হাসপাতাল : মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল নিজেই রোগী

শেখ মো. রতন: নানা দুনীর্তি ও অনিয়মের বেড়াজালে মুন্সীগঞ্জের ১০০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালটি যেন নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। নাজুক অবস্থা বিরাজ করছে হাসপাতালটিতে।

বর্তমানে হাসপাতালের ভিতরের প্রতিটি ডাক্তারের রুমে দেখা যায় লাল-নীল-হলুদ রঙের বোরখা পরা নারী দালালদের। আর খোদ ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকরা এখন পুরুষ দালালদের ভূমিকা পালন করছেন।

এ হাসপাতালটির প্রধান ফটক থেকে শুরু করে ইনডোর ও আউটডোরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এসব দালালের ভিড়ের কারণে সাধারণ রোগীরা সেবা নিতে এসে বিড়ম্বনায় পড়ছেন।

এদিকে, জেনারেল হাসপাতালের ডাক্তাররা ব্যবস্থাপত্রে ওষুধ লিখে দিলেও হাসপাতাল থেকে কোন ওষুধ পাওয়া যায় না।

এ নিয়ে রোগিদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। অনেকের অভিযোগ, হাসপাতালের ডিসপেনসারির দায়িত্বরত ফার্মাসিস্টরা বাইরে ওষুধ পাচার করে দিচ্ছে । ফলে গরিব-সাধারণ রোগীরা সরকারি ওষুধ না পেয়ে বাধ্য হয়ে হাসপাতাল থেকে বিক্রি করা একই ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য হচ্ছে ।

তবে এ বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, লিখিত ব্যবস্থাপত্রের ওষুধ হয়তো বা স্টোরে নেই। কবে থেকে ওষুধ নেই এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি।

এদিকে, মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও বিক্রমপুর সংবাদের সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিমের স্ত্রী শামিমা আক্তার সম্প্রতি অসুস্থ্ হলে তাকে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে হাসপাতালের গাইনি বিভাগের ডাক্তার শামিমা আক্তার ব্যবস্থাপত্রে দুটি ওষুধের নাম লেখেন। যা কিনা হাসপাতালেই পাওয়া যাবে বলে জানান ডাক্তার শামিমা আক্তার। কিন্তু ডিসপেনসারিতে গেলে ওষুধ নেই বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়।

এদিকে, হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নিতে আসা ভর্তিকৃত রোগীরা অভিযোগ করেন, চিকিৎসার জন্য তাদের বাড়তি টাকা ডাক্তার, নার্সদের দিতে হয়। নার্সরা রোগিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন বলেও রোগি ও রোগির স্বজনরা আভিযোগ করেন।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিনিয়র নার্স (ইনচার্জ) শাহানাজ বেগমজানান, টাকার বিনিময়ে এ বিভাগে কোন কাজ করা হয় না।

এছাড়া জেনারেল হাসপাতালটিতে দীর্ঘদিন ডাক্তারশূন্য থাকায় রোগীদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। প্রায় এক বছর ধরে অর্থোপেডিক্স বিভাগে ডাক্তার নেই। চক্ষু বিভাগে ডাক্তার নেই ১৪ মাস ধরে। মেডিসিন বিভাগ ডাক্তারশূন্য প্রায় দেড় বছর হল। আলটাসনোগ্রাফির ডাক্তারটিও নেই পাঁচ মাস যাবৎ।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, হাসপাতালের কেবিনসহ জেনারেল বেডের বাথরুম সবকটিই অপরিষ্কার। টয়লেট ও পানির কল নষ্ট থাকায় আরও বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয় রোগীদের। বেডগুলোর অধিকাংশই ভাঙা।

বেডের অভাবে রোগীদের ফ্লোরে থাকতে হয় নিজস্ব বিছানা পেতে। ওয়ার্ডের লাইট-ফ্যান নষ্ট। হাসপাতালের ভেতরের অধিকাংশ জায়গায়ই অন্ধকারে থাকে। নেই কোন দাড়োয়ান-পাহারাদার। হাসপাতালটার দিকে তাকালে মনে হয় সে নিজেই রোগী।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আর এম ও) মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, ৫০ শয্যার জনবল দিয়ে ১০০ শয্যার হাসপাতাল পরিচালনা করা হচ্ছে। তাই অনেক সমস্যার মোকাবেলা করে কাজ করতে হয়।

এ প্রসঙ্গে সিভিল সার্জন মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালের ওষুধ চুরি, রোগিদের সঙ্গে দুর্বব্যহারসহ সব অভিযোগের বিষেয়ে দ্রুত নিজে গিয়ে তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোন প্রকার ছাড় দেয়া হবে না।

হাসপাতালে ডায়াগস্টিক সেন্টারের মালিক-দালালদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান জেলার সিভিল সার্জন মো. শহিদুল ইসলাম।

রাইজিংবিডি

Comments are closed.