মুক্তিপণ : মালয়েশিয়ায় অপহরণ করে দেশে মুক্তিপণ আদায়!

৩ নারীসহ ৭ জন নারায়ণগঞ্জে গ্রেফতার
ঢাকার দক্ষিণখান এলাকার ব্যবসায়ী ফয়েজ আহম্মেদ (৬৬) গত ২৩ জুলাই ব্যবসায়িক কাজে মালয়েশিয়া যান। এয়ারপোর্ট থেকে বের হওয়ার পর ওই দিন সকালেই তিনি সেখানে অপহৃত হন। এরপর অপহরণকারীরা ব্যবসায়ী ফয়েজের পরিবারের কাছে ফোন করে তার মুক্তিপণ বাবদ ১ কোটি টাকা দাবি করে। ফয়েজ আহম্মেদের পরিবার ৩ দফায় মোট ২৮ লাখ টাকা অপহরণকারীদের এ দেশীয় সহযোগীদের কাছে পেঁৗছে দেয়। ২৭ দিন পর ১৮ আগস্ট অপহরণকারীরা ফয়েজ আহম্মেদকে ছেড়ে দিলে ১৯ আগস্ট ফয়েজ আহম্মেদ বাংলাদেশে চলে আসেন। বর্তমানে তিনি ঢাকায় একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

মালয়েশিয়ায় ব্যবসায়ী ফয়েজ আহম্মেদকে অপহরণের মূল হোতা লোকমানের স্ত্রী, বোন, ভগি্নপতি, ভাগ্নেসহ ওই চক্রের এ দেশীয় ৭ সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। তাদের কাছ থেকে ব্যবসায়ী ফয়েজ আহম্মেদের পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ বাবদ আদায় করা ২৮ লাখ টাকার মধ্যে ১৪ লাখ ৯৯ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। গত ১৯ ও ২০ আগস্ট অভিযান পরিচালনা করে নারায়ণগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর এলাকা থেকে ওই চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারকৃতরা হলো_ ব্যবসায়ী ফয়েজ আহম্মেদকে অপহরণের মূল পরিকল্পনাকারী মালয়েশিয়া প্রবাসী লোকমানের স্ত্রী শাকিলা আক্তার (৩০), লোকমানের বোন আলেয়া বেগম (৪৫), আলেয়া বেগমের স্বামী আবুল কালাম আজাদ (৫২), লোকমানের ভাগ্নে আল-আমিন আশিক (২৬), আলেয়ার উকিল ভাই আবদুল্লাহ (৩৬), মালয়েশিয়ায় ব্যবসায়ী ফয়েজকে অপহরণে লোকমানকে সহায়তাকারী জনির মা মাহমুদা পারভীন (৫০) ও হুন্ডি ব্যবসায়ী আওলাদ হোসেন (৩০)। তাদের মধ্যে শাকিলা, আলেয়া, আবুল কালাম, আল-আমিন ও আওলাদ হোসেনের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর এলাকায়। মাহমুদা পারভীনের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল থানায় এবং আবদুল্লাহর বাড়ি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার উত্তর মাসদাইরের গাবতলী এলাকায়।

গতকাল শুক্রবার সকালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজীতে র‌্যাব-১১-এর প্রধান কার্যালয়ে গ্রেফতারকৃতদের উপস্থিতিতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-১১-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল আনোয়ার লতিফ বলেন, গত ২৩ জুলাই মালয়েশিয়ায় ব্যবসায়ী ফয়েজ আহম্মেদ অপহৃত হওয়ার পর ঘটনা জানিয়ে ফয়েজের পরিবার দক্ষিণখান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করে। ঘটনাটি মালয়েশিয়ায় হওয়ায় পুলিশ কিছু করতে পারেনি। এ অবস্থায় অপহরণকারীদের অব্যাহত হুমকির কারণে ফয়েজের পরিবার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে না জানিয়েই নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া রেল গেটসংলগ্ন এলাকায় অপহরণকারীদের এক সহযোগীর কাছে ১৩ লাখ টাকা পেঁৗছে দেয়। তবে অপহরণকারীরা ফয়েজের মুক্তির জন্য ১ কোটি টাকার পরিবর্তে পরে ৫০ লাখ টাকা পরিশোধের জন্য চাপ দিলে ভিকটিমের পরিবার পরে আরও দুই দফায় ১০ ও ৫ লাখ টাকা করে মোট ১৫ লাখ টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পরিশোধ করে। তিন দফায় মোট ২৮ লাখ টাকা পরিশোধের পর মালয়েশিয়াতে ১৮ আগস্ট সন্ধ্যায় ব্যবসায়ী ফয়েজকে ছেড়ে দেওয়া হলে তিনি ১৯ আগস্ট বাংলাদেশে ফিরে আসেন। মালয়েশিয়াতে বন্দি থাকা অবস্থায় ভিকটিমের ওপর শারীরিক নির্যাতন করা হয়। বর্তমানে তিনি ঢাকায় একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন।

এর আগে ভিকটিমের পরিবারের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে ১৬ আগস্ট র‌্যাব-১১-এর কাছে এ ব্যাপারে অভিযোগ করা হলে র‌্যাব কার্যক্রম শুরু করে। গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি আসামিদের ব্যাপারে খোঁজ-খবর ও ব্যাংক লেনদেনের বিষয়গুলো নিশ্চিত হওয়ার পর ১৯ ও ২০ আগস্ট দুই দিনব্যাপী অভিযান পরিচালনা করে নারায়ণগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর এলাকা থেকে ওই ৭ জনকে গ্রেফতার করে মুক্তিপণের ১৪ লাখ ৯৯ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।

মুক্তিপণ বাবদ ২৮ লাখ টাকা মালয়েশিয়ায় অবস্থিত মূল অপহরণকারী লোকমানের নির্দেশনা অনুসারে বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও বিকাশের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়। এ ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া শাখা এবং ন্যাশনাল ব্যাংকের শ্রীনগর শাখা ব্যবহার করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, অপহৃত ফয়েজ আহম্মেদ ব্যবসার কাজে ২ বছর ধরে নিয়মিতভাবে মালয়েশিয়া যাতায়াত করতেন। আসামিরা দীর্ঘদিন ধরে তাকে অনুসরণ করে এবং তার পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য খোঁজ-খবর নিয়ে তাকে অপহরণ করে। অপহরণকারী চক্রের সদস্য লোকমান হোসেন, ফখরুদ্দীন আলী আহমেদ জনি ও মো. শরিফ মালয়েশিয়া প্রবাসী।

সমকাল

Comments are closed.