বেদে : সিরাজদীখানের বেদে পরিবার নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত

আধুনিক সভ্যতার অগ্রযাত্রায় সিরাজদীখানের বেদে পরিবারগুলো এখন অতিকষ্টে দিনাতিপাত করছে। নগরায়নের এই যুগে ঢাকার পাশের জেলা মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলাটি অতি দ্রুত শহরায়ন হয়ে উঠছে। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন মার্কেট, গড়ে উঠেছে আধুনিক দোকানপাট। তাই গাঁয়ের পথে ঝুড়ি মাথায় কিংবা কাঁধে লম্বা ব্যাগ ঝোলানো বেদে পরিবারের সদস্যদের আগের মতো চুড়ি ও ফিতা বিক্রি করতে দেখা যায় না। সভ্যতার অগ্রযাত্রায় ব্যস্ত এ সময়ে মানুষ আর আগের মতো জড়ো হয়ে সাপ খেলা দেখার সময় পায় না। তাছাড়া ডিশ অ্যাটেনার আর ইন্টানেটের এই যুগে মিডিয়াগুলো অহরহ সাপ নিয়ে মেগা সিরিয়াল তৈরি করায় সাপ খেলা দেখার আগ্রহও মানুষের এখন নেই বললেই চলে। তাছাড়া নগরায়নের ফলে সিরাজদীখানের নদী, খাল ও ডোবা দখল করে গড়ে তোলা হচ্ছে বিভিন্ন স্থাপনা। এতে পাখিদের আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে, প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক পাখি। এর ফলে বেদেদের আদি পেশা পাখি শিকারও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বিপাকে পড়েছে সিরাজদীখান উপজেলার বেদে পরিবারগুলো। এ উপজেলার দুটি বেদে পল্লীতে ভিন্ন ধারার পরিবেশ বিরাজ করছে। একটি পল্লী আধুনিক সভ্যতার সঙ্গে এগিয়ে চললেও অপরটি এখনও পশ্চাদমুখীই রয়ে গেছে।

উপজেলার সদর থেকে ৮ কিলোমিটার পূর্বে মালখানগর ইউনিয়নের তালতালা বাজারের পেছনে ইছামতি নদীতে ভাসমানভাবে ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকায় অতি কষ্টে দিনাতিপাত করছে ৬০টি বেদে পরিবার। বংশ পরম্পরায় এ নদীতে বসবাস করে আসছে ওই বেদে পরিবারগুলো। ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে শরণার্থী আরাকান রাজ বল্লার রাজার সঙ্গে বেদেরা প্রথম মুন্সীগঞ্জ জেলার এই সিরাজদীখান উপজেলায় আসে। তখন এ নদীর পুরো যৌবন ছিল। নদীটিতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এই নদীকে ঘিরে চারপাশে সুবিশাল গাছ ছিল। এই গাছ ও নদীতে প্রচুর পাখি পাওয়া যেত, যা শিকার করে বেদেরা একদিকে অর্থ উপার্জন করত, অন্যদিকে নিজেদের চাহিদা পূরণ করত। কিন্তু কালের আবর্তে এ নদীটি এখন চর পড়ে নিশ্চিহ্ন প্রায়।

এদিকে, উপজেলার শেখেরনগর ইউনিয়নের ঘনশামপুর গ্রামের ইছামতি নদীতে ৪০টি পরিবার বসবাস করছে। আর নদীর পাশে গ্রামের ভূখণ্ডে ঘর তুলে বসবাস করছে আরও ২৫টি পরিবার। ভূখণ্ডে বসবাসকারী ২৫টি পরিবার এখন আর তাদের আদি পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত নেই। তারা ব্যবসা-বাণিজ্য, চাষাবাদসহ তাদের ছেলেমেয়েদের বিদেশ পাঠিয়ে ভালো উপার্জন করছেন। গ্রামের অন্য পরিবারের সদস্যদের মতো ছেলেমেয়েদের উন্নত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলছেন। তবে ইছামতি নদীতে নৌকায় বসবাসকারী ৪০টি বেদে পরিবার এখনও মাছ ধরে, মেলায় মেলায় মাটির তৈরি খেলনা বিক্রি, ঝোলা হাতে গ্রামগঞ্জে ঘুরে বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি, তাবিজ-শিঙ্গা লাগিয়ে আদি পেশায় অর্থ উপার্জন করে অতিকষ্টে দিনাতিপাত করছে।

তবে আগের মতো মাথায় চুড়ির ঝুড়ি নিয়ে বেদে পরিবারগুলোর সদস্যদের বর্তমানে অহরহ বের হতে না দেখা গেলেও কাঁধের মধ্যে একটি ঝোলা নিয়ে প্রতিদিনই তাদের দেখা যায় উপজেলার ব্যস্ততম বাস, বেবিস্ট্যান্ড কিংবা বড় কোনো বাজার-হাটে। তাদের কাঁধে একটি ঝোলা থাকলেও তারা কিছু বিক্রি না করে পথযাত্রীদের হাতে ধরে কাপড় টেনে ‘এ ভাই ১০টা টাকা দে’ বলে ঘেরাও করছে। মাঝে মধ্যে ২-৩ জন মিলে পথচারীদের টাকার জন্য ঘিরে ধরছে। সিরাজদীখান বাজারে ঝোলা কাঁধে বের হওয়া বেদে পরিবারের সদস্য হোসনে আরা বেগম (৫৫) বলেন, ‘আমাদের কাছ থেইক্কা মানুষ আগে চুড়ি-ফিতা কিনলেও এখন বাড়ির বউ-ঝিরা হাট-বাজারে গিয়া কিনে।

তালতলা এলাকায় বসবাসকারী বেদে পরিবারের সদস্যরা জানান, নারীদের আগের মতো গ্রামেগঞ্জে চুড়ি, ফিতা বিক্রি, শিঙ্গা লাগানো, তাবিজ বিক্রি কিংবা সাপ খেলা দেখানো পেশায় এখনও কোনো উপার্জন নেই বললেই চলে। তবে বিভিন্ন গ্রামীণ মেলায় ছোট ছোট দোকান বসিয়ে খেলনা থেকে শুরু করে মাটির বিভিনি্ন সামগ্রী, চুড়ি, ফিতা ও নেলপলিশ বিক্রি করে এখনও কিছুটা উপার্জন হয় তাদের।

উপজেলা চেয়ারম্যান মহিউদ্দিনের সহযোগিতায় তালতলার বেদে পল্লীর ১২০ বেদে ভোটার হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এদিকে ঘনশামপুর গ্রামে বসবাসকারী ২৫০ বেদে সদস্য ভোটার হয়েছেন। এতে তাদের একটি নির্দিষ্ট পরিচয় এবং তাদের সদস্যদের চিহ্নিত করার ব্যবস্থা হয়েছে। ফলে একদিকে যেমন অপরাধী নির্ণয় করা সহজ হয়েছে, অন্যদিকে তাদের বয়স্কভাতা, বিধবা ভাতা, গর্ভকালীন ভাতাসহ নাগরিক সুবিধা দেওয়া সহজ হচ্ছে।

তালতলা বেদে পল্লীর সর্দার মিনহাজ উদ্দিন জানান, ভোটার হওয়া সত্ত্বেও সব ধরনের নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। তাদের দাবি, দেশের সব নাগরিকের মতো তাদেরও সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হোক।

ইউএনও রওনক আফরোজা সোমা জানান, বেদেদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে তাদের সব ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা দানের চেষ্টা চলছে। সরকারি সব সুযোগ-সুবিধাই তাদের পর্যায়ক্রমে দেওয়া হচ্ছে।

সমকাল

Comments are closed.