প্রমত্তা পদ্মায় ফেরির ভরসা বাঁশ!

* বাঁশ দিয়ে গভীরতা মেপে চলতে হচ্ছে ফেরিগুলোকে
* অস্বাভাবিক স্রোত আর পলিতে বিপর্যস্ত নাব্যতা
প্রমত্তা পদ্মা এখন ঢেউয়ে উত্তাল। স্রোত দেখলে বুকে কাঁপন ধরে। তার মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে চলছে ফেরি, লঞ্চ, ট্রলার। থেকে থেকে ছুটে যায় স্পিডবোট। হালকা হওয়ায় স্পিডবোটগুলো ঢেউ কেটে দ্রুত ছুটলেও উল্টো চিত্র ফেরির ক্ষেত্রে। বাস-ট্রাকসহ যাত্রী ও পণ্যবাহী অন্যান্য পরিবহন বোঝাই ফেরিগুলো মাঝনদীতে গিয়ে রীতিমতো আটকে যাচ্ছে। কোনো কোনোটা সামনে না গিয়ে উল্টো স্রোতে ভেসে আসে পেছনের দিকে। মাঝেমধ্যে ফেরি থেকে পানিতে ফেলা হচ্ছে বাঁশ। তা দিয়ে চলে গভীরতা মাপার চেষ্টা। কিন্তু ভরা পদ্মায়ও সেই বাঁশ ডোবে না, কোথাও এক ‘বাম’ (চার হাত), কোথাও বা দেড় ‘বাম’ মাত্র পানি। আর এই পানির মধ্যেই হঠাৎ হঠাৎ ডুবোচরে আটকে যায় একেকটি ফেরির তলদেশ। নানা কসরত করে কোনোটা দ্রুত ছাড়া পেলেও কোনোটি আবার শত শত যাত্রী কিংবা পণ্যবাহী পরিবহন নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকে মাঝনদীতে। ফলে মাওয়া-কাওড়াকান্দি রুট হয়ে ঢাকা থেকে খুলনা-বরিশালসহ পুরো দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার সড়কপথের যাত্রীদের পড়তে হয় সীমাহীন দুর্গতির মুখে।

গত বৃহস্পতিবার সকাল ৭টায় মাওয়া ঘাট থেকে কাওড়াকান্দি হয়ে দক্ষিণাঞ্চলমুখী যাত্রী ও পণ্যবাহী পরিবহন নিয়ে মাঝনদীতে আটকে যায় ফেরি ক্যামেলিয়া। বাঁশ ফেলে পানি মেপে মেপে পথ চলতে গিয়েও রক্ষা পায়নি সেটি। দীর্ঘ সময় আটকে থাকার পর উল্টো স্রোতে ফেরিটি ছাড়া পেলেও আর সামনে এগোতে পারেনি, বরং ফিরে আসতে হয় মাওয়া ঘাটে। অন্য ফেরিগুলোকে যেতে হয় ঝুঁকি নিয়ে বাঁশ ফেলে এদিক সেদিক ঘুরে। কোনো কোনো ফেরি দেড় ঘণ্টার পথ যেতে সময় নেয় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। পরিস্থিতির মুখে গতকাল শুক্রবার ওই রুটের ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। রাতদিন ওই এলাকায় ড্রেজিং করেও কুলানো যাচ্ছে না। একদিকে ড্রেজিং চললে আরেকদিক ভরে ওঠে পলিতে। কর্তৃপক্ষ এর সমাধান খুঁজে পায়নি দীর্ঘদিনেও।

বৃহস্পতিবার একটি ফেরির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী কালের কণ্ঠকে নিজের হাত দেখিয়ে বলেন, ‘এমনিতেই বুড়া ফেরি। দুইডা ইঞ্জিন দিয়াও কাম অয় না। স্রোতের ধাক্কা সামাল দিতে পারে না। ১০ ফুট সামনে যাইয়া আবার ২০ ফুট পিছাইয়া যায়। হের ওপরে নিচে আবার পানি নাই। এট্টু অইলেই চরে বাইজ্যা যায়। এই দ্যাহেন বাঁশ মারতে মারতে হাতের তালু ফাইট্টা গেছে গা।’

বাঁশ দিয়ে পদ্মার গভীরতা মেপে এগিয়ে চলেছে ফেরি।

ওই কর্মী জানান, এক বাম বলতে চার হাত মাপ। পানি এক বামের নিচে হলে ফেরিগুলো আর চলতে পারে না, ডুবোচরে আটকে যায়।

সাধারণ ফেরির পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বহনকারী ফেরিগুলোকেও চলতে হয় বাঁশ দিয়ে গভীরতা মেপে মেপে। গতকাল সকালে একজন সংসদ সদস্য ও একজন বিচারপতিকে বহনকারী একটি ছোট্ট ফেরি ঢাকা থেকে কাওড়াকান্দি যাওয়ার সময় মাঝপথে আটকে যায়। কয়েক দফা সামনে-পেছনে ঘুরে পরে সেটি ছাড়া পায়। ওই ফেরিতে লাশ বহনকারী দুটি অ্যাম্বুল্যান্সও ছিল। ফেরিতে থাকা একটি গাড়ির চালক মাহবুব বলেন, ‘লাশ ও ভিআইপিদের নিয়া যাতে তাড়াতাড়ি যাওয়া যায় এই জন্যই এই ছোট্ট ফেরিটায় আমাদের ওঠানো হয়। কিন্তু ফেরিটি মাঝনদীতে গিয়ে শুরু করে বাঁশ মাপা। আবার কিছুক্ষণ পর পর পেছনের দিকে চলে যায়। ফলে প্রায় তিন ঘণ্টা লেগেছে নদী পার হতে।’

জানতে চাইলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডাব্লিউটিসি) চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একদিকে প্রচণ্ড স্রোত, অন্যদিকে ডুবোচর- এই দুই সমস্যায় মাওয়া-শিমুলিয়া বা কাওড়াকান্দি রুটে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা মাঝেমধ্যেই পরিস্থিতির মুখে ফেরি সার্ভিস বন্ধ রাখতে বাধ্য হই।’

বিআইডাব্লিউটিসির চেয়ারম্যান আরো জানান, ওই রুটে ১৭টি ফেরি ইন সার্ভিস রয়েছে। কোনোটিই ঠিকভাবে চলতে পারছে না স্রোত ও চরের কারণে। বিশেষ করে ওই রুটে থাকা চারটি রো রো ফেরি চলতে পারলেও মানুষের ভোগান্তি অনেক কমে যেত। একদিকে ড্রেজিং চললেও পলি জমে ওঠার মাত্রা আগের চেয়ে বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডাব্লিউটিএ) প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল মতিন গতকাল শুক্রবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, এখন ওই এলাকায় চারটি ড্রেজার ইউনিট কাজ করছে। তবু আশা অনুযায়ী ফল পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে স্রোতের কারণে কেটে কুলানো যায় না। একদিক থেকে কাটা হলে আরেক দিক থেকে পলি এসে তা দ্রুত ভরিয়ে দেয়। এ ছাড়া কোথাও প্রচণ্ড স্রোতের কারণে ঠিকমতো ড্রেজার ইউনিট অবস্থান নিতে পারে না। আবার অল্প পানির কারণেও কোথাও কোথাও কাজ করা যায় না।

পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজেরও কিছুটা প্রভাব রয়েছে, উল্লেখ করে আব্দুল মতিন বলেন, পদ্মা সেতুর একটি পাইলিংয়ের কাজের কারণে স্রোত বাধাগ্রস্ত হয়ে আগের চেয়ে বেশি পলি সরে যাচ্ছে ফেরি চলাচলের নির্ধারিত চ্যানেলের দিকে। সেতু কর্তৃপক্ষ নৌপথে নিজেদের নির্মাণ সরঞ্জাম আনা-নেওয়ার কাজে নিজেদের মতো একেকটি চ্যানেল খনন করেছে। ওই চ্যানেলের কারণেও অতিরিক্ত স্রোতসহ পলির বিস্তৃতি ঘটছে। এ নিয়ে আগামী শুক্রবার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান গতকাল নিজ মন্ত্রণালয়, বিআইডাব্লিউটিএ, বিআইডাব্লিউটিসি ও পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের নিয়ে মাওয়া-শিমুলিয়া-কাওড়াকান্দি এলাকার নদীর পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি দ্রুত পরিস্থিতি সমাধানে উপস্থিত কর্মকর্তাদের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন।

কালের কন্ঠ

Comments are closed.