মৌলি আজাদ: বাবার স্বপ্ন ছিল সেক্যুলার বাংলাদেশ

দেশের একজন স্বনামধন্য কথাসাহিত্যিক ছিলেন হুমায়ুন আজাদ। সাহসী লেখনী দিয়ে তিনি পরিণত হন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ২০০৪ সালে জার্মানির মিউনিখে আজকের দিনে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। দিনটি স্মরণে সম্প্রতি এনটিভি অনলাইনকে একটি সাক্ষাৎকার দেন লেখক তনয়া মৌলি আজাদ। নিচে দেওয়া হলো সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ।

প্রশ্ন : লেখক হুমায়ুন আজাদ প্রশংসিত ছিলেন। আবার আলোচিতও ছিলেন। অনেকেই বলেন তিনি ছিলেন স্বঘোষিত নাস্তিক। তাঁর মেয়ে হিসেবে আপনার মতামত কী?

উত্তর : আমি আমার বাবাকে ধর্মকর্ম করতে দেখিনি। ছোটবেলায় আমার আব্বাকে আমার দাদি পীরের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি যেতে চাননি। তবে তিনি ধর্মকর্ম করতে গেলে কাউকে বাধা দিতেন না। আমি নামাজ পড়ি। বা আমরা ধর্মকর্ম করতাম, আমার বাবা আমাদের কখনো বাধা দিতেন না।

প্রশ্ন : হুমায়ুন আজাদ ছিলেন প্রথাবিরোধী লেখক। শুনেছি আপনাকে নাকি আপনার বাবা প্রথাগত বলেছিলেন, এটা কি সত্যি?

উত্তর : তিনি প্রথার মধ্যে থাকতে পছন্দ করতেন না। তিনি প্রথা ভাঙতে চাইতেন। তিনি বিশ্বাস ভাঙতে চাইতেন যুক্তি দ্বারা।

প্রশ্ন : আপনার সঙ্গে আপনার বাবার রাঢ়িখালের স্মৃতি নিয়ে যদি কিছু বলেন।

উত্তর : বাবা যখন বেঁচে ছিলেন, তখন আমি বাবার গ্রামে যেতাম না। তিনি গ্রামে যেতেন শুক্রবার। সেখানে ভক্তরা আসতেন। যখন ওনার সঙ্গে যেতাম তখন পদ্মাপাড়ে মিষ্টির দোকানে বসে বাবার সঙ্গে বসে মিষ্টি খেতাম। সেখানে ভক্তদের সঙ্গে তর্ক হতো। তখন তিনি যুক্তি দিয়ে সব কিছু বোঝাতেন।

প্রশ্ন : আপনার বাবা ১৫ বছর ছিলেন রাঢ়িখালে, ৪০ বছর ঢাকায়। তাঁর দুই জীবন নিয়ে কিছু বলবেন কি?

উত্তর : তিনি ঢাকায় ছিলেন ৪০ বছর। কিন্তু সারা জীবন তিনি রাঢ়িখালের কথা বলতেন। তিনি রাঢ়িখাল নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তিনি রাঢ়িখালের বৃষ্টি, বৈশাখ মাস, খেজুরের রস, কুঁড়ি ফুলের গল্প করতেন। তিনি ঢাকার গল্প করতেন না। তাঁর বুকের মধ্যে রাঢ়িখাল ছিল।

প্রশ্ন : স্কুলের বিষ্ণুপদ স্যার ও হোসেন স্যারের প্রভাব হুমায়ুন আজাদের জীবনে পড়েছিল বলে জানা যায়। যা পরবর্তীকালে হুমায়ুন আজাদকে প্রথা ভাঙতে সাহায্য করেছিল। যদি এ সম্পর্কে কিছু বলেন।

উত্তর : বিষ্ণুপদ স্যার, হোসেন স্যার ছিলেন রাঢ়িখালের শিক্ষক। তাঁদের অবদান আমার আব্বার জীবনে সবচেয়ে বড় বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কথা তিনি কখনো বলেননি।

প্রশ্ন : হুমায়ুন আজাদের প্রাত্যহিক জীবন নিয়ে যদি কিছু বলেন…

উত্তর : আব্বা খুব সকালে ঘুম থেকে উঠতেন। সকালে উঠে লাল চা বানাতেন, তার সঙ্গে মুড়ি। এরপর ফোন নিয়ে বসতেন। কথা বলতেন। এরপর পত্রিকা অফিসের ফোন আসত। কথা বলতেন। তারপর নাশতা খেতেন। বাবার একটি Apple কম্পিউটার ছিল। তিনি সেটা নিয়ে বসতেন। তিনি কাউকে দিয়ে কম্পোজ করাতেন না। তিনি তাঁর সব লেখা নিজে লিখতেন। আমার মা চাকরি করতেন, আমাদের গৃহপরিচারিকা ছিল না। বাবা রান্না করতেন। দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিতে যেতেন। এরপর আজিজ সুপার, সোহরাওয়ার্দী উদ্যোনে ভক্তদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে রাত ৮-৯টার দিকে বাসায় ফিরতেন।

প্রশ্ন : আমরা শুনেছি তিনি নাকি রাষ্ট্রীয় নিমন্ত্রণ রক্ষা করতেন না?

উত্তর : বাবা রাষ্ট্রীয় নিমন্ত্রণ পেলে যেতেন না। বরং বাস্কেটে ফেলে দিতেন। একবার ১৯৯৭-৯৮ সালে বাবা রাষ্ট্রীয় নিমন্ত্রণ পেলেন, তিনি আমন্ত্রণ রক্ষা না করে তরুণদের সঙ্গেই আড্ডা দিয়েছেন।

প্রশ্ন : আপনার বাবা বেশ ঠোঁটকাটা স্বভাবের ছিলেন, রাখঢাক ছিল না কথায়। আপনার কি কখনো বিষয়টি খারাপ লাগত?

উত্তর : আমি আমার বাবাকে বলতাম, তুমি এভাবে সবার মুখের ওপর কথা বল কেন? বাবা বলতেন, আমার কারো কাছে কোনো কিছু চাওয়ার নাই। আমি যা করব তা নিজেই করব। এ জন্য আমি স্পষ্ট কথা বলি।

প্রশ্ন : আপনার বাবার প্রেম ও বিয়ে নিয়ে কিছু বলুন।

উত্তর : আমার বাবার বিয়ে হয় ১৯৭৫ সালে। ফোনে বিয়ে হয়। স্কটল্যান্ডে বাবা পিএইচডি করতে গিয়েছিলেন। তবে বাবা-মায়ের পরিচয় ছিল আগে থেকেই। তাঁরা দুজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। আমার বাবা, মাকে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল ছিলেন। যার কারণে ফোনে বিয়ে হয়।

প্রশ্ন : মেয়ে হিসেবে বাবার সাহিত্যকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

উত্তর : বাবার সব সাহিত্যের মধ্যে ভালো লাগে তাঁর শিশু সাহিত্য। এর মধ্যে ভালোলাগে ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’। কারণ ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’ শুরুই হয় আমাকে নিয়ে। বইয়ের শুরুতে ছিল- ‘মৌলি তোমাকে বলি, তোমার মতই আমি ছিলাম ছোট, ছিলাম গ্রামে রাঢ়িখালে…’

প্রশ্ন : এই বইটি পড়ে গ্রামবাংলা সম্পর্কে আমরা ধারণা পাই। এ বইটির মাধ্যমে আমি পাঠকদের কাছে আলাদাভাবে পরিচিতি পাই। বাবার সাহিত্য মূলত মূল্যায়ন করবেন তাঁর পাঠকরা। বাবার ভাষাজ্ঞান ও সাহিত্যে আধুনিকতা এবং বাবার বইয়ে নাম ব্যতিক্রম হয়, তাঁর সবকিছুই আমার আলাদা মনে হয়।

প্রশ্ন : আপনার বাবার উপন্যাসে যৌনতা নিয়ে কি কখনো বিব্রত হয়েছেন? যেমন শেষ উপন্যাসটিতে ছিল?

উত্তর : বাবার উপন্যাসে যৌনতা প্রাধান্য আছে। তবে যখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন আমার কাছে বাবার উপন্যাসে এই যৌনতার বিষয়টি ভালো লাগত না। তবে এখন মনে হয়, বইগুলো প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য। সে জন্য ঘটনা ও প্রাসঙ্গিকতার কারণে যৌনতার বিষয়টি প্রাসঙ্গিক।

প্রশ্ন : বাবার ওপর আক্রমণ, এরপর বিদেশযাত্রা, এরপর আমরা সবাই জানি। এখনো কষ্ট পান?

উত্তর : ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি মৌলবাদীদের আঘাত আসার পর দেশ-বিদেশে বাবার চিকিৎসা হয়। তখন বাবা সুস্থ হয়ে ওঠেন। সে সময় বাবার ওপর ক্রমাগত মানসিক আঘাত আসতে থাকে। সবচেয়ে বেশি আঘাত আসে, যখন অনন্য আজাদকে ২০০৪ সালে অপহরণ করা হয়। তখনই বাবা সিদ্ধান্ত নেন তিনি জার্মানি যাবেন। কেননা তিনি মনে করেছিলেন তিনি ও তাঁর পরিবার ঝুঁকিতে আছে।

প্রশ্ন : আপনার বাবা আন্তর্জাতিক সংগঠন Pen-এর আমন্ত্রণে জার্মানিতে যান। এরপর পাঁচদিনের মাথায় তিনি মারা যান। আমরা ১৩ আগস্ট তাঁর মৃত্যুর খবর পাই। এরপর আমরা জানি হত্যা মামলা হয়। সেই মামলার নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন?

উত্তর : হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলার চূড়ান্ত রায় প্রকাশ ও দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত হলে হুমায়ুন আজাদের পরিবার সন্তুষ্ট হবে। আর এটাই হুমায়ুন আজাদ পরিবারের দাবি।

প্রশ্ন : বাবার শূন্যতা অনুভব হলে কী করেন?

উত্তর : বাবার মৃত্যুর পর সব ধরনের উৎসবে বাবাকে আমরা তিন ভাইবোন মিস করি। তাঁর অপমৃত্যুর ফলে আমরা হয়ে পড়েছি অভিভাবকহীন। বইমেলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে গেলে আমরা তাঁর শূন্যতাকে প্রচণ্ডভাবে অনুভব করি।

প্রশ্ন : আপনার বাবার স্বপ্ন নিয়ে যদি কিছু বলতেন।

উত্তর : বাবার স্বপ্ন ছিল সেক্যুলার বাংলাদেশ দেখার। কিন্তু আমরা ব্যক্তিগতভাবে তা বাস্তবায়ন করতে পারব না। কোনোদিন যদি সেক্যুলার বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হয়, তবেই হুমায়ুন আজাদের স্বপ্ন পূরণ হবে।

Comments are closed.