবং ফুল টাইম—দুইভাবেই কাজ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সাধারণ সময়সীমা ব্যতীত তাদেরকে সুনির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী কাজ করে যেতে হয়। পার্টটাইম হিসেবে একজন আরজেকে তিন ঘণ্টা অনুষ্ঠান পরিচালনা করার লক্ষে কমপক্ষে পাঁচ ঘণ্টা অফিস করতে হয়। আর ফুল টাইমের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা ৮ ঘণ্টা বা তার চেয়ে বেশি হয়ে থাকে। শুরুর দিকে রেডিও জকিদের বেতন হয়ে থাকে ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে এ ক্ষেত্রে আরজেদের দক্ষতা এবং জনপ্রিয়তা ভূমিকা রাখে। আর সময়ের সাথে সাথে বেতনও বাড়তে থাকে।

যোগাযোগের উপায়
আপনি যদি নিজেকে ভবিষ্যতে জনপ্রিয় আরজে হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান তবে প্রথমেই আপনাকে ভাবতে হবে আপনি এই পেশার জন্য কতটা নিজেকে যোগ্য বলে মনে করেন। সেই সাথে আপনার যদি উচ্চারণে স্পষ্টতা এবং যেকোনো বিষয়ে কথা চালিয়ে নেওয়ার যোগ্যতা থাকে, তবে আপনি এই পেশাতে যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। বাংলাদেশে বেসরকারি রেডিও স্টেশনসমূহে সরাসরি যোগাযোগ করে অথবা ডাকযোগে আপনার জীবনবৃত্তান্ত এবং নিজের আগ্রহ এবং দক্ষতা বর্ণনা করে একটি আবেদনপত্র পাঠিয়ে রাখতে পারেন। আপনার যোগ্যতা এবং আগ্রহ এই পেশাতে আপনাকে নির্বাচনের ক্ষেত্রে রেডিও স্টেশনসমূহকে সহায়তা করবে। এ ছাড়া রেডিও স্টেশনগুলো তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিজ্ঞাপনও দিয়ে থাকে। সেগুলোর দিকেও নজর রাখতে হবে। বিজ্ঞাপনের নির্দেশনা অনুযায়ী আবেদন করলে এরপর কেবল স্টেশনগুলোর পক্ষ থেকে ডাকের অপেক্ষা।

সময়ের সাথে সাথে যেভাবে রেডিও স্টেশনের সংখ্যা বাড়ছে এবং রেডিও জকিদের চাহিদা তৈরি হচ্ছে, তাতে করে এই পেশাতে আপনার আগ্রহ এবং দক্ষতা আপনাকে ভালো একটি ক্যারিয়ারের দিকে ধাবিত করতে পারে।

মুন্সিগঞ্জের সময়

Comments are closed.