জাপানে ‘মুন্শীর হাট’ খোঁজা

রাহমান মনি: অনেকে হয়ত বলবেন বা বলে থাকেন, আমার বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা। সবার কাছে অন্তত তাই-ই মনে হয়। তবে কেন জানি আমি তা মনে করতে পারি না। আমি আমার বাবাকে পৃথিবীর তাবৎ বাবাদের সঙ্গে তুলনা করতে পারি না। আমার বাবা আমার কাছে খোদাতায়ালার শ্রেষ্ঠ দান। যার উছিলায় আজকের এই আমি। আমার পিতার নাম মো. ফজলুর রহমান। তার সন্তান মো. মোখলেসুর রহমান এই আমি।

আমি মনে করি আমার বাবা আমার সর্বশ্রেষ্ঠ একজন শিক্ষক। বাবাকে নিয়ে অহঙ্কার করার মতো শ্রেষ্ঠ অবলম্বন হচ্ছে তার সততা। বাবার সততাই আমার মনের মন্দিরে শ্রেষ্ঠ আসন অলঙ্কৃত করে রেখেছেন। বাবার কাছ থেকে আমি তিনটি বিষয়ে শিক্ষা নিয়ে বুকে ধারণ করে জীবন চলার পথে তা প্রয়োগ করার চেষ্টা করে থাকি। আর তা হলো সততা, সময়কে মূল্য দেয়া এবং অন্যায়কে প্রশ্রয় না দেয়া।

আমার বাবা ছিলেন খুবই কঠোর প্রকৃতির একজন লৌহমানব। নুন থেকে চুন খসলেই আমাদের বিশেষ করে আমার ওপর খড়গ নেমে আসত। আর কেউ যদি বাবার কাছে তার সন্তানের নামে কোনো প্রকারের নালিশ করে যেত, তাহলে বিষয়টি যাচাইয়ের আগেই প্রহার করে নেয়া ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। বাবার কথা ছিল, অযথা কেউ কারোর বিরুদ্ধে নালিশ নিয়ে আসে না। নিশ্চয়ই কিছু না কিছু করেছে। কোনো কৈফিয়ত শুনতে নারাজ।

সন্ধ্যায় মাগরিব নামাজের পর বাসায় ঢোকার কথা কল্পনাও করতাম না কখনো। স্নাতক পাস করার পরও মাগরিব নামাজের পর বাড়ি ফেরার কারণে মার খেতে হয়েছে বাবার হাতে, সবার সামনে।

আমার বাবা ছিলেন থানা কৃষি কর্মকর্তা (টি.এ.ও)। এজন্য সবাই তাকে টিও সাব বলেই ডাকতেন। ২০০১ সালের ২৪ আগস্ট আব্বা আমাদের ছেড়ে চলে যান না ফেরার দেশে। তার মাত্র ৯ মাস আগে প্রিয়তমা স্ত্রীকে পাঠিয়ে দেন একই দেশে। কিন্তু আজও মুন্সীগঞ্জ শহরে মাঠপাড়া টিও সাহেবের বাসা বললেই সবাই এক নামেই চেনেন। তার সততাই তাকে এই পরিচিতি এনে দেয়।

আব্বা খুব সকালে ঘুম থেকে উঠতেন। উঠেই তিনি নামাজ সেরে উচ্চকণ্ঠে পবিত্র কোরান তিলওয়াত করতেন এবং শেষে সবার জন্য, দেশের জন্য, জাহানের জন্য দোয়া করতেন এবং বিশেষ করে সব ছেলেমেয়ের নাম ধরে তাদের সুস্থতা, দীর্ঘায়ু এবং হেফাজত কামনা করতেন। শেষ হলেই শুরু হতো সবার ঘুম ভাঙানোর কাজটি। আব্বা প্রতিদিন একই কথা বলতেন, ‘পড়ালেখার কথা চিন্তা করলে কোনো ছাত্র কি এতক্ষণ পর্যন্ত ঘুমাতে পারে?’

আব্বা বাজার করতেন নিজ হাতে। খুব পছন্দ করতেন বাজার করা। আর এ কারণে প্রতিদিন দুই/তিন বার বাজারে যেতেন তাজা জিনিস কেনার জন্য। দুপুরের পর মুন্সীগঞ্জ মাছের বাজারে তখন রিটা, পাঙাশ জাতীয় তাজা মাছ পাওয়া যেত। মুন্শীর হাট যাওয়া আব্বার চাই-ই চাই।

মুন্শীর হাট হলো মুন্সীগঞ্জ শহরের অদূরে একটি হাটের নাম। প্রতি শনি ও মঙ্গলবার হাট বসত সেখানে। বিশেষ করে শনিবারের হাটে তাকে যেতেই হবে। নিজের প্রয়োজনে না হলেও অন্যের প্রয়োজনেও।

১৯৯৫ সালে আব্বা এবং মাকে জাপানে আনি বেড়ানোর জন্য। আব্বা তখন রিটায়ার্ডজনিত এবং পারিবারিক সূত্রে পাওয়া স্মৃতিভ্রমজনিত সমস্যায় ভুগছেন। বর্তমানকে মনে রাখতে পারেন না। এমনকি খাবার খেয়েছেন কি না মনে করতে পারেন না। চিনতে পারেন না নিজ সন্তানদেরও। যাদের হেফাজতের জন্য যিনি প্রতি প্রত্যুষে দোয়া কামনা করতেন, কিন্তু অনেক আগের কথা সব মনে রাখেন। সুরা ইয়াসিন, তওবা, আররাহ্মান, হাসর কিংবা সুরা বাকারা বলতে পারতেন নির্ভুলভাবে। এবং নামাজে আয়াত পাঠ করতেন নির্ভুল। কিরাত পড়ে তিনি নামাজ আদায় করতেন।

হঠাৎ একদিন সকালবেলা আব্বা বাসায় নেই। আশপাশ খোঁজাখুঁজির পরও পাওয়া গেল না। মা-ও কিছুই বলতে পারেন না। এদিকে আমারও কাজে যাবার সময় হয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানের চাবি থাকে আমার কাছে। না গেলেই নয়। অনেক চেষ্টার পর পুলিশকে ইনফর্ম করি বাধ্য হয়ে। মাকে বলি, আমি গিয়ে খুলে দিয়েই চলে আসব। এসেই আব্বাকে খুঁজে বের করব। কারণ জাপানে ইচ্ছা করলেও কেউ হারাতে পারেন না। পুলিশকে জানানো হয়েছে, কাজেই দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। যদি পুলিশ বা কেউ আসেন, আপনি কেবল দরজাটা খুলে দেবেন।

এই বলে দরজা খুলে বের হওয়ার সময় দেখি দুজন পুলিশ, আব্বা এবং হাবিব নামের আমার এক বন্ধু এসে হাজির। তা-ও আবার পুলিশের গাড়ি চড়ে। জানা গেল, আব্বা মুন্শীর হাটের উদ্দেশে বের হয়েছিলেন এবং মুন্শীর হাট না পেয়ে অচেনা পথে দিগি¦দিক খোঁজার পর আমার আগের বাসার ঠিকানা মুখস্থ থাকায় যাকে পেয়েছেন তাকেই জিজ্ঞাসা করেছেন। যে ঠিকানায় তিনি আমাকে নিয়মিত চিঠি লিখতেন। সেই ঠিকানায় হাবিব নামের বন্ধুটি তখনও থাকতেন। লোকজনের কাছে ঠিকানা বলাতে এবং সব শেষে পুলিশের কাছে ঠিকানা বলাতে জাপান পুলিশ তাকে সেই ঠিকানায় নিয়ে যায়। যা, বর্তমান বাসা থেকে ৫/৬ মাইল দূরে অবস্থিত।
এদিকে যাকে নিয়ে এত হুলস্থুল সেই আব্বা নির্বিকারভাবে কেবলি বলতে থাকলেন আমি মুন্শীর হাট কেন খুঁজে পেলাম না? আমি কি মুন্শীর হাট চিনি না বলে মনে করিস। তোরা আমাকে কেন মুন্শীর হাট নিয়ে যাস না। মা যতই বলেন না কেন যে, আপনি এখানে মুন্শীর হাট খুঁজে পাবেন কোথায়? আপনি তো এখন অঞ্জুর বাসায়। আব্বা কিছুটা রাগান্বিত স্বরে মাকে বললেন, আমার তৃতীয় ছেলে মো. মোখলেসুর রহমান অঞ্জু (এই আমি) তো জাপান থাকে। তুমি অঞ্জুকে এখানে পেলে কোথায়? অর্থাৎ আব্বা স্মৃতিভ্রমজনিত কারণে বুঝতেই পারেননি যে তিনি জাপানে অবস্থান করছেন এবং জাপানে মুন্শীর হাট নেই। এরপর যতদিন তিনি জাপানে ছিলেন ততদিনই মুন্শীর হাটের কথা বলেছেন এবং খুঁজে ফিরেছেন।

আব্বার কোনো ধরনের বদঅভ্যাস ছিল না। এমনকি হোটেলেও কোনো দিন খাবার খেতেন না। কিন্তু মৌসুমি ফল খাওয়া তার চাই-ই চাই। প্রচুর ফলমূল কিনতেন। আব্বা বলতেন, আমার যদি পান, বিড়ি-সিগারেটের অভ্যাস থাকত তাহলে কি পয়সা খরচ হতো না? সেই পয়সা আমি এখানে খরচ করি। আব্বা খেতে খুব পছন্দ করতেন তবে পরিমাণে খুবই কম এবং বাছাইকৃত খাবার। তার চেয়েও বেশি পছন্দ করতেন মানুষজনকে খাওয়াতে। আর এই কারণে আমাদের বাসায় মেহমান প্রায়শই লেগে থাকত।

আমরা দশটি ভাইবোন। কিন্তু পড়াশোনার পেছনে সাধ্যমতো খরচ করতেন আমার বাবা। তার সাধ্য ছিল সীমিত, তারপরও বলতেন তোরা পড়, প্রয়োজনে আমি শরীরের রক্ত বিক্রি করে হলেও তোদের পড়াশোনার খরচ চালাব।

আজ আব্বা আমাদের মাঝে নেই। নেই স্নেহময়ী মা-ও। দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা যেমন বোঝা যায় না, তেমনি বাবা-মা বেঁচে থাকতে পড়াশোনার মর্যাদা বুঝিনি, আব্বার মন ভরাতে পারিনি।

আব্বা সবসময় পত্রিকা পড়তেন। বাসায় সবসময় পত্রিকা রাখা হতো। আব্বা সম্পাদকীয় পড়তেন। বলতেন আমার কোনো সন্তান যদি লেখালেখি করত। আব্বার সে আশাও পূরণ করতে পারিনি তার জীবদ্দশায়।

আব্বার কোনো আশাই পূরণ করতে না পারলেও তার কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা, সততা, সময়কে মূল্য দেয়া এবং অন্যায়কে প্রশ্রয় না দেয়ার নীতি আজও মেনে চলছি এবং বাকি জীবনও বহন করে যাব ইনশাআল্লাহ।

rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক

Comments are closed.