বৃক্ষরোপণ : শিক্ষার্থীদের টাকায় চারা কিনে বৃক্ষরোপণ অভিযান!

মঈনউদ্দিন সুমন: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে জেলাজুড়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আয়োজন করেছে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক ফাউন্ডেশন। জেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের তিন লাখ শিক্ষার্থীর মাধ্যমে ছয় লাখ চারা বিতরণ করেছে জেলা প্রশাসন। আর এ জন্য জেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চারাপ্রতি ১০ টাকা থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে।

বৃহস্পতিবার জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মরণে বৃক্ষ বিতরণ ও রোপণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কয়েকজন শিক্ষার্থীর হাতে গাছের চারা তুলে দেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী। জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জেলা প্রশাসন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক সাইফুল হাসান বাদল।

কৃষিমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে আজ চারা তুলে দিলেও বিদ্যালয়গুলোতে এসব চারা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলেছে চলতি সপ্তাহজুড়ে। একাধিক অভিভাবক চারার বিনিময়ে টাকা নেওয়ার বিষয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

অভিভাবকরা জানান, গত বছরও একইভাবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে চারা বিতরণের নামে অর্থ আদায় করা হয়েছে। চলতি বছর ‘বৃক্ষরোপণে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার ২০১৪’ পেয়েছেন মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক সাইফুল হাসান বাদল।

জেলা প্রশাসনের সূত্রমতে, ছয়টি উপজেলায় ৭৭৫টি বিদ্যালয়ে তিন লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে একটি ফলদ ও একটি বনজ গাছের চারা বিতরণ করা হয়।

ইদ্রাকপুর ১ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র আমির হোসেন জিদান বলেন, ‘আমার ক্লাসে সবাইকে ১০ টাকা করে জমা দিতে বলা হয়েছে। গাছের চারা দেবে বলে, তাই দিয়েছি।’ একই শ্রেণির মো. হোসেন জানান, ‘আমিও ১০ টাকা দিয়েছি। আজ গাছের চারা দেবে।’

মুন্সীগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র আরাফাত আরমান বলেন, ‘বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ৪০ টাকা নিয়েছেন দুটি গাছের জন্য। একই বিদ্যালয়ের সৌরভ ষষ্ঠ শ্রেণি ও সপ্তম শ্রেণির সাকিবকে ৪০ টাকা করে দিয়ে চারা সংগ্রহ করতে হয়েছে।

উত্তর ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী হাবিবা ও রুমা আক্তার সুমাইয়া বলে, ‘১০ টাকা করে আপা নিয়েছে। গাছের চারা দিবে। টাকা না দিলে পরীক্ষার রেজাল্ট দিবে না। আমার মা বাড়িতে বাড়িতে কাজ করে । তাই টাকা দিতে দেরি হয়েছে।’

পিটিআই ইনিস্টিটিউট তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী বাঁধন জানায়, ‘১০ টাকা দিয়েছি। ম্যাডাম বলেছেন, গাছের চারা দিবে।’ একই শ্রেণির জুঁই বলে, ‘আমি দেই নাই। কাল দিব। মায়ের কাছে টাকা ছিল না।’ মাঠপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও ১০ টাকা হারে নেওয়া হয়েছে।

বেসরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী মিথিলা জানায়, ‘২০ টাকা দিয়েছে গাছের চারা কেনার জন্য। টাকা না দিলে শ্রেণি শিক্ষিকা বেতন থেকে টাকা কেটে দেবে বলেছে। দশম শ্রেণির ছাত্রীদের সবার থেকে ২০ টাকা করে নিয়েছে।’

মুন্সীগঞ্জ জেলার প্রায় সব বিদ্যালয়ের চিত্র ছিল একই রকম। উপজেলার প্রায় বিদ্যালয়ের চিত্র ছিল একই রকম।

এ ব্যাপারে এসব বিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসন থেকেই টাকা নিতে বলা হয়েছে। তাই ১০ টাকা করে চারা কেনার জন্য নেওয়া হয়েছে।

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম জানান, পুরো জেলায় মাধ্যমিক সমমানের বিদ্যালয় মাদ্রাসা, কলেজের সংখ্যা ১৭৬টি। আর শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক লাখ ২৩ হাজার ১৫৭ জন। টাকার বিনিময়ে চারা বিতরণের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘টাকা নেওয়ার কথা আমাদের জানা নেই। নির্দেশনা হচ্ছে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিটি শিক্ষার্থীকে একটি বনজ ও একটি ফলদ গাছের চারা রোপণ করতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ ও ব্যবস্থাপনা কমিটিকে শিক্ষার্থীদের কাছে দুটি গাছ সরবরাহ করতে বলা হয়েছে। শিক্ষার্থী থেকে টাকা সংগ্রহ করতে বলা হয়নি। আর এ রকম কোনো কিছু আমার জানা নেই।’

সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা ফেরদৌসী বেগম জানান, ‘জেলায় সরকারি-বেসরকারি সর্বমোট প্রাথমিক বিদ্যালয় সংখ্যা ৯৫৯টি আর শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক লাখ ৯২ হাজার ২১৭ জন। চারার বিনিময়ে টাকা নেওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘টাকা নেওয়ার কোনো নির্দেশনা নেই। প্রতিটি শিক্ষার্থী গাছ পাবে এটা ঠিক। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আমরা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের বলে দিয়েছি ব্যবস্থাপনা কমিটি, প্রধান শিক্ষক গাছের চারা সরবরাহ করবেন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য। শিক্ষার্থীরা কেন টাকা দেবে।’

এ ব্যাপারে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সারাবান তাহুরা বলেন, ‘অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) স্যারের সাথে কথা বলেন। আমি কোনো কিছু বলতে পারব না ।’

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ও শিক্ষা ও আইসিটি (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ ফজলে আজিম বলেন, ‘কোনো বিদ্যালয়ে ১০ টাকার বেশি নেওয়ার কথা নয়। শিক্ষার্থীরা দুইটা চারা পাবে। একটি আমরা দিব আর একটির জন্য শিক্ষার্থীরা ১০ টাকা দিয়ে সহযোগিতা করবে। ১০ টাকার বেশি টাকা নিলে অন্যায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘চারার দাম ১০ টাকার চাইতে অনেক বেশি।’

জেলা বন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. আবু তাহের বলেন, ‘আমাদের বন বিভাগ থেকে নিয়েছে ১০ হাজার চারাগাছ। আমি আরো নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, সোনারগাঁও সরকারি নার্সারি থেকে এনে দিয়েছি ৫০ হাজার গাছ। সরকারিভাবে প্রতিটি চারার মূল্য পাঁচ টাকা। আর ১০ হাজার গাছের চারার মূল্য ১৫ টাকা করে, যা একটু বড়।’

নিউজ: এনটিভি
ছবি: বিক্রমপুর সংবাদ

Comments are closed.