ভাঙন: উত্তাল পদ্মা-মেঘনায় থেমে থেমে

বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই পদ্মা, মেঘনা উত্তাল হয়ে উঠেছে। প্রচণ্ড স্রোতের কারণে থেমে থেমে শুরু হয়েছে নদী ভাঙন। গত দুই সপ্তাহে রাক্ষসী পদ্মার ছোবলে লৌহজং উপজেলার কুমারভোগে ৫শ’ মিটার এলাকা ও মেঘনার করাল গ্রাসে গজারিয়ার ইসমানির চরসহ কয়েকটি গ্রামের কৃষি জমিসহ বিশাল এলাকা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

সময় মতো ব্যবস্থা নেওয়ায় মাওয়া প্রান্তে নির্মাণাধীণ পদ্মা সেতু এলাকায় আপাতত নদী ভাঙন হচ্ছে না। তবে বর্ষার শুরুতেই পদ্মার রুদ্রমূর্তিতে শ্রীনগর, লৌহজং, টঙ্গিবাড়ী ও সদর উপজেলায় পদ্মা তীরবর্তী এবং গজারিয়া ও মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার মেঘনা তীরবর্তী গ্রামগুলোর মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে ভাঙন আতঙ্ক।

লৌহজংয়ের কুমারভোগ গ্রামের পদ্মা সেতু এলাকায় ভাঙন রোধে তড়িৎ ব্যবস্থা নেওয়া হলেও গজারিয়া উপজেলার ইসমানিরচর এলাকার ভাঙন রোধে প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এ বিষয়ে প্রশাসন নির্বিকার থাকায় ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী মানববন্ধনও পালন করেছে। পাশাপাশি বৃহত্তর আন্দোলনে যাওয়ার কথা জানিয়েছে ইসমানিরচরসহ ভাঙন কবলিত গ্রামবাসী।

সূত্র মতে, পদ্মায় অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধিতে উত্তাল ঢেউ ও প্রচণ্ড ঘূর্ণিস্রোতের কারণে শ্রীনগর উপজেলার ভাগ্যকুল বাজার, মান্দ্রা, বাঘরা, কবুতর খোলা, কেদারপুর, চারিপাড়া, মাগডাল গ্রাম, লৌহজংয়ের কুমারভোগ, মাওয়া, কান্দিপাড়া, যশলদিয়াসহ বেশ কিছু এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। তবে ভাঙনে তীব্রতা না থাকলেও পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে ভয়াল রূপ ধারণ করছে পদ্মা।

ভাঙনাতঙ্কে ভাগ্যকুল বাজারের শতাধিক ব্যবসায়ী ও দোকানদার দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। গত বর্ষায় ভাগ্যকুল বাজারের অর্ধেক পদ্মায় বিলীন হয়ে যায়। এবার বাকি অংশ রাক্ষসী পদ্মাগর্ভে বিলীনের শঙ্কায় এখানকার ব্যবসায়ীরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বর্ষায় পদ্মার ভাঙনের প্রধান কারণ নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন। অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর মাঝখানে চর জাগছে। ফলে স্রোতের গতি তীরের দিকে তেড়ে আসছে। এর ফলে নদী ভাঙন দেখা দিচ্ছে।

এদিকে উত্তাল পদ্মার মতো মেঘনাও হিংস্র হয়ে উঠেছে। এর ফলে গজারিয়া উপজেলার ইসমানিরচর গ্রামসহ আশপাশ এলাকা এবং সদর উপজেলার চরকেওয়ার ও আধারা ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী গ্রামে ভাঙন দেখা দিয়েছে।

তবে ভাঙন রোধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এর প্রতিবাদে গত ২৯ জুন গ্রামবাসীর ব্যানারে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে ইসমানিরচর গ্রামের সর্বস্তরের শত শত নারী-পুরুষ অংশ নেন।
গ্রামবাসী জানান, প্রায় ১৫ বছর ধরে মেঘনার তাণ্ডবে ইসমানিরচরসহ আশপাশের এলাকায় ব্যাপক ভাঙন চলছে। এর ফলে বছরের পর বছর ধরে বসতবাড়ি, কৃষি জমিসহ বিস্তীর্ণ জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। চলতি বছরও ভাঙন শুরু হয়েছে। এর ফলে এ গ্রামের প্রায় দেড় হাজার পরিবার মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে জীবনযাপন করছে।

মেঘনার তীর ঘেঁষে বালু উত্তোলনের ফলে এ ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ গ্রামবাসীর। তারা জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা ৩-৪ বছর আগে সার্ভে করে গেলেও ভাঙন প্রতিরোধে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

গজারিয়া উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। এছাড়া তাৎক্ষণিক ভাঙন ঠেকাতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সেতু এলাকার নদী ভাঙন সম্পর্কে পদ্মা সেতু প্রকল্প ব্যবস্থাপক ও নির্বাহী প্রকৌশলী (মূল সেতু) দেওয়ান আব্দুল কাদের বলেন, মূলত ভাঙন দেখা দিয়েছে মাওয়া চৌরাস্তা বরাবর পদ্মা সেতুর পাইলিং এলাকা থেকে দেড় কিলোমিটার ভাটিতে শিমুলিয়া ফেরি ঘাটের পূবে কন্সট্রাকশন এলাকায়। গত কয়েক দিনে তিনটি স্পটে ১৫০ ফুট দীর্ঘ ও ১০ ফুট প্রশস্ত এলাকা ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তড়িৎ ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে ভাঙন প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যৎ ভাঙন রোধে কাজ চলছে। এ ভাঙনের ফলে পদ্মা সেতুর মূল কাজে কোনো প্রভাব ফেলবে না।

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর

Comments are closed.