অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, একজন আলোর মানুষ

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: ২৩ জুন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ৮০ বছরে পদার্পণ করলেন। একটি সফল এবং সৃষ্টিশীল জীবন তিনি পার করেছেন, অসংখ্য শিক্ষার্থীকে জ্ঞান ও উদ্দীপনা দিয়ে জগতের জন্য তৈরি করেছেন, আরও অসংখ্য তরুণের জন্য পথ-প্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি আমাদের জীবনে এক প্রয়োজনীয় উপস্থিতি। এ দেশের নানা ক্রান্তিকালে তিনি জাতিকে পথ দেখিয়েছেন- মানুষের শুসচেতনতা ও আদর্শের জায়গাগুলোতে জোরালো আলো ফেলে, তার পরিচয় অনেক- তিনি একজন শিক্ষক, একজন মৌলিক চিন্তাবিদ, একজন মননশীল লেখক; তিনি সৃষ্টিশীল লেখালেখিও করেছেন, গল্প লিখেছেন, নাটক অনুবাদ করেছেন। তার লেখালেখি ওই মননশীল-সৃজনশীল বিভাজনটিকে গৌণ করে ফেলে; যেহেতু তার প্রবন্ধ অথবা সাহিত্য ব্যাখ্যা অথবা সমাজচিন্তা বিকশিত হয় সৃষ্টিশীলতার সূত্রগুলো ধরে। তিনি এক সময় খবরের কাগজে কলাম লিখতেন। সেই কলামগুলোকে আমার কখনও মনে হতো সমকালীন রাজনীতির ব্যাখ্যা, কখনও মনে হতো অর্থনীতি অথবা সমাজতত্ত্ব সম্পর্কে বিশ্লেষী প্রতিবেদন, কখনও কখনও আত্মজৈবনিক কোনো বয়ান।

তিনি শ্রেণীকক্ষে যখন পড়ান, তার বিষয় শুধু সাহিত্যে সীমাবদ্ধ থাকে না- সাহিত্যের নন্দনতত্ত্ব, সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব অথবা সাহিত্যের রাজনীতিতে তা পরিব্যাপ্ত হয়। পশ্চিমা এবং পরবর্তীকালে আমাদের ভূখণ্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে ব্যাপকভাবে সাহিত্যতত্ত্বের পঠন-পাঠন শুরু হয়, তার প্রভাবে সেই জেফ্রি চসার থেকে নিয়ে গার্সিয়া মার্কেজ পর্যন্ত কবি-সাহিত্যিকদের লেখার নতুন মূল্যায়ন হয়েছে। মার্ক্সবাদী তত্ত্বের আলোকে পড়া হয়েছে চার্লস ডিকেন্স বা জেন অস্টেনকে, ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের আলো ফেলা হয়েছে ডিএইচ লরেন্স অথবা টিএস এলিয়টের ওপর। এডওয়ার্ড সাঈদের প্রাচ্যবিদ্যার চিন্তা ও সূত্রগুলো প্রয়োগ করা হয়েছে জোসেফ কনরাড অথবা ইএম ফস্টারের ক্ষেত্রে। সাহিত্যতত্ত্বের প্রয়োগ অনেকটাই বদলে দিয়েছে প্রথাগত সমালোচনা সাহিত্যকে।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার শিক্ষা জীবনের শুরু থেকেই তার নিজস্ব জ্ঞানচর্চা ও দৃষ্টিভঙ্গী থেকে সাহিত্যের তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন। তার ক্লাসে, এডওয়ার্ড সাঈদের ওরিয়েন্টালিজম (১৯৭৮) গ্রন্থটির অনেক আগে, প্রাচ্যবাদী চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। ফ্রয়েডীয় চিন্তা তাকে উৎসাহিত করত; সেই উৎসাহ চেতনা প্রবাহ পদ্ধতির বিশ্লেষণে অথবা কোনো ঔপন্যাসিক/কবির ব্যাখ্যাদানে ফ্রয়েডের সূত্রগুলো আমরা ব্যবহার করতে শিখেছি। মার্ক্সবাদে অধ্যাপক চৌধুরীর দীক্ষা ছাত্রজীবনের শুরুতেই; এ সামাজিক-অর্থনৈতিক ও জীবন দর্শনের প্রতি তার বিশ্বাসটি এখনও অটুট। তাকে আমি মৌলিক চিন্তাবিদ হিসেবে উল্লেখ করি শুধু তার ব্যাখ্যা ও তত্ত্বের নিজস্বতার জন্য নয়, বরং পূর্ব-পশ্চিম মিলিয়ে সামগ্রিক বৈশ্বিক চিন্তার জগৎটাকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেও তিনি নিজের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, জাতীয়তা-চিন্তা, শিক্ষাব্যবস্থা ও জীবনাচরণকে পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করে যেভাবে এ সব সম্বন্ধে নতুন পাঠ উপহার দেন, সে জন্য। একজন চিন্তাবিদ তখনি মৌলিক যখন তিনি প্রচলিত জ্ঞানের কাঠামোটিকে নতুন নতুন অভিজ্ঞতার আলোকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করতে পারেন।

অধ্যাপক চৌধুরী পশ্চিমা জ্ঞানকে গ্রহণ করেছেন, তিনি জ্ঞানের পেছনের প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রশ্ন করেছেন। পশ্চিমা একাডেমি যে জ্ঞান উৎপাদন করে, বিতরণ করার পূর্বে, তার সবকটাই কি নির্মোহ অথবা স্থান-কাল নিরপেক্ষ? জ্ঞানের রাজ্যে কি আধিপত্যবাদ অনুপস্থিত? অথবা জ্ঞানের রাজ্যে সহিংসতা? যে epistemological violence-এর কথা সাঈদ অথবা গায়ত্রী-স্পিভাক বলেন, তা কি বায়বীয় কোনো বর্ণনা? অবশ্যই নয়। অধ্যাপক চৌধুরী জ্ঞানের রাজ্যে স্ববিরোধী এসব সূত্রকে চিহ্নিত করেছেন। আধিপত্যবাদ নিয়ে তার অসংখ্য লেখালেখিতে জ্ঞানতাত্ত্বিক আদর্শবাদ ও তার ক্ষতিকর দিকগুলোর বিশ্লেষণ করেছেন। বিশ্বায়নের ঢেউ এখন আছড়ে পড়ছে আমাদের তীরে। জলোচ্ছ্বাস হয়ে সেই ঢেউ ডুবিয়ে দিচ্ছে আমাদের সংস্কৃতি, শিক্ষা ও অর্থনীতির নানা স্থাপনা। বিশ্বায়ন শব্দটি সচল মুদ্রা হওয়ার অনেক আগেই এই দিকটি সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তিনি। পশ্চিমা সংস্কৃতির কোনটা ভালো কোনটা মন্দ, কতটা গ্রহণীয় কতটা বর্জনীয়- এ ধরনের পরিমাণসূচক আলোচনা তিনি কখনও করেননি, কেন না তিনি ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্যে, তার পছন্দ-অপছন্দের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। কিন্তু তার লেখা পড়লেই বোঝা যায়, তিনি সংস্কৃতির শক্তি ও শক্তিহীনতার বিষয়টি কিভাবে দেখেন। তার উদ্বিগ্নতা বাড়ে যখন পড়ার ও দেখার মধ্যে এই যে দ্বন্দ্ব, তাকে তিনি বিচার করেন একটি সামগ্রিক সংস্কৃতি চিন্তার প্রেক্ষিতে।

ব্যক্তি সম্পর্কে অধ্যাপক চৌধুরীর যে বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করা হল তার সঙ্গে যোগ করতে হয় সমষ্টির কথাও। বস্তুত যদি তার ব্যক্তি ও সমাজ চিন্তার একটি সারাংশ করতে হয়, তাহলে ব্যক্তি ও সমষ্টিকে একই বন্ধনীতে রাখতে হবে। তিনি ইউরোপীয় রেনেসাঁসের ব্যক্তি চিন্তাকে যতখানি মূল্যবান মনে করেন, বাজপলি রেনেসাঁসের সমাজচিন্তাকেও ততটা গুরুত্বপূর্ণ ভাবেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর অথবা রামমোহন রায় অথবা বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে তার লেখালেখিতে সমাজ সংস্কারের প্রসঙ্গটি অনিবার্যভাবে আসে, সমষ্টির মঙ্গলচিন্তার কথাটি অবধারিত হয়ে পড়ে। পশ্চিমা বিশ্বে ব্যক্তির বেড়ে ওঠা আর আমাদের ভূখণ্ডে ব্যক্তির বেড়ে ওঠার মধ্যে তফাৎ আছে। এই তফাৎটুকু সমষ্টির গুরুত্বের নির্ণায়ক।

অধ্যাপক চৌধুরী ব্যক্তির উত্থান চান বরাবরই চেয়ে এসেছেন, কিন্তু ব্যক্তি যেন সমষ্টিকে ছাড়িয়ে না যায়, তার উত্থান যেন স্বার্থপর কোনো আকাশ-যাত্রা না হয়, সেদিকে তিনি ব্যক্তির দৃষ্টি নিবন্ধ করেন। রবীন্দ্রনাথের পাত্র-পাত্রীদের নিয়ে অধ্যাপক চৌধুরী অনেক লিখেছেন, শেক্সপীয়রের নারীদের নিয়ে লিখেছেন। শেক্সপীয়রের নারীদের মধ্যে তিনি রেনেসাঁসের ব্যক্তি-জিজ্ঞসা আর হয়ে-ওঠার সূত্রগুলোর সন্ধান করেন; কিন্তু রবীন্দ্রনাথের নারী (অথবা পুরুষ) চরিত্রে এ সবের বাইরেও সমাজের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের বিষয়গুলোর সংবেদী ব্যাখ্যা করেন। এই সমাজ-সম্পৃক্ততা শুধু তার মার্ক্সবাদী বীক্ষণের বহিঃপ্রকাশ নয়, এর শিকড়টি অনেক গভীরে প্রোথিত। বাংলাদেশের শ্রেণী-বিভাজিত সমাজে নিুবর্গীয়দের বঞ্চনা ও শোষণের সঙ্গে এর সম্পর্ক, তাদের অধিকারহীনতা ও সামাজিক কাঠামোয় তাদের প্রান্তবর্তিতা- এই পুরো ইতিহাসটিই তার অনুসন্ধানের ক্ষেত্র। এই অনুসন্ধানে ধর্ম, সংস্কৃতি, সংস্কার-কুসংস্কার- এগুলোর স্বরূপও চিহ্নিত হয়।

সমাজ ও মানুষ নিয়ে অথবা সংস্কৃতি ও ইতিহাস নিয়ে যখন ভাবেন অধ্যাপক চৌধুরী তখন তার কিছু চিন্তার সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়। তার মার্ক্সবাদী ও সমাজবাদী বিশ্বাসের কথা আগেও উল্লেখ করেছি। এর সঙ্গে আগে যুক্ত হয় তার সম্পাদক বা দৃষ্টিভঙ্গী। অধ্যাপক চৌধুরী কোনো সমাজ বা সাহিত্য ভাবনাকে খণ্ডিতভাবে দেখতে নারাজ। তিনি এর বিস্তৃৃত প্রেক্ষাপট খোঁজেন, যে প্রেক্ষাপটে সমাজ নির্মাণের উপকরণগুলো ছাড়াও মানুষের চিন্তার ইতিহাসটি সম্পর্কিত। পুঁজিবাদের যে বিকাশ সমাজকে বিভাজিত করছে এবং মূল্যবোধের ক্ষেত্রে ব্যাপক ধর্ম নামিয়েছে, তাকে তিনি শুধু পশ্চিম থেকে আসা একটি অপশক্তি হিসেবে দেখেন না; আমাদের সামন্তবাদী সমাজে আমাদের ভূমিতেই যে বৈষম্য-বঞ্চনা-শোষণের ক্ষেত্রটি বহুদিন ধরে প্রস্তুত হয়েছে, তাকেও চিহ্নিত করেন। পুঁজি যদি শুধু পশ্চিমা একটি উদ্ভাবন এবং আদিপত্য ও শোষণের হাতিয়ার হয়, তাহলে আমাদের দেশে এত দ্রুত এর সমর্থক-পূজারী-প্রচারক কিভাবে তৈরি হয়? পুঁজি যে শুধু একটি অর্থনৈতিক শক্তি বা অপশক্তি নয়, একটি প্রবণতারও নাম, সে বিষয়ে অধ্যাপক চৌধুরী আমাদের সজাগ করেন।

সমাজের মৌলিক পরিবর্তনে আজীবন প্রত্যয়ী অধ্যাপক চৌধুরী। তিনি আশা করেন, তিনি বিশ্বাস করেন, সমাজ বদলাবে। সমাজ কখনও স্থবির নয়, সমাজের ভেতরে অসংখ্য দ্বন্দ্ব থাকে, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া থাকে। এ সবের প্রভাবে সমাজ গতিশীল হয়। সমাজের ভেতরে অনেক প্রতিক্রিয়াশীলেরও বসবাস- অনেক অন্ধতা, অনেক বিস্ময়তার উপস্থিতি সমাজে। কিন্তু এর পরও সমাজে অগ্রসর চিন্তার প্রভাবটা টিকে থাকে- সমাজ এগোয়। কিন্তু এর জন্য সমাজের দেহে শক্তির জোগান দিতে হয় এবং সেই শক্তি আসে শিক্ষা থেকে, সংস্কৃতি ভাবনা ও সংস্কৃতি চর্চা থেকে। ব্যক্তির, বিশেষত নারীর অবস্থার উন্নয়ন থেকে।

যে সম্পাদক দৃষ্টির কথা একটু আগে বলা হয়েছে, সেই সম্পাদকিতার সূত্রে এগুলো সবই গ্রন্থিত- শিক্ষা, সংস্কৃতি, উন্নয়ন, ব্যক্তি উন্মোচন। তিনি শিক্ষাকে কখনও জীবনযাপনের একটি উপায় সৃষ্টির প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেননি। আজ শিক্ষাকে যে পণ্যে পরিণত করা হয়েছে এবং অনেক উচ্চমূল্যে- সাধারণ মানুষজনের ক্রয়ক্ষমতার অনেক বাইরে যে শিক্ষা বিকোচ্ছে তার ভয়াবহতা সম্পর্কে তিনি আমাদের অনেক আগেই সতর্ক করে দিয়েছেন। এই উচ্চমূল্যের শিক্ষা মানুষকে স্বার্থপর করে দেয়, সমষ্টি থেকে তাকে আলাদা করে দেয়। আরও ভয়ানক যা, ব্যক্তি সেই শিক্ষার প্রভাবে সমষ্টিকে ব্যবহার ও শোষণ করতে শেখে।

অধ্যাপক চৌধুরী যে শিক্ষার কথা বলেন, তা সহজিয়া কোনো বিষয় নয়, সেটি চর্চা ও অর্জনের বিষয়-সেটি শ্রেণীকক্ষে আহরণ করা যায় অথবা শ্রেণীকক্ষের বাইরে, কিন্তু সেই আহরণের পদ্ধতিটি হবে বৈজ্ঞানিক এবং সেই শিক্ষার ভিত্তি হবে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর শিক্ষা ভাবনার সঙ্গে সম্পর্কিত তার ভাষা-চিন্তা, যে ভাষা হবে শিক্ষার বাহন। তিনি বিশ্বাস করেন, মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। কেন না, তার ভাষায়, মাতৃভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত সংস্কৃতি ও ইতিহাসের ইতিহাসটি এবং এ দুয়ের প্রাসঙ্গিকতা শুধু মাতৃভাষা চর্চার মাধ্যমেই অনুধাবন করা সম্ভব। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রেও মাতৃভাষাকে তিনি প্রাধান্য দেন। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ও অধ্যাপক হয়েও তিনি মাতৃভাষার বিষয়টিকে সবার উপরে তুলে ধরেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, একজন শিক্ষার্থী প্রয়োজনে ইংরেজিসহ অন্যান্য ভাষা শিখবে, কিন্তু তার চিন্তা ও চিন্তা প্রকাশের জন্য মাতৃভাষাকেই বেছে নিবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ভাষার ক্ষেত্রে একটা অরাজকতা আমরা দেখেছি।

ইংরেজিকে বর্জন করা হল, আবার গ্রহণ করা হল। বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম করা হলেও এর শিক্ষণ ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে কোনো উন্নত পদ্ধতি ব্যবহার করা হল না। ইংরেজিকে নানাভাবে পুনর্বাসিত করা হল। অথচ উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে, ইংরেজির প্রাচল্য সত্ত্বেও, দৈন্য রয়ে গেল। অধ্যাপক চৌধুরী মাতৃভাষা নিয়ে আমাদের গ্লানিকে আমাদের অনুন্নয়নের জন্য দায়ী বলে বিবেচনা করেন। একেবারে প্রাথমিক পর্যায় থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত মাতৃভাষায় পঠন-পাঠনের জন্য একটি যথাযোগ্য পদ্ধতির প্রয়োগ সম্পর্কে তিনি অনেকবার বলেছেন। অধ্যাপক চৌধুরী তার চিন্তা-চেতনার একটা স্থানে ক্লাসিসিস্ট, অর্থাৎ ধ্রুপদপন্থী।

সেটি তার সাহিত্য রুচিতে- যদিও নতুন সাহিত্যকে এবং বিশ্বজুড়ে নিরীক্ষাধর্মী সাহিত্যের প্রকাশকে তিনি স্বাগত জানান, তার পড়াশোনার পরিধিতেও এসব সাহিত্য স্থান পায়। ধ্রুপদী চিন্তাটি তার দুটি ক্ষেত্রে সক্রিয়- একটি ঐতিহ্য নির্ণয়ে এবং অন্যটি জীবনদর্শনে। ক্লাসিক্যাল সাহিত্য যে ঐতিহ্য উপহার দিয়েছে আমাদের তাকে তিনি মূল্য দেন। এর অন্তর্গত জীবন দর্শনের যে মূল্যবোধ ও নৈতিকতা, তাকেও তিনি উচ্চে স্থান দেন। এই ধ্রুপদী চিন্তার মূলে আছে কিছু সর্বজনীন বিষয়-আশয়- যেমন ব্যক্তির দায়-দায়িত্ব, সমাজের সঙ্গে তার সম্পর্ক, প্রকৃতি, প্রেম ইত্যাদি। একই সঙ্গে একটি কাঠামো চিন্তাও যে কাঠামোটি গভীরতা প্রত্যাশী। মাতৃভাষার ক্ষেত্রে এই সমাজ ও কাঠামো চিন্তার প্রেক্ষিতটি আপনা থেকেই তৈরি হয়ে যায়। যে মাতৃভাষা একজন ব্যক্তিকে নির্মাণ করবে, তার ভাবনা ও চিন্তার জগৎ তৈরি করে দিবে, তার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে তার সম্পর্কটি অবধারিত করবে, তাকে অবহেলা করলে মানুষ শেষ পর্যন্ত অনিকেত ও উন্মুল হয়েই থাকবে। তাছাড়া মাতৃভাষা চর্চা একজন ব্যক্তিতে অপসংস্কৃতি অথবা উন্মুল সংস্কৃতির প্রভাব থেকে রক্ষা করবে।

তার আরেকটি প্রিয় বিষয় ইতিহাস। তবে প্রথাগত ইতিহাসে তার বিশ্বাস নেই- সে ইতিহাস বা ক্ষমতাবানদের ক্রনিকলকে তিনি প্রশ্ন করেন। তার বিশ্বাস গণমানুষের ইতিহাসে। শেষ সত্তর-আশির দশকে অনিবাসী ও নিবাসী কিছু ভারতীয় ইতিহাস ও সমাজতত্ত্ববিদ মিলে যে নিুবর্গীয় ইতিহাস চর্চার সূত্রপাত করেন, যা প্রথাগত জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবিদ্যাকে চ্যালেঞ্জ করে; প্রান্তজনকে কেন্দ্রে নিয়ে আসে এবং কেন্দ্রস্থিত গুরুত্বপূর্ণদেরকে প্রান্তে নিয়ে আসে, সেই ইতিহাস চর্চা তার সায় পায়। তিনিও বিশ্বাস করেন, প্রথাগত ইতিহাস আধিপত্যবাদকে মাথায় রেখে লঘু-গুরু বিচারে নামে, অনেক রক্তারক্তির ইতিহাসকে নানা বর্ণনায় মহিমান্বিত করে। অথচ এই ইতিহাস সাধারণ মানুষই ইতিহাসের প্রকৃত আকর। সাধারণ মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস রচনা করে বৃহত্তর ইতিহাস কাঠামোর। এক দিক থেকে দেখতে গেলে নিুবর্গীয় ইতিহাস আমাদের দৃষ্টিকে ভুল দিগন্ত থেকে ফিরিয়ে এনে নিজের ভেতরে স্থাপন করে। অধ্যাপক চৌধুরী ইতিহাসের মোড় ফেরাগুলোকে, তার ছোট-বড় ঘটনাসমষ্টিকে সাধারণ মানুষের জীবন ও সময় এবং তাদের আশা আকাঙ্ক্ষার আলোকে বিশ্লেষণ করাকে ইতিহাসের একটি পদ্ধতিগত আবশ্যকীয়তা বলে বিবেচনা করেন। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এক বিরল, বহুমাত্রিক প্রতিভা। তাকে আমাদের সামনে একজন পথ-প্রদর্শকের ভূমিকায় দীর্ঘদিন দেখতে চাই।
শতায়ু হোন স্যার।

জন্মদিনের শুভেচ্ছা। আমাকে জীবনের অনেকগুলো পাঠ অকপটে এবং অকৃপণভাবে দেয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা।

যুগান্তর

Comments are closed.