অপরাধনামা : বাঁধের বারোটা বাজিয়ে ব্যবসা

তানভীর হাসান: মুন্সিগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধ ও ধলেশ্বরী নদী দখল করে ইট ও বালুর ব্যবসা করছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কয়েকজন স্থানীয় নেতা। এতে বাঁধের তিন কিলোমিটার এলাকায় ১৫-২০টি স্থানে বিশাল অংশজুড়ে ব্লক ধসে পড়েছে। সপ্তাহ দুই আগে মুক্তারপুর-রিকাবীবাজার সড়কের মালিরপাথর এলাকায় বাঁধসহ রাস্তা নদীতে বিলীন হয়ে যায়। সেই থেকে বন্ধ ওই সড়কের যোগাযোগ।

সদর উপজেলার পঞ্চসার ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি জাহিদ হাসান, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি রহমত উল্লাহ, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক আরমান হোসেন, মুন্সিগঞ্জ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মকবুল হোসেন এই বালু ও ইটের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

সরেজমিনে ঘুরে ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ধলেশ্বরীর তীর ঘেঁষে শহর রক্ষাবাঁধের হাটলক্ষ্মীগঞ্জ থেকে নয়াগাঁও এবং মুক্তারপুর সেতু হয়ে বিনোদপুর পর্যন্ত তিন কিলোমিটার অংশে ১৩-১৪টি স্থানে ইট ও বালুর ব্যবসা চলছে। কয়েকটি স্থানে বাঁধ ঘেঁষে বড় বড় গর্ত দেখা গেছে। সেসব গর্তে ড্রেজার দিয়ে বালু ভরাট করে বেচাকেনা চলছে।

ইট ও বালুর ব্যবসার সঙ্গে ১০-১২টি প্রতিষ্ঠান জড়িত। এর মধ্যে নয়াগাঁও এলাকায় আদিবা অ্যান্ড নাভা এন্টারপ্রাইজ, মুক্তারপুর ও মিরেশ্বরে আপন এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স মোহন এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স রাজিব এন্টারপ্রাইজ, মুক্তারপুরে সেতুর নিচে বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজ, বিনোদপুরে মেসার্স আরমান এন্টারপ্রাইজ ও আবদুর রহিম এন্টারপ্রাইজ ব্যবসা করছে।

এ ছাড়া কয়েকটি অটো রাইস মিলও বাঁধের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মায়ের দোয়া অটো রাইস, মেসার্স শাহ আলী অটো রাইসসহ তিনটি কারখানার ধান-চালের বস্তা ওঠানো-নামানোর জন্য বাঁধের ব্লকের ফাঁকে বাঁশ পুঁতে তৈরি করা হয়েছে জেটি। সেই জেটিতে ভিড়ছে বড় বড় নৌযান। এতে ধসে পড়ছে বাঁধের ব্লক।

বাঁধ ঘেঁষে তিনটি হাস্কিং (ধান ভাঙার কল) মিলও রয়েছে। ধান ভাঙার এই ছয়টি মিলের পয়োনিষ্কাশনের পাইপ বাঁধ ছিদ্র করে নদীতে টানা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, জাহিদ হাসান মুক্তারপুর, নয়াগাঁও ও মিরেশ্বরাই এলাকায় বাঁধকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তিনটি ড্রেজারের পাইপ পঞ্চসারের দিকে টেনে নিয়েছেন। আদিবা অ্যান্ড নাভা এন্টারপ্রাইজের এই মালিকের দাবি, তাঁর বালু ব্যবসার কারণে বাঁধের ক্ষতি হচ্ছে, এ কথা ঠিক নয়। তিনি বলেন, ‘আপনি যা জেনেছেন, তাই লিখে দেন। আমাকে জিজ্ঞেস করার কী আছে?’

মেসার্স মোহন এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. মোহন। মুক্তারপুরে তাঁর বাড়ির পাশে বাঁধ তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় তৈরি করা হয়েছে গর্ত। সেসব গর্তে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু সংরক্ষণ করে চলছে ব্যবসা। রহমত উল্লাহ বাঁধ এলাকায় বাঁশ পুঁতে নদী দখল করে তা আবদুর রহিমের কাছে ভাড়া দিয়েছেন। আবদুর রহিম জানান, এ জন্য রহমত উল্লাহকে বছরে ১৫ হাজার টাকা দিতে হয়। রহমত উল্লাহ বাঁধের সম্পত্তি নিজের দাবি করে বলেন, ‘আমার জায়গা ভরাট করে ব্যবসার জন্য ভাড়া দিয়েছি। এতে সমস্যা কী?’

রহমত উল্লাহর দখল করা অংশের পাশেই বাঁধ দখল করে ব্যবসা করছে মেসার্স আরমান এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানটির মালিক আওয়ামী লীগ নেতা আরমান হোসেনের ভাষ্য, এই সম্পত্তি তাঁদের কেনা। সরকার তাঁদের সম্পত্তি অধিগ্রহণ না করেই বাঁধ নির্মাণ করেছে। এখন সরকার বাঁধ থেকে অন্যদের সরিয়ে দিলে তাঁরাও সরে যাবেন।
নদীর এই সম্পত্তি বিআইডব্লিউটিএর বলে জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের মুন্সিগঞ্জ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মিয়া মাহমুদুল হক। তিনি বলেন, এই সম্পত্তি রক্ষায় বিআইডব্লিউটিএর ভূমিকা নেওয়ার কথা। দখল ও কারখানার পয়োনিষ্কাশন নদী ও পরিবেশ দূষণ হলে শিগগিরই বাঁধ পরিদর্শন করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

মুন্সিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র কে এম ইরাদত জানান, বাঁধের পঞ্চসার অংশে সবচেয়ে বেশি ইট-বালুর ব্যবসা। সেখানে বড় বড় ট্রলার নোঙর করে বাঁধের ক্ষতি করছে। বালুর ব্যবসার কারণে বাঁধটি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন পঞ্চসার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদর উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি হাবিবুর রহমান।

জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বলেন, ‘এসব ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়েও পারা যাচ্ছে না। সবকিছুই আপনারা জানেন ও বোঝেন। বাঁধ ও পরিবেশ আমাদের সবাইকে মিলেই রক্ষা করতে হবে।’

মুন্সিগঞ্জ-৩ (সদর ও গজারিয়া) আসনের সাংসদ ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপদপ্তর সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস বলেন, দখলকারীদের তিনি প্রশ্রয় দেন না। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তিনি প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন।

মুন্সিগঞ্জ পৌরসভা ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে পৌরসভার মাঝারি শহর সমন্বিত বন্যা প্রতিরোধ প্রকল্পের আওতায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ২৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে শহর রক্ষাবাঁধের নির্মাণ শুরু হয়। মুক্তারপুরে সেতুর প্রান্ত থেকে শুরু হয়ে লঞ্চঘাট হয়ে আবার মুক্তারপুরে সেতুর প্রান্ত পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার বাঁধকে ছয়টি গ্রুপে ভাগ করা হয়। ৩ কোটি ৭০ লাখ টাকায় বিনোদপুর থেকে হাটলক্ষ্মীগঞ্জ পর্যন্ত তিন কিলোমিটারে প্রথম গ্রুপের কাজ শেষ হয়। এরপর বাঁধ নির্মাণ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে অর্থদানকারী প্রতিষ্ঠান অর্থ দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এরপর নতুন করে কাজ এগোয়নি।

প্রথম আলো

Comments are closed.