কলেজছাত্রীকে গণধর্ষণ: আগেই টার্গেট করেছিল বখাটেরা

যাত্রাবাড়ীর দক্ষিণ কাজলার ২/১ নম্বর বাড়ি। এই বাড়ির দ্বিতীয় তলার পূর্ব পাশের ইউনিট এখন আশপাশের লোকজনের কাছে বহুল আলোচিত। মঙ্গলবার ওই ফ্ল্যাটে এক কলেজছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর থেকে ফ্ল্যাটটি তালাবদ্ধ। এ ঘটনায় করা মামলায় পাঁচ ধর্ষকসহ ওই বাসার বাসিন্দা শেফালি আক্তার সুমিকে গ্রেপ্তার করেছে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। গতকাল দক্ষিণ কাজলার ওই বাসাটি তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। আশপাশের কেউ কথা বলতে চাচ্ছেন না। প্রতিবেশী রফিক মিয়া জানান, প্রায়ই ওই বাসায় আত্মীয় পরিচয়ে তরুণ-তরুণীরা বেড়াতে আসে।

তাই ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও আশপাশের কেউ তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি জানতে পারেননি। এমনকি কারও চিৎকারও শুনেননি তারা। পুলিশ আসার পরই বিষয়টি জানাজানি হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই বাড়ির এক নারী জানান, এ ঘটনার আগেও ওই ফ্ল্যাটে কয়েকবার প্রেমিক সাঈদীর সঙ্গে আসা-যাওয়া করেছে নির্যাতিতা তরুণী। ধর্ষকরাও সুমী ও সাঈদীর পূর্ব পরিচিত। যে কারণে ধর্ষণের পেছনের ঘটনা বের করতে তদন্ত করছে পুলিশ।

সূত্রমতে, পাঁচ বছর ধরেই নারায়াণগঞ্জের সোনারগাঁও এলাকার বাসিন্দা সাঈদীর সঙ্গে একই এলাকার ওই তরুণীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রায়ই ওই বাসাসহ বিভিন্ন স্থানে বেড়াতে যান তারা। যাত্রাবাড়ী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শাহিদুজ্জামান জানান, এ ঘটনায় ওই বাসার বাসিন্দা সুমি জড়িত থাকতে পারে। এছাড়া নির্যাতিতার প্রেমিক জড়িত কি-না সুমিকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই তা বের হয়ে যাবে। এজন্য আদালতের মাধ্যমে সুমীসহ গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। এ বিষয়ে নির্যাতিতার প্রেমিক সাঈদীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার কোন সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি বলে জানান পরিদর্শক শাহিদুজ্জামান।

তবে পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ধর্ষকরা দক্ষিণ কাজলা এলাকায় বখাটে হিসেবে পরিচিত। মেয়েদের নানাভাবে যৌন হয়রানিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। দক্ষিণ কাজলা এলাকার ওই বাসায় যাতায়াতের সুবাদে দীর্ঘদিন থেকেই সাঈদীর প্রেমিকাকে টাগের্ট করেছিল তারা। টার্গেট অনুসারেই মঙ্গলবার বিকাল ৪টার দিকে কাজলা এলাকায় ওই তরুণীকে দেখে তারা একত্রিত হয়। পরে ওই বাসায় ঢুকে জোরপূর্বক তরুণীকে ধর্ষণ করে তারা।

এ ঘটনায় নির্যাতিতার পিতা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। দায়ের করা মামলা সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থেকে বেড়ানোর উদ্দেশে সাঈদীর সঙ্গে বের হয় ওই তরুণী। বিকাল ৪টার দিকে সাঈদীর পূর্ব পরিচিত সুমির যাত্রাবাড়ীর ওই বাসায় যায় তারা। সন্ধ্যার দিকে ছয় যুবক ওই বাসায় ঢোকে। সাঈদী ও ওই বাসার বাসিন্দা সুমি এবং তার কন্যাকে আলাদা কক্ষে জিম্মি করে রাখা হয়।

অন্য কক্ষে ওই তরুণীকে নিয়ে দরজা বন্ধ করে একের পর এক ধর্ষণ করতে থাকে। ধর্ষণ শেষে তরুণীকে জিম্মি করে তার কাছে চাঁদা দাবি করে। একপর্যায়ে তরুণীর অভিভাবকরা বিকাশের মাধ্যমে ধর্ষকদের ১০ হাজার টাকা দিতে বাধ্য হন। তরুণীর পিতা জানিয়েছেন, তখন পর্যন্ত তিনি জানতেন না তার মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছে। একটি ছেলেসহ আপত্তিকর অবস্থায় তরুণীকে আটক করা হয়েছে অভিযোগ করে ওই টাকা আদায় করা হয়। ধর্ষকরা চলে যাওয়ার পরপরই যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশকে বিষয়টি অবগত করা হয়। ততক্ষণে তরুণীর স্বজনরা যাত্রাবাড়ী এলাকায় ছুটে যান।

তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান চালিয়ে সুমিসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর নির্যাতিতাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করা হয়। বুধবার দুপুরে ঢামেক হাসপাতালে তার ফরেনসিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। ঢামেক হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের সমন্বয়কারী ডা. বিলকিস বেগম জানান, প্রাথমিকভাবে ওই তরুণীকে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃতরা হচ্ছে, মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ীর দিঘিরপাড়ের আক্কেল আলী মাঝির পুত্র ফয়সাল, একই জেলার লৌহজং থানার নাগেরহাট গ্রামের মৃত মোজাম্মেল হকের পুত্র সাইদুল ইসলাম বাবু, শ্রীনগর থানার বিক্রমপুর গ্রামের রবিন, একই এলাকার মেদেনিমণ্ডল গ্রামের শফিক মিয়ার কন্যা ও চান্দ মিয়ার স্ত্রী শেফালি আক্তার সুমি ও কুমিল্লা হোমনা থানার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের শহীদুল হকের পুত্র সাফায়েত। অন্য আসামিরা হচ্ছে মনির ও সাদ্দাম। তাদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানান যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অবনী শঙ্কর কর।

মানবজমিন

Comments are closed.