জেলার রাজনীতি: মুন্সিগঞ্জ জেলা বিএনপি

ভাগ তিনটি, নিয়ন্ত্রণ এক পক্ষের হাতে
মুন্সিগঞ্জে জেলা বিএনপি তিন ভাগে বিভক্ত। কোন্দল আর পদবঞ্চিতদের হতাশার কারণে জেলায় মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না দলটি। দলের একাংশের একাধিক নেতা প্রথম আলোকে বলেন, মুন্সিগঞ্জে জেলা বিএনপির কমিটিতে পরীক্ষিত নেতাদের স্থান নেই। কমিটিতে শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের আধিক্য। তাঁরা রাজনৈতিক কর্মসূচির চেয়ে ব্যবসা নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন। এ জন্যই দলের এমন অবস্থা।

জেলা বিএনপির একাধিক সূত্র বলেছে, দলের তিন অংশের একটিতে রয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি মো. আবদুল হাই ও কেন্দ্রীয় বিএনপির কোষাধ্যক্ষ শিল্পপতি মিজানুর রহমান সিনহা। অপর দুই পক্ষের নেতৃত্বে আছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী এম শামসুল ইসলাম এবং কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। তবে জেলা বিএনপির নিয়ন্ত্রণ আবদুল হাই ও মিজানুর রহমান সিনহার নেতৃত্বাধীন অংশের হাতে।

২০০৯ সালের ২৩ নভেম্বর জেলা বিএনপির সম্মেলনে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচন করা হয়। পরে এই তিনজন ১৭১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ জেলা কমিটি গঠন করেন। শামসুল ইসলাম ও শাহ মোয়াজ্জেম পক্ষের কাউকে কমিটিতে রাখা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন এই দুই পক্ষের নেতা-কর্মীরা।

দলের একটি সূত্র বলেছে, জেলা সম্মেলনের আগে কেন্দ্র থেকে মিজানুর রহমান সিনহাকে আহ্বায়ক করে ১১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। পরে ওই কমিটির কলেবর বাড়ানো হয়। তবে আহ্বায়ক কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কয়েকজনকে পরে ঘোষিত জেলা কমিটিতে রাখা হয়নি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক শাহজাহান শিকদার (বর্তমানে মৃত), রহিমা শিকদার, এম শামসুল ইসলামের ছেলে সাইফুল ইসলাম, আবু সাইদ খান, জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক লেবু কাজী, শেখ মো. হান্নান। জেলা কমিটিসহ স্থানীয় বিএনপির কোনো পদেই রাখা হয়নি জেলা বিএনপির সাবেক আইনবিষয়ক সম্পাদক আবদুল মান্নান, সিরাজদিখান উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুস সালাম সরকার, গজারিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম, যুবদল নেতা এবং এম শামসুল ইসলামের সাবেক এপিএস মাহফুজুর রহমান, যুবদল নেতা আ ক ম মোজাম্মেল হককে।

শেখ মো. হান্নান বলেন, ‘আমি ১৮-১৯ বছর জেলা বিএনপির সহসভাপতি ছিলাম। ১৪ বছর টঙ্গিবাড়ী উপজেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। আমি যখন টঙ্গিবাড়ী উপজেলার সভাপতি ছিলাম, বর্তমান জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আজগর ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু আমাকে জেলা কমিটিতে তাঁরা রাখেননি। তাই ক্ষোভে ও দুঃখে রাজনীতি থেকে দূরে আছি। যত দূর জেনেছি, জেলা কমিটি এবং এর আগে উপজেলা কমিটিগুলো গঠন করার সময়ও টাকার বিনিময়ে পদ দেওয়া হয়েছে।’

মাহফুজুর রহমান বলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম শামসুল ইসলাম ও ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। অথচ জেলার রাজনীতির কোনো বিষয় নিয়ে জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক তাঁদের কারও সঙ্গে আলোচনা করারও দরকার মনে করেন না। জেলা কমিটিতে পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে টাকা আছে, এমন ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের পদ দেওয়া হয়েছে। দলে এঁদের সংখ্যা ৮০ শতাংশ।

জেলা কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধে পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ তুলেছেন পদবঞ্চিতরা। আবদুল হাইয়ের স্ত্রীর বড় ভাই শাহজাহান খান লৌহজং উপজেলা বিএনপির সভাপতি এবং একই সঙ্গে জেলা বিএনপির ১ নম্বর সহসভাপতি। আবদুল হাইয়ের ভায়রা জসিম উদ্দিন মিরকাদিম পৌর বিএনপির সভাপতি ও জেলা বিএনপির সহসভাপতি। তাঁর আপন ছোট ভাই মহিউদ্দিন আহমেদ সদর উপজেলা কমিটির সভাপতি ও জেলা কমিটির সহসভাপতি।

জেলা যুবদলের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপি ও যুবদলের একাধিক নেতা। জেলা যুবদলের সভাপতি তারিক কাশেম খান ও সম্পাদক সম্রাট ইকবাল। অভিযোগ রয়েছে, জেলা ছাত্রদলের কমিটি ২০০১ সালে গঠন করা। সেই থেকে সভাপতি জসিমউদ্দিন। তাঁকে ছাত্রদলের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দেখা যায় না।

জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্র পৌর মার্কেটের দোতলায় জেলা বিএনপির কার্যালয় গত কয়েক বছরে বেশির ভাগ সময় বন্ধ দেখা গেছে। মাঝেমধ্যে কার্যালয় খোলা হলেও নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি থাকে কম। দল ক্ষমতায় থাকার সময় সপ্তাহে সাত দিনই কার্যালয় খোলা থাকত। নেতা-কর্মীদের পদচারণে থাকত মুখরিত।

জেলা কমিটির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য শমসের আলম ভূঁইয়া বলেন, সাংগঠনিক অবস্থা দুর্বল, এই কথা সত্য। এর পেছনে মূল কারণ হচ্ছে টাকার বিনিময়ে পদ বিক্রি, ত্যাগী নেতাদের বাদ দেওয়া ইত্যাদি। ঢাকায় ব্যবসা করেন, কমিটিতে এমন নেতাদের সংখ্যাই বেশি। তাই আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁরা উপস্থিতও থাকেন না।

জেলা যুবদলের সহসভাপতি ও লৌহজং উপজেলার মেদেনীমণ্ডলের বাসিন্দা সালাম মোল্লা বলেন, ‘লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী আসনে বিএনপির রাজনীতি ধ্বংস হয়ে গেছে। গ্রুপিং ও কোন্দলে জর্জরিত বিএনপিতে কোনো সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নেই।’

এসব বিষয়ে জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও আবদুল হাইয়ের অনুসারী আতোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা যাঁরা বিএনপিকে ভালোবাসি, তাঁরাই মাঝে মাঝে কার্যালয় খুলে বসি। দলের মধ্যে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি আছেন। তাঁদের কি কার্যালয়ে আসার সময় আছে? আমরা কিছু ব্যক্তি ছাড়া সবাই ব্যস্ত। এ ছাড়া গ্রেপ্তার-আতঙ্কে নেতা-কর্মীরা আত্মগোপনে।’

শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘এসব বিষয়ে এখন আর কথা বলে লাভ নেই। তাই আলোচনা করতে চাইছি না।’

জেলা বিএনপির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও কেন্দ্রীয় বিএনপির কোষাধ্যক্ষ মিজানুর রহমান সিনহা বলেন, ‘সারা দেশে বিএনপির যে অবস্থা, আমাদের মুন্সিগঞ্জেও একই অবস্থা। দলীয় কোন্দলও সারা দেশে আছে, এখানেও আছে। তবে আমি কাউকে পদ থেকে বঞ্চিত করে কোনো পদ নেইনি।’ জেলায় বিএনপির কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই—এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘এর জবাব আমি দিতে পারব না। এটা জেলার নেতাদের জিজ্ঞাসা করেন।’

জেলায় দলের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম শামসুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল হাই বলেন, দলের মধ্যে অধিকাংশ ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি নেতা—এই অভিযোগ ঠিক নয়। এঁদের সংখ্যা খুবই কম। জেলা কমিটি নিয়ে পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যারা পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ তোলে, তারা এসে এই পদগুলো নিক। আমরা তো না করি না। দলের কোনো কর্মসূচি দিলে তারা উপস্থিত থাকে না। তারা আসে না বলেই অন্যদের এসব পদ দেওয়া হয়েছে।’

খোদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদেরই তো জেলায় মূল্যায়ন করা হয়—এমন অভিযোগের বিষয়ে আবদুল হাই বলেন, ‘শামসুল ইসলাম ও শাহ মোয়াজ্জেমের বয়স হয়ে গেছে। তাঁদের এখন রাজনীতি করার বয়সও নাই।’

প্রথম আলো

Comments are closed.