মৃণাল শিবিরে আ’লীগ সভাপতির স্বজনরা: অস্থিতিশীল পরিস্থিতির আশঙ্কা!

মোজাম্মেল হোসেন সজল: আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে মুন্সীগঞ্জ আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়ে গেছে। চাওয়া-না পাওয়া, লাঞ্চনা-বঞ্চনা ও প্রাসাদ ষড়য়ন্ত্রের শিকার মুন্সীগঞ্জের রাজনীতি হাওয়া এখন উল্টো দিকে। রাজনীতির এ খেলায় জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির নিকট আতয়-স্বজনরা নিজেদের ঘর ছেড়ে মুন্সীগঞ্জ-৩ (সদর-গজারিয়া) আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট মৃণাল কান্তি দাসের শিবিরে ফিরে যাচ্ছেন।

এরইমধ্যে এর আলামত ফুটে উঠেছে। আলামত হিসেবে আগামীকাল ১৫ ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শোক দিবসে শহরের থানারপুল এলাকায় গণভোজের আয়োজনের মধ্য দিয়ে সংসদ সদস্য এডভোকেট মৃণাল কান্তি দাসের পক্ষে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির নিকট আত্মীয়-স্বজনরা ব্যাপক শো-ডাউন করার প্রস্তুতি নিয়েছেন। ইতোমধ্যে শহরের মধ্যাঞ্চল হিসেবে পরিচিত থানারপুলসহ বিভিন্ন স্থানে প্রচারে একাধিক তোরণ লাগানো হয়েছে।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের খালাতো ভাইয়ের ছেলে (ভাতিজা) ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান” সংগঠনের জেলা কমিটির সভাপতি ও বিলুপ্ত বাকশালের মাঠ কাঁপানো নেতা রেজাউল ইসলাম সংগ্রাম এক ঝাঁক নেতা কর্মী নিয়ে সংসদ সদস্য মৃণাল কান্তি দাসের শিবিরে ফিরে যাচ্ছেন। এর ফলে মুন্সীগঞ্জ শহরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি দু’টি শিবিরে দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চল-উত্তরে বিভক্ত হয়ে পড়ছে।

দক্ষিণের রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ও তার ভাই মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনিসুজ্জামান আনিস। তাদের উত্তরসূরি হিসেবে মুন্সীগঞ্জের রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধুর চিফ সিকিউরিটি গার্ড মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের বড় ছেলে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহ-সম্পাদক ফয়সাল বিপ্লব। ফয়সাল বিপ্লব আসন্ন মুন্সীগঞ্জ পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে নির্বাচন করবেন বলে আগে থেকে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির পক্ষ থেকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষিত আছে। অন্যদিকে, আনিসুজ্জামান আনিসের বড় ছেলে জেলা যুবলীগের সভাপতি আক্তারুজ্জামান রাজিব ও ছোট ছেলে রাজন স্থানীয় রাজনীতিতে চাচাতো ভাই বিপ্লবের সাথে যৌথভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আবার রাজীবও প্রার্থী হতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে।

এদিকে, শহরের মধ্যাঞ্চল ও উত্তরের রাজনীতির নেতৃত্বে রয়েছেন মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মৃণাল কান্তি দাস। তাকে নিয়ে এখানে গড়ে উঠেছে আওয়ামী লীগের আরেকটি শক্তি। দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে আওয়ামী লীগের রাজনীতে যে সব নেতা কর্মী বঞ্চিত হয়েছেন, তারা উত্তরের রাজনীতির শিবিরে ফিরে আসছেন বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।

এক সময়ের বাকশালের রাজনীতির সাথে পূর্বে যারা জড়িত ছিলেন সেইসব এক ঝাঁক নেতা উত্তরের রাজনীতির চালিকা শক্তির ক্ষমতা ধর হয়ে উঠছেন। এর ফলে এখানকার রাজনীতি অনেকদিন পর জমে উঠেছে।

মূলত আসন্ন পৌর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই মেরুকরণ হচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। উত্তরের শিবির থেকে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা মাহতাবউদ্দিন কল্লোল মেয়র পদে প্রার্থী করা হতে পারে বলে খবর পাওয়া। নির্বাচনে বিজয়ের লক্ষ্যে তারা পৌর নির্বাচনে নামবে। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যারা নানাভাবে বঞ্চিত তাদেরকে এখানে বিড়ানোর চেষ্ঠা করা হচ্ছে। এমন অনেকেই আছেন, যারা মহিউদ্দিন-আনিসের আওয়ামী লীগের রাজনীতি পছন্দ করেন না-তাদেরকে এরা তাদের শিবিরে টানতে চেষ্ঠা করছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। ফয়সাল বিপ্লবের মেয়র পদে নির্বাচন ঠেকাতে অনেকেই এই শিবিরে ফিরে আসছেন।

এদিকে, বিরোধীতার কারনে গেল সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে ও মুন্সীগঞ্জ পৌরসভায় মেয়র পদে নির্বাচন করে পরাজিত হন। উপজেলা নির্বাচনে চাচা আনিসুজ্জামানের কাছে পরাজিত হন ভাতিজা ফয়সাল বিপ্লব। পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের প্রার্থী দুইজন ছিলেন। ওই নির্বাচনে শহর বিএনপির সভাপতি ও ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এ, কে, এম ইরাদত মানু জয়লাভ করে বর্তমানে মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন।

এদিকে, আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে বঞ্চিত ও জেলা আওয়ালীগের সভাপতি মো. মহিউদ্দিনের খালাতো ভাই, সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান, জেলা বাকশাল সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হোসেন বাবুল, ভাতিজা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান রেজাউল ইসলাম সংগ্রাম, সংগ্রামের ছোট ভাই জেলা আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজম্মলীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম সোহাগ, মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের ভাগিনা আওয়ামী লীগ নেতা শহীদুজ্জামান শহীদ, শাহীন রেজা কাজল ও সাইদুর রহমান অপু রয়েছেন উল্লেখ্যযোগ্য ভুমিকায়। এর ফলে এখানকার আওয়ামী লীগের রাজনীতির বিশাল একটি অংশ ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্ঠা করছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। এরা সবাই মধ্যাঞ্চল ও উত্তর দিকে ধাবিত হচ্ছেন। সেই শিবিরের নেতৃত্বে রয়েছেন সংসদ সদস্য এডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস। আগামীকাল ১৫ আগস্ট সকাল ১০ টায় মুক্তিযোদ্ধার সন্তান সংগ্রামের নেতৃত্বে তারা মোটরসাইকেল বহর নিয়ে তারা আনুষ্ঠিকভাবে সংসদ মৃণাল কান্তি দাসের গ্রুপে যাচ্ছেন বলে মুন্সীগঞ্জ বার্তা ডটকমকে রেজাউল ইসলাম সংগ্রাম জানিয়েছেন।

এদিকে, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির স্বজনরা তার বিরোধী মৃণাল কান্তি দাসের গ্রুপে যাওয়ার ঘটনা শহরসহ পুরো জেলা জুড়ে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে।
ওদিকে, অনেক দিন ধরে রাজনীতিতে যিনি নিজেকে ঘুটিয়ে রেখে ছিলেন সেই এক সময়ের তুখোর রাজনীতিবিদ মাহতাব উদ্দিন কল্লোল আবার রাজনীতিতে তিনি ফিরে এসেছেন। মাহতাব উদ্দিন কল্লোল তার সময়ের রাজনীতির সাথে জড়িত সেই সব নেতাদের একত্তিত করার চেষ্ঠা করছেন।

মাহতাব উদ্দিন কল্লোল এক সময়ে মুন্সীগঞ্জ শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরে তার কাছ থেকে মহিউদ্দিন গং তার সেই পদ অগণতান্ত্রিকভাবে ছিনিয়ে নিয়ে যায় বলে তার সমর্থকদের অভিযোগ। মাহতাব উদ্দিন কল্লোল মৃণাল কান্তি দাসের অনুসারি।

ওদিকে, মুন্সীগঞ্জ শহরের সন্ত্রাসী শাহজালাল দলবল নিয়ে হামলা করে ভাগিনা সাইদুর রহমান অপুর ওপর। এর বিচার চেয়ে বিচার পায়নি অপু। মনের দু:খে অপু ফিরে যাচ্ছেন মৃণাল কান্তি দাসের শিবিরে।

মহিউদ্দিনের আপন ভাতিজা তাপস হত্যার আসামি করা হয় মহিউদ্দিনসহ তার ভাগিনা শাহীন রেজা কাজলকে। সেই সময় কাজলের ওপর নানা রকমের অত্যাচার করা হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে কাজল কোন রির্টান পাননি। এটা তার মনে ক্ষোভ রয়েছে। এই ক্ষোভে কাজল মামার শিবির ছেড়ে ফিরে যাচ্ছেন মৃণাল কান্তি দাসের শিবিরে। এই সব নিয়ে মুন্সীগঞ্জ শহরে আলোচনার ঢেউ জমে উঠেছে।

মোহাম্মদ হোসেন বাবুল ও তার স্বজনরা বার বার আওয়ামী লীগের রাজনীতির হাল ধরতে চেয়েছেন। কিন্তু প্রসাদ ষড়যন্ত্রের কারণে তিনি আজও তা পারেননি। বরং পদে পদে তাকে অপমানিত হতে হয়েছে। তাই মনের কষ্টে তিনি জীবনের শেষ সময়ে ফিরে যাচ্ছেন মৃণাল কান্তি দাসের শিবিরে-এই রকম খবর ঘুরে ফিরছে মুন্সীগঞ্জের আকাশে বাতাসে। অবশ্য রেজাউল ইসলাম সংগ্রামও মুন্সীগঞ্জ বার্তা ডটকমের কাছে এর সত্যতা স্বীকার করেছেন।

এদিকে, এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ বছর পর শহরের মধ্যাঞ্চল ও উত্তরে আসছে নেতৃত্ব। শহরের হাটলক্ষীগঞ্জ এলাকায় শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি জালাল উদ্দিন কমিশনারের মৃত্যুর পর মধ্যাঞ্চল ও উত্তরে নেতাশূণ্য হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ বা বিএনপিতে নেতৃত্ব দেবার মতো কোন নেতা তৈরী হয়নি।
অন্যদিকে, আগামী নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপি থেকে ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, বর্তমান মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার ওদিকে, মেয়র ও শহর বিএনপির সভাপতি এ.কে.এম ইরাদত মানু আবারও প্রার্থী হতে যাচ্ছেন। এই মুহুর্তে বিএনপি থেকে তেমন যোগ্য প্রার্থী না থাকায় বর্তমান মেয়র এ.কে.এম ইরাদত মানুর নামই বেশ আলোচনায় আসছে।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা

Comments are closed.