মোঘল আমলের পোল ঘাটার ইটের পুল

কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার রামপাল ইউনিয়নের পোল ঘাটার ইটের পুল। ইট ও সুরকি দিয়ে তৈরি এই পুলটি মোগল আমলের অন্যতম আকর্ষণীয় পুরার্কীতি। জেলা শহর থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই পুলটি সদর উপজেলা ও টঙ্গীবাড়ি উপজেলার মধ্যে বন্ধন তৈরি করে রেখেছে। পুলটির পশ্চিম পাশে টঙ্গীবাড়ি উপজেলা আর পূর্ব প্রান্তে সদর উপজেলা।

অমূল্য এই স্থাপত্যটি এখন জৌলসহীন, ধ্বংসের পথে। পুরাকৃর্তি অধিদফতর একটি সাইনবোর্ড লাগিয়েই যেন দায়িত্ব সেরেছে কর্তৃপক্ষ। অযত্ন আর অবহেলায় ক্রমেই এটি বিনষ্ট হচ্ছে। পুলটির মাঝে দেখা দিয়েছে ফাটল। পুলের ওপর দিয়ে এখন আর কোন যন্ত্রযান চলছে না। তবে রিক্সা, সাইকেল, মোটরবাইকসহ ছোটখাটো যান চলছে। অর্ধাবৃত্তের মতো এই পুলটির মাঝখানে নৌ চলাচলের ৩টি স্থান রয়েছে। দু’পাশের ২টি ছোট আকারের হলেও মাঝেরটি বেশ বড়। কমলাঘাট-দীঘিরপাড় খালের ওপর এই পুলটি নির্মিত। এই খালটি পদ্মা থেকে ধলেশ্বরী নদীতে যুক্ত। এই খাল দিয়ে দীর্ঘকাল ধরে লঞ্চসহ বিভিন্ন নৌযান চলাচল করলেও সেতুটির ক্ষতি হয়নি।

বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী খালটি মৃতপ্রায়। লঞ্চতো দূরের কথা নৌকাও ঠিকমতো চলতে পারছে না। শুষ্ক মৌসুমে খালটি একবারেই শুকিয়ে যায়। সম্প্রতি ভারতীয় দূতাবাসের সেকেন্ড সেক্রেটারি সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায় তার পুত্র নীল ও নয়নকে নিয়ে এসেছিলেন মোগল আমলের এই স্থাপনাটি দেখতে। এসময় তিনি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, পুরাকীর্তি সংরক্ষণের পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যাবশ্যক। তিনি মনে করেন বিক্রমপুরের পুরাকীর্তিগুলো যথাযথ সংস্কার এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে দেশী-বিদেশী পর্যটকের আগমন বাড়বে। তিনি ভারতের বিভিন্ন পুরাকীর্তি পর্যটন উপযোগী করা প্রসঙ্গে বলেন, পর্যটকরা যাতে সঠিক ইতিহাস জানতে পারেন সে জন্য স্ব-স্ব পয়েন্টে বুকলেট বা তথ্য সংবলিত পুস্তিকা রাখা উচিত।

পোলঘাটা গ্রামের ইসমাইল হোসেন জানান, এই পুলটি মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মৃতি বহন করছে। মুক্তিযোদ্ধারা এই পুলটিকে কেন্দ্র করে এখানে ক্যাম্প তৈরি করেছিল এবং পাকি বাহিনীদের প্রতিরোধে নানা পরিকল্পনা ছাড়াও ব্রিজের এপার ওপার সম্মুখযুদ্ধও হয়। ব্রিজের পাশের টোকানী পালের বাড়িতে পাকি বাহিনী নির্মম গণহত্যা চালায়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, মোগল শাসনামলের অন্যতম স্থাপনা এটি। এটিকে সংরক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি। তিনি মনে করেন মোগল আমলের এই ইটের পুল ছাড়াও এর কাছেই রঘুরামপুরে সদ্য আবিষ্কৃৃত পাল আমলের বৌদ্ধবিহার এবং নাটেশ্বরে বৌদ্ধমন্দির স্তুপ, কাজী কসবায় সুলতানী আমলের বাবা আদমের মসজিদ, মুন্সীগঞ্জ শহরের মোগল আমলের ইদ্রাকপুর কেল্লা এবং সোনারং এর ব্রিটিশ আমলের জোড় মঠকে নিয়ে একটি পর্যটন জোন করা হলে এটি দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। এই পুলটি এলাকায় গায়েবি পুল হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে। এখনও প্রবীণ অনেকেই মনে করেন এটি নির্মাণ করা হয়নি। অলৌকিকভাবেই এটি এখানে বসানো হয়েছে। তবে এসকব গুজব উড়িয়ে দিয়ে অধ্যাপক সুফী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ইতিহাস বলে এটি মোগল আমলের তৈরি। ওই সময়ের রাজাদের সড়কপথে চলাচলের জন্য এই পুলটি স্থাপন করা হয়েছিল।

নয়াদিগন্ত

Comments are closed.