নূহ-উল-আলম লেনিন: কয়েক টুকরো গল্প ও কবিতা

সম্ভবত আমাদের ভাই-বোনদের সবাই মাতৃকেন্দ্রিক। বাবা যেন ছিলেন কিছুটা দূরের মানুষ! অথচ আমাদের শৈশবের অপার স্বাধীনতায় বাবা কখনও বাধ সাধেননি। দু’-একবার কানমলা যে বাবার হাতে খাইনি তা নয়; তবে বাবা কখনোই আমাদের তেমন শাসন করতেন না। মারধর করতেন না। বরং কোনো অন্যায় বা দুষ্টুমী করলে বাবা ‘তোমার ছেলে অথবা তোমার মেয়ে এই করেছে’ বলে মার কাছে নালিশ জানাতেন। আর তার ফলটা হতো ভয়ঙ্কর। নির্দয় নিষ্ঠুরভাবে ‘মা’ আমাদের ভাল মতো উত্তম-মধ্যমও দিতেন। অথচ কী বিস্ময়, সেই মা-ই আমাদের বেশী প্রিয় ছিল। সত্যি সত্যি আমরা ছিলাম মায়ের ‘ন্যাওটা’। আমি আর মেজদি তো বটেই। মাকে আমরা জ্বালাতামও বেশী, মারও খেতাম বেশী আবার মাকে সাহায্যও করতাম বেশী। বড়দা ও বড়দিরও নিশ্চয়ই আরেক ধরনের স্মৃতি আছে।

আমাদের অনেকগুলো ভাই-বোনের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে পিঠাপিঠি বলে মেজদি ও খোকনের সঙ্গে আমার শৈশব-স্মৃতিটা অনেক বেশী জ্বলজ্বলে। মনে পড়ে, বড়দা ছিলেন আমাদের দূরের ‘নায়ক’। ভীষণ ভয় পেতাম। আর বড়দাও শাসনের নামে হৃদয়হীনভাবে পিটাতেন। অথচ বড়দা-ই ছিলেন আমাদের কাছে অনুকরণীয়-অনুসরণীয় সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি। বড়দা ও মায়ের মধ্যে অদ্ভুত একটা মিল আমার স্মৃতিতে অক্ষয় হয়ে আছে। আপাত কঠিন এ দু’টি মানুষের হৃদয়ে ছিল ভালবাসার অমৃত ফল্গুধারা। আর আমাদের বড়দি ছিলেন প্রকৃতই লক্ষ্মী। যিনি আশ্বিনে রেঁধে কার্তিকে খাওয়াতেন; শৈশবের নবান্ন। আমাদের গোসল করাতেন, ঠাকুরমার ঝুলি থেকে গল্প পড়ে শোনাতেন। আজকের লেখায় আমি আমার শৈশবের আনন্দ-বেদনার কয়েকটি টুকরো স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করব।

গানেরকথা : আমার প্রিয় শ্রেষ্ঠ গায়িকা
আমাদের সকল ভাই-বোনেরই গানের প্রতি জন্মাবধি অদ্ভুত একটা আকর্ষণ আছে। আমাদের শিশু-মনে ‘সুরের আগুন’ জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের মা। পৃথিবীর সব মায়ের মতো ‘ঘুম পাড়ানিয়া’ গানই কেবল নয়, আমরা মায়ের কণ্ঠেই প্রথম রবীন্দ্রনাথের গান, নজরুলের গান ও দেশাত্মবোধক গান শুনেছি। বাবার রাজনৈতিক শিষ্য আমির হোসেন ভাইয়ের একটা ‘কলের গান’ ছিল। ওটা কার্যত আমাদের বাড়িতেই থাকত। মা ওই কলের গান বা গ্রামোফোনের রেকর্ড বাজিয়ে যে গান শুনতেন, তা মুখস্থ করে ফেলতেন। নিরক্ষর আমাদের মা অনেক সময় উচ্চারণ ভুল করতেন। কিন্তু গানটি গাইতেন অসাধারণ দরদ দিয়ে, নিজস্ব গায়কীতে। দ্বিতীয়ত আমাদের বাড়িতে প্রায়শঃ থাকতেন কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা। তারা, বিশেষ করে সত্যেন সেন প্রচুর গণসংগীত রচনা করেছেন এবং গেয়েছেন। মা তাদের কাছ থেকেও গণসংগীত শুনতে শুনতে মুখস্থ করে ফেলতেন। গানের কোনো আনুষ্ঠানিক তালিম ছিল না। আমাদের শিক্ষণীয় ও প্রিয় এসব গান ছাড়াও সেকালে গ্রামে মেয়েদের বিয়ের গানের প্রচলন ছিল। দল বেঁধে দুই ভাগ হয়ে বিয়ের গান গাওয়া হতো। মনে পড়ে গ্রামের এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে আমার মার ডাক পড়ত। মা আমাদের প্রতিবেশী বেদুরাখালা একদিকে আর আমার জ্যাঠিমা (সোলেমান ভাইয়ের মা) ও বেদুরাখালার ছোটবোন ছিলেন অন্যদিকে। দুইপক্ষ দু’দিকে মুখ করে বসে বিয়ের লোকগান পরিবেশন করতেন। এসব গান ছিল বিয়ে উৎসবের অপরিহার্য অংশ। সুরের মধ্যেও আনন্দ-বেদনা এবং বিদায় বিরহের সুর অথবা লঘু চপলতার হাস্যরস একটা অন্যরকম মায়াবী পরিবেশ রচনা করত। লোকগান ছাড়াও আমার মা প্রায় নিত্যদিন আমাদের রবীন্দ্র সঙ্গীত ও নজরুলের গান গেয়ে শোনাতেন সন্ধ্যের অবকাশে। আমার মায়ের সুরেলা কণ্ঠের এসব গান আমাদের শৈশব-যৌবনের এক অমূল্য প্রেরণাদায়ক মধুর স্মৃতি হয়ে আছে। আমার কাছে আমার মা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গায়িকা।

আমার প্রথম গানের শিক্ষক ও প্রথম নাটক
বাবার গানের গলা ছিল না। বাগানে পায়চারী করতে করতে দু’-একটি গণসংগীতের কলি বেসুরোভাবে গুনগুন করতেন। অথচ এই বাবা-ই কিনা আমার প্রথম গানের শিক্ষক! সম্ভবত ১৯৫৬ সাল হবে। আমাদের পৈত্রিক গ্রাম রাণীগাঁও-এ ‘কে আর বন্ধুমহল’ নামে একটি নবগঠিত ক্লাবের উদ্যোগে নাটক হবে। নাটকটির নাম ছিল আশকার ইবনে শাইখ রচিত ‘পদক্ষেপ’। এর আগে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মঞ্চে অভিনয় করিনি। বড়দা যখন বাড়িতে আসতেন তখন আমাদের ভাই-বোনসহ পাড়ার শিশু-কিশোরদের নিয়ে তার রচিত নাটকের অভিনয় হতো। কোনো মঞ্চে নয়। আমাদের বাগানের পেয়ারা গাছের নীচে একটি পাটি বিছিয়ে আমরা অভিনয়ের মহড়া দিতাম। ২/৩ দিন মহড়া দেওয়ার পর কাগজ কেটে পেয়ারাতলার মঞ্চসজ্জা হতো এবং মায়ের শাড়ি এনে আমাদের সাজিয়ে মজার সব নাটক করাতেন বড়দা। বড়দার এসব স্বরচিত নাটক করার শিক্ষা পরবর্তীকালে আমরা অব্যাহত রেখেছিলাম তবে আনুষ্ঠানিকভাবে পদক্ষেপ নাটকেই আমার প্রথম অভিনয়। মজার ঘটনা হলো ওই নাটকের তিনটি চরিত্রে— শিক্ষক ও তার দুই ছেলে— আমরা তিনজন, বাবা (শিক্ষকের ভূমিকায়) বড়দা ও আমি (শিক্ষকের দুই পুত্রের ভূমিকায়) অভিনয় করি। দারুণ প্রশংসিত হয়েছিল আমাদের অভিনয়। সেই নাটকে আমার একটা বাড়তি ভূমিকা ছিল। নাট্যানুষ্ঠানের উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন। গানটি ছিল একটি গণসংগীত। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ও চীনা বিপ্লবের পটভূমিকায় রচিত। গানের দু’-একটি চরণ ছিল এ রকম— “আমরা বীর কিশোর, আমরা বীর কিশোর,… শত্রুর মুখে তুলব তুফান জোর।… রুশ-চীনে ঘরে ঘরে বড়দের পাশে দাঁড়িয়ে কিশোর জীবন তুচ্ছ করে…।” পুরো গানটি বাবার কাছ থেকে শেখা। যখন স্থির হল এটাই হবে উদ্বোধনী সংগীত এবং তা আমি ও খোকন যৌথভাবে পরিবেশন করব; তখন প্রশ্ন উঠল কে শেখাবে আমাদের এই গান? বাবা বললেন আমি শিখিয়ে দেব। সত্যি সত্যি বাবা আমাদের বারবার গেয়ে গেয়ে মুখস্থ করালেন। বাবা বাগানে পায়চারী করতেন আর গানের কলিগুলো বেসুরো কণ্ঠে গাইতেন, আমরা পিছু পিছু হেঁটে হেঁটে তা আওড়াতাম। এভাবেই গানটা মুখস্থ হয়ে গেল। গানটা শিখলাম বটে বাবার কাছ থেকে, সুরটা ঠিক করে দিলেন মা। বাবা-ই বললেন, তোদের মা’র কাছ থেকে সুরটা ঠিকমতো শিখেনে। রাণীগাঁও-এ এরপর প্রতি বছর নাটক হতো। অনিবার্যভাবে আমরা অভিনয় করতাম। কিন্তু সেই প্রথম বারের মঞ্চে অভিনয় এবং গান গাওয়ার নস্টালজিক অম্লান স্মৃতির সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা হয় না।

বাবার সাথে পরিচয় !
ভদ্রলোককে আমরা চিনতাম। সকালে উঠে গোসল করে একটা ছাতা হাতে স্কুলে চলে যেতেন। কখনও বিকেলে বা কখনও রাতে বাড়িতে ফিরতেন। মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে অনেক লোকের ভীড় হতো। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের পর কিছুদিন যেতে না যেতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দেয়। ৯২(ক) ধারা জারি করে পূর্ব বাংলার রাজনীতিবিদদের ব্যাপকভাবে গ্রেফতার করে। জিতেন ঘোষ এবং বাবা এক সাথে গ্রেফতার হয়ে যান। থানা-পুলিশ তাদের নিতে এসে শিমুলিয়া বাজারে জনতার দ্বারা ঘেরাও হয়ে পড়ে। জিতেন ঘোষ ও রহমান মাস্টার ক্ষুব্ধ জনতাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে নিরস্ত করলেন। পুলিশ নির্বিঘ্নে তাদের থানায় নিয়ে যায়। মা তখন বাজারের পাশের খালের ওপারে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন। আমি হাফ প্যান্ট পরা, খালি গা। কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে মানুষের ভীড় দেখছি। কী হচ্ছে না হচ্ছে কিছুই বোঝার ক্ষমতা নেই। হঠাৎ জ্যাঠা বাবু (জিতেন ঘোষ) আমাকে কাছে ডাকলেন। সাড়ে ৬ ফুট লম্বা মানুষটি পকেটে হাত দিয়ে আমার হাতে একটি সিকি (চার আনা) তুলে দিলেন। বললেন, দুষ্টুমী করবি না, মা’র কথা শুনবি। আর রহমান মাস্টার মিটমিট করে হাসছেন। আমি তো চার আনা পয়সা পেয়ে বেজায় খুশী। আমাকে আর কে পায়! ওই দুই ভদ্রলোককে পুলিশ ধরে নিয়ে যাওয়ায় যেন ভালই হলো!

এ ঘটনার কয়েক মাস পর, সম্ভবত ১৯৫৫ সাল হবে; এক দিন আলতাফ ভাই (আমাদের গ্রাম সম্পর্কিত ভাই এবং বাবার রাজনৈতিক অনুসারী), মা, আমি আর খোকনকে গয়না নৌকায় করে ঢাকার দিকে রওনা হলেন। ঢাকায় বংশী বাজারের জুম্মন বেপারী লেনস্থ আমাদের ফুফুর বাসায় উঠলাম। একদিন পর ঘোড়ার গাড়িতে চেপে আমরা চারজন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের গেটে এলাম। ওই গেটের একটি ঘরে গরাদের এক পাশে রহমান মাস্টার ও অন্য পাশে আমরা চারজন দাঁড়িয়ে। সম্ভবত ১০-১৫ মিনিটের সাক্ষাৎকার। অধিকাংশ সময় মা ও আলতাফ ভাই বন্দী মানুষটির সাথে কথা-বার্তা বললেন। মা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলেন। জমাদার তাড়া দিলেন সময় শেষ। ঠিক সেই শেষ মুহূর্তে আলতাফভাই আমাকে আর খোকনকে বন্দী লোকটির কাছে ডেকে নিলেন। বললেন, তোমাদের বাবার সাথে কথা বলো।

আমরা কী বলব? ফ্যাল ফ্যাল করে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। বাবা গরাদের ফাঁক দিয়ে হাত বাড়িয়ে আমাদের মাথায়, চিবুকে হাত দিয়ে আদর করে দিলেন। আর ঠিক সেই মুহূর্তে আমি হঠাৎ অনেক বড় হয়ে গেলাম। বাবার দিকে মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলাম। মনে হল জীবনে এই প্রথম আমি আমার জন্মদাতা বাবাকে চিনলাম। সৌম্যকান্তি প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন মানুষ। দেবদূতের মতো। তিনি-ই কি-না আমার বাবা! ‘বাবা’ সম্পর্কে সত্যিকার অনুভূতি এর আগে আমার মধ্যে ছিল না। এটা যেন একটা অভিনব আবিষ্কার! বাবার সাথে পরিচয়! তা’ও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে!

আমার হাতে খড়ি
খুব ছোট্টবেলা। সন তারিখ মনে থাকার কথা নয়। বর্ষা কাল। একটা মাটির বড় গামলায় চড়ে এক মধ্যবয়সী পণ্ডিতমশাই আমাদের পড়াতে আসতেন। টাগরা বা গামলাটায় বসে পণ্ডিতমশাই দু’হাতে পানি ভাঙতে ভাঙতে যখন গামলাটা ঘুরাতে ঘুরাতে আসতেন, আমি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতাম। তিনি আমাদের গৃহশিক্ষক। বড়দি আর মেজদি-ই তার আসল ছাত্রী। একদিন হল কি মা আমাকে ধরে এনে ওদের সাথে বসিয়ে দিলেন। আমার বই, শ্লেট কিছুই নেই। মাস্টার বাবু আমাকে ১ থেকে ২০ পর্যন্ত গুনতে বললেন। আমি স্মার্টলি গুনে ফেললাম। মাস্টার বাবু বললেন, ও পারবে। মাকে বললেন, বৌদি ওর জন্য একটা আদর্শলিপি ও শ্লেট কিনতে হবে।

কেন জানি এই আদর্শলিপি ও শ্লেট কেনায় বিলম্ব হচ্ছিল। আর হিংসুটে মেজদিটা কিছুতেই ওর বই আর শ্লেট আমাকে ব্যবহার করতে দেবে না। এর মধ্যে একদিন ঘোর বর্ষা। প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। মাস্টার বাবুর পক্ষে বৃষ্টিতে ভিজে আসা সম্ভব নয়। আমাদের দু’জনকে নিয়ে পড়াতে বসলেন বড়দি। সেদিন বড়দিই আমাদের ‘কানাই মাস্টার’। অক্ষর চেনানো শুরু হল। এমনিতেই দেখতে দেখতে বর্ণমালা কিছুটা চেনা হয়ে গিয়েছিল। বড়দি লাইন ধরে ধরে শেখালেন। পরে শ্লেট এগিয়ে দিয়ে ‘অ, আ’ লিখতে দিলেন। স্বভাবতই আমি পারিনি। পরে বড়দি বড় বড় করে অক্ষর দু’টি লিখে দিয়ে তার ওপর আমাকে হাত ঘোরাতে বললেন। প্রথম হাত ঘোরানীটাও বড়দি আমার হাত ধরে ধরে শেখালেন। এভাবেই আমার প্রথম অক্ষর পরিচয় ও হাতেখড়ি হল বড়দির কাছে। বড়দির সেই অল্প বয়েসী পেলব হাতটা এখনও আমার হাতে লেগে আছে।

প্রথমস্কুল : আদব-কায়দাশেখা
প্রসঙ্গটি শেষ করছি আরেকটি তথ্য দিয়ে। রাণীগাঁও-এ তখনও আমাদের একটা কাঠের বৈঠকখানা ঘর ছিল। সেই ঘরে একটা প্রাথমিক স্কুল খুলেছিলেন আমাদের জ্যাঠতুতো ভাই সোলেমানভাই। আমাদের প্রথম স্কুল সোলেমান ভাইয়ের স্কুল। বস্তুত সেখানেই আমার অক্ষর পরিচয়সম্পন্ন হয়। সোলেমানভাই-ই আমাদের প্রথম আদব-কায়দা শেখান। আমরা তখনও বড়দি-বড়দাকেও তুই তুকারি বলতাম। সোলেমান ভাই বড়দের কীভাবে সম্বোধন করতে হবে, সম্মান দেখাতে হবে, ছোটদের ‘তুই’ না বলে ‘তুমি’ বলতে হবে ইত্যাদি শেখান। সোলেমানভাই বেশী দিন শিক্ষকতা করেননি। পরে এই স্কুলের শিক্ষক হন লোকমান কাকা। শেষাবধি স্কুলটি আমাদের বাড়ির ঘর থেকে রতন বেপারীর বাংলা ঘরে স্থানান্তরিত হয়। আমাদের প্রথম স্কুলশিক্ষক সোলেমান ভাইয়ের সেই আদব-কায়দা শিক্ষা আমরা আজও ভুলিনি। ক্যান্সার আক্রান্ত অশীতিপর আমাদের ভালবাসার মানুষ সোলেমানভাই আজও আমাদের মানবিকতা শিক্ষা দিয়ে চলেছেন তার সম্ভ্রমপূর্ণ আচরণ দিয়ে।

ক্ষিদের গল্প
শিমুলিয়ার বাড়ি। কোন্‌ সকালে মা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছেন। আমরা চার ভাই-বোন। ক্ষুধার আগুনে পেট জ্বলছে। ধৈর্যের প্রতীক বড়দি আমাদের তিন জনকে- মেজদি, খোকন ও আমাকে ঘরের কাঠের মেঝেয় বিছানা করে শুইয়ে রেখেছেন। উঠোনের কোণে চুলোয় একটা হাঁড়ি চাপানো। বড়দি মাঝে মাঝে গিয়ে হাঁড়িটার ঢাকনা উঠিয়ে একটা চামচ দিয়ে নাড়াচাড়া করছেন। ভাবটা এ রকম, এই তো রান্না হয়ে এলো, এখুনি তোদের খেতে দেব। এক পর্যায়ে ক্ষিদেয় নেতিয়ে পড়া আমাদের ঘুম পাড়িয়ে দেন বড়দি। প্রায় সন্ধ্যায় মা এলেন। আঁচলে বাধা সামান্য চাল। নানাবাড়ী থেকে মা সেই চালটুকু নিয়ে এসেছেন। ভাত রান্নার জন্য চুলোয় হাড়ি বসানো হলো। বাড়ির বাগান থেকে সব্জি পেড়ে আনলেন মা। চুলোর চার পাশ ঘিরে আমরা মা’র কাছে বসে আছি। এক ফাঁকে মা তার নিত্য দিনের অভ্যাস মতো সুর করে কাঁদতে বসলেন। ‘ও আমার ফজল রে…।’ ফজল ছিল মেজদির বড় ও বড়দির ছোট। মায়ের সদ্য মৃত ছেলে। ফজলের চেহারা বা কোনো স্মৃতি আমার মনে নেই। কেবল মনে আছে আমাদের উঠোন থেকে সাদা কাপড়ে পেঁচিয়ে আমাদের একটা ভাইকে রাণীগাঁর দিকে নিয়ে গিয়েছিল বড়রা। ওই ঘটনাটির পর থেকে সারা দিনের ঘরকন্যার কাজ সেরে মা উঠোনের একটা কোণে বসে আর্তনাদ করে কাঁদতেন। মাকে কাঁদতে দেখে আমরা ছোটরাও কাঁদতাম। কিন্তু আমাদের ক্ষুধাকাতর সেই সন্ধ্যায় মায়ের কান্না যেন ছিল চরাচর বিদীর্ণ করা। এমন হাহাকার, এমন মর্মভেদী বেদনা আজও আমাকে বিষণ্ণ করে তোলে।

ইতোমধ্যে ভাতের মাড় ঝরানো শেষ। চুলোয় তরকারি রান্না হচ্ছে। ভাতের মাড় সাধারণত বাড়ির কুকুর টমিকে খাওয়ানো হতো। সেদিন আর কাউকে দেওয়া হল না। বড়দি সেই ফেন গ্লাসে করে ভাগ করে দিলেন আমাদের তিন ভাই-বোনকে। আমি ও মেজদি ফেন লুফে নিলাম। লবণ ছিটিয়ে অসীম তৃপ্তিতে সেই ফেন পান করেছিলাম। কিন্তু সবচেয়ে ছোট খোকন (তখনও সাফি বা অন্য ভাই-বোনদের জন্ম হয়নি) গো ধরল, ও ভাত ছাড়া কিছু খাবে না। অবশেষে সেই ফেনটুকুও আমি আর মেজদি কাড়াকাড়ি করে খেয়ে নিলাম। আমরা ক্ষুধার কাছে পরাজিত হলাম। মা খোকনকে বললেন, ঘরে চল, এখুনি ভাত খেতে দেব।

শৈশবে, এমনকী বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও আমার না খেতে পাওয়ার, ক্ষুধার অভিজ্ঞতা আছে। কখনও বাবা রাজনৈতিক কারণে পলাতক বা জেলে অথবা কখনও তীব্র অভাব-দারিদ্র্যের জন্য আমাদের এই অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়েছে। তবে ওপরের গল্পটি আমার প্রথম ক্ষিদের গল্প- সত্যিই ‘যে গল্পের শেষ নেই।’

শেষ করছি একটি কবিতা দিয়ে—

আমার মায়ের ছবি

তোমার একটা ছবি আঁকব ভেবে রং-তুলি
নিয়ে ইজেল সাজাতেই আকাশ জুড়ে বর্ষা
আমার সব রং-তুলি ভাসিয়ে নিল।
আমার মনটাও গেল ভিজে এবং মনের ভেতরে
তোমার ছবিটাও।
অবাক বিস্ময়ে অনুভব করলাম আমি শৈশবে
ফিরে গেছি। বৃষ্টি ভেজা দুপুরে দুই দুরন্ত কিশোর-কিশোরী
মেজদি ও আমি, ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি। হঠাৎ সূর্যালোকের উদ্ভাস।
খেঁকশিয়ালের বিয়ে হবে। ও পাড়ায় শারদীয় ঢাকের শব্দ।
মায়ের সাথে খুঁনসুটি। কলা চুরি করেছি আমি; আর মারটা খেলো মেজদি।
আহা! সেদিন মেজদিটার জন্য আমার বড্ডো মায়া লেগেছিল।
মেজদি ও আমি, মায়ের ন্যাওটা, কিন্তু এঁড়ে বাছুরের মতোই দুরন্ত,
কখনো অবাধ্য, কখনো একান্ত সহায়।
ভাবলাম, আজ মাকে নিয়ে কয়েকটি পঙ্ক্তি রচনা করব।
কলমটা খুঁজে পেতে ঘরে ঢুকতেই দেয়ালে মায়ের প্রসন্ন মুখ,
বললেন, ‘খোকা তোর কলমে কালি নেই, তুই অযথাই পঙ্ক্তি
মেলাতে যাস নে। এই তো আমি আছি, তুই বরং একবার পদ্মায়
ডুব দিয়ে আয়। অনেকদিন তোকে ছুঁতে পারি না।
পদ্মার ভাঙনে আমাদের গ্রাম পতনের পর মানুষের
স্থায়ী আসন কবর থেকে আমার মায়ের মমির মতো লাশটাকে
বড়দা পদ্মায় ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। সেই থেকে
আমার মা পদ্মার জলে মিশে আছেন। পদ্মা আমার মা।
ওই জলে আমার জীবন জুড়ায়।

দ্য রিপোর্ট

Comments are closed.