দুর্নীতির আখড়া: পল্লী-বিদ্যুতের মুন্সীগঞ্জ জোনাল অফিস

শেখ মো. রতন: কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ বাণিজ্য ও প্রভাবশালী দালালচক্রের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মুন্সীগঞ্জ সদর জোনাল অফিস। অনুসন্ধানে জানা গেছে, দালালচক্র কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে চালিয়ে যাচ্ছে বিদ্যুৎ সংযোগের নামে রিডিং-মিটার, বৈদ্যুতিক তার ও খুঁটি বাণিজ্য।

যেসব গ্রাহক নির্দিষ্ট টাকার চেয়ে অতিরিক্ত টাকা দিচ্ছে শুধু তাদের ভাগ্যেই জুটছে রিডিং-মিটার, বৈদ্যুতিক তার ও খুঁটি। যারা দালালচক্রের মন জোগাতে পারছে না, সেই সব গরিব মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ যাচ্ছে না। যাদের আগে বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও তারা তা পাচ্ছে না।

এক অর্থে বলা যায়, মুন্সীগঞ্জের সদর জোনাল অফিস অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করছে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ও বহিরাগত একটি দালালচক্র। অসাধু কর্মকর্তা ও বহিরাগত দাদালচক্রের খপ্পরে পড়ে অফিসটি পরিণত হয়েছে দুর্নীতি আখড়ায়।

জোনাল অফিসে গিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে অনেক অভিযোগ পাওয়া গেছে। সবচেড়ে বড় অভিযোগ দালালদের দৌরাত্ম্য নিয়ে। নিয়ম অনুযায়ী বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য আবেদন করা হলেও সেটি মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর ধরে ফাইলবন্দি অবস্থায় পড়ে থাকে। কিন্তু যারা দালালদের উপরি দিয়ে আবেদনপত্র জমা দিচ্ছেন, তারা সংযোগ পেয়ে যাচ্ছেন। এ নিয়ে কর্মকর্তাদের কোনো মাথা ব্যথা নেই।

গ্রাহকরা অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ সংযোগের আবেদন করার সময় কর্মকর্তারাই দালালদের নাম উল্লেখ করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। দালাল ছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়েছেন, এমন গ্রাহক খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এই অবস্থায় অসহায় হয়ে গ্রাহকরা ওই দালালচক্রকে পাঁচ-ছয় গুণ বেশি টাকা দিয়ে রিডিং-মিটার, বৈদ্যুতিক তার ও খুঁটিসহ ট্রান্সফরমার নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

প্রতিটি মিটার সংযোগের জন্য গ্রাহকের কাছ থেকে সদস্য ফরম বাবদ ১০০ টাকা ও মিটার বাবদ ৬২০ টাকা নেওয়ার নিয়ম থাকলেও আদায় করা হচ্ছে ৮ হাজার টাকা থেকে ২৫ হাজার টাকা।

আগে আবেদন করা গ্রাহকদের আগে সংযোগ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও এখানে তা মানা হচ্ছে না। পরিদর্শক ও বিলিং সুপারভাইজারসহ তাদের নিয়োজিত দালালদের হাতে অতিরিক্ত টাকা না দিলে আবেদনকারীদের সংযোগস্থলে বিদ্যুতের বাড়তি লোড রয়েছে বলে মিথ্যা প্রতিবেদন দেওয়া হয়। যাতে ওই গ্রাহক আরো বাড়তি টাকা দিতে বাধ্য হন।

এ ছাড়া নতুন এলাকায় সংযোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে খুঁটি, ট্রান্সফরমার, তার ও মিটার বাণিজ্য করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ভোগান্তি আরো কয়েক গুণ বেশি।

দালালচক্র ও অসাধু কর্মকর্তাদের ভয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে আবেদন করা কয়েকজন ব্যক্তি জানান, আবেদন করলেই চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক খুঁটি, তার ও মিটারের সরবরাহ নেই বলে জানায় কর্মকর্তারা। কিন্তু ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে, এমন কথা বলে হরহামেশা আদায় করা হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

বৈদ্যুতিক খুঁটি বাবদ ২৭ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়ার নিয়ম থাকলেও দালালদের মাধ্যমে খুঁটি প্রতি আদায় করা হচ্ছে ৫০ হাজার থেকে লক্ষাধীক টাকা। লক্ষাধীক টাকা দিয়ে বৈদ্যুতিক খুঁটি পেলেও সংযোগের জন্য ঘুরতে হয় বছরের পর বছর। তখন আবার টাকা দিলে বিদ্যুত সংযোগ মেলে।

এসব অনিয়ম-দুর্নীতি প্রসঙ্গে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মুন্সীগঞ্জ সদর জোনাল অফিসের ডিজিএম শেখ মনোয়ার মোর্শেদ এই প্রতিবেদককে জানান, ‘আমি ভাই অতি-সাধারণ মানুষ। দালালদের দৌরাত্ম্য সম্পর্কে আমার পরিষ্কার ধারণা নেই। তবে অভিযোগ এলে দালালদের শনাক্ত করে তাদের দৌরাত্ম্য বন্ধে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করব। এ জন্য প্রচারাভিযানও চালানো হবে।

তবে গ্রাহকদের অভিযোগ থেকে ও অনুসন্ধান করে জানা গেছে, অনিয়ম ও দুর্নীতির মূল হোতা ডিজিএমন শেখ মনোয়ার মোর্শেদ নিজেই। তার ছত্রছায়াই দালালচক্র কাজ করে। গ্রাহকদের দাবি, পল্লী বিদ্যুতের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অভিযোগ খতিয়ে দেখলে সত্য অবশ্যই বেরিয়ে আসবে।

রাইজিংবিডি

Comments are closed.