যে ভয়ে পদ্মা পাড়ি দিচ্ছে দক্ষিণবঙ্গের ঘরমুখো যাত্রীরা

সুমিত সরকার সুমন: ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৩ জেলার মাওয়া পদ্মাসেতু প্রকল্পএলাকার অন্যতম প্রবেশদ্বার নৌরুট শিমুলিয়া ফেরী ঘাট আজ মঙ্গলবার এমএল পিনাক-৬ লঞ্চ দুর্ঘটনার ১১ মাস অতিবাহিত হলেও পবিত্র মাহে রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে এখনো পদ্মা পাড়ি দিতে চরম আতঙ্কে রয়েছেন দক্ষিণবঙ্গের ঘরমুখো মানুষ।

তাদের মাঝে এখনো কাটেনি লঞ্চডুবির আতঙ্ক। সেই ভয়াবহ স্মৃতি এখনো তাড়া করে বেরাচ্ছে পদ্মা পারাপার হওয়া মানুষের। এখনো অনেক যাত্রী লঞ্চ উপেক্ষা করে ফেরিতে পদ্মা পাড়ি দিচ্ছেন। গতবছরের রমজানের ঈদের পর ৪ আগস্ট ধারণমতা অতিরিক্ত হওয়া আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার কাওরাকান্দিঘাট থেকে মাওয়ার উদ্দেশে ছেড়ে আসা পিনাক-৬ নামক সেই ধানব লঞ্চটি অভার লোডিংয়ের কারণে পদ্মায় অতল দেশে তলিয়ে যায়। সরকারিভাবে ওই ঘটনায় ৪৯টি যাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হলেও। নিখোঁজ থাকে আরো ৫৩ জন। যাদের হুদিস আজো মেলেনি।

এ সময় পদ্মার তীরে স্বজনহারাদের আহাজারি আর বুকফাটা আর্তনাদে ঘ্রাষ করে দেয় ঈদের আনন্দ। আজ এমএল পিনাক-৬ লঞ্চ দুর্ঘটনার ১১ মাস পেরোলেও আর কিছু দিন পরেই আবারো আসছে ঈদ। আবারো বর্ষা মৌসুমের সেই উত্তাল পদ্মা। এবারো একই নৌপথে লঞ্চে পারাপার হতে হবে দক্ষিণবঙ্গের ২৩ জেলার মানুষকে। সরোজমিন গিয়ে দেখা যায় লঞ্চ দুর্ঘটনার পর উভয়ঘাট থেকে প্রতিটি লঞ্চ ধারণক্ষমতা অনুযায়ী নির্দিষ্ট যাত্রী নিয়ে পদ্মা পাড়ি দিচ্ছিল। এ কাজের সর্বোচ্চ সতর্কতা নিয়ে তদারকি অব্যাহত রেখেছিলেন ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ স্থানীয় প্রশাসন, বিআইডব্লিউটিএ ও মাওয়া নৌ পুলিশের লোকজন।

কয়েক মাস ধরে চলাচলকারী লঞ্চগুলোতে অতিরিক্ত যাত্রী দেখা যাচ্ছিল না। বর্তমানে পদ্মা উত্তাল থাকলেও যাত্রীস্বল্পতায় যাত্রী পারপারে নেই কর্তৃপক্ষের তদারকির সেই আগের চিত্র। তা ছাড়া প্রশাসন ও পুলিশি তদারকিতে লঞ্চে গুনে গুনে যাত্রী দেয়ার সেই আগের চিত্রও দেখা যায়নি। তবে যাত্রী না থাকায় এ ব্যবস্থাপনা নেই বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন। একই সাথে আসন্ন ঈদের আগে যাত্রী চাপ বেড়ে গেলে তখন লঞ্চে গুনে গুনে যাত্রী দেয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

অন্য দিকে সম্প্রতি ফরিদপুরের আটরশির ওরসের সময় যাত্রী চাপে তিন থেকে চার দিন কাওরাকান্দিঘাট থেকে কিছুটা অভারলোডিং হয়েছে। সে সময় লঞ্চ পন্টুনে ওঠানামার একাধিক জেটি থাকায় ও মাওয়া চৌরাস্তার সিগন্যাল থেকে একসাথে ১০-১৫টি যাত্রীবাহী যানবাহন শিমুলিয়াঘাটে এলে অতিরিক্ত যাত্রী চাপে লঞ্চে স্বল্প যাত্রী অভারলোডিং হয়েছিল। তবে মাঝে মধ্যে কিছু লঞ্চে যাত্রী, মালামালসহ অভারলোডিং হয় বলে স্বীকার করেন বিআইডব্লিউটিএর একটি সূত্র। এ দিকে শিমুলিয়া-কাওরাকান্দি-মাঝিকান্দি নৌরুটে বর্তমানে ৮৭টি লঞ্চের মধ্যে ৭২টি চলাচল করছে। ফিটনেস থাকা সত্ত্বেও বাকি ১৫টি লঞ্চ ঈদ উপলক্ষে মেরামতের জন্য ডকিংয়ে রয়েছে। এ ছাড়া পিনাক-৬ এর পরিবর্তে দুই মাস আগে সালিদ-খালিদ নামে আরেকটি লঞ্চ এ রুটে চলাচল করছে বলে জানা যায়।

শিবচর উপজেলার ,যাত্রী রাবেয়া খাতুন জানান, গাজীপুর থেকে ছেলেমেয়েকে নিয়ে আগেভাগেই মা-বাবার সাথে ঈদ করতে বাড়ি যাচ্ছি। কিন্তু নদীর অবস্থা দেখে লঞ্চঘাটে এসেও ফের ফেরিঘাটের দিকে যাচ্ছি ফেরিতে পদ্মা পাড়ি দেয়ার জন্য।

পিনাক ডুবির ঘটনা স্মরণ করে একই সাথে থাকা চাকরিজীবী মো হুমায়ুন জানান, সেই কথা এখনো আমরা ভুলিনি। সে সময় আমরাও ওই লঞ্চটির পেছনে পেছনে আরেকটি লঞ্চে ঢাকার দিকে যাচ্ছিলাম। আমাদের এলাকার অনেকেই ওই দুর্ঘটনায় মারা যান। তাই ভাগ্নে ৯ বছরের সিফাত ও ভাগ্নি তিন বছরের সিনহাকে নিয়ে লঞ্চে যেতে ভয় লাগছে, এখন নদীতে অনেক ঢেউ।

এ ব্যাপারে শিমুলিয়া নদীবন্দরের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর তোফাজ্জল হোসেন জানান, এখন লঞ্চঘাটে যাত্রীর চাপ একেবারেই কম। তবে ঈদের আগে লঞ্চঘাটে যাত্রীর চাপ বেশি হলে তখন লঞ্চগুতে ধারণক্ষমতা অনুযায়ী গুনে গুনে যাত্রী দেয়া হবে। তা ছাড়া ওরস বা অন্য কোনো বড় ছুটিতে কখনো কখনো কোনো কোনো লঞ্চ অভারলোডিং করে থাকে বলে তিনিস্বীকার করেন।

বিডিলাইভ

Comments are closed.