রাজনীতি: জামায়াত না ছাড়লে ভেঙে যেতে পারে বিএনপি

জামায়াত না ছাড়লে আবার ভাঙনের মুখে পড়তে পারে বিএনপি। জঙ্গি ও সন্ত্রাসী তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে এবং যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করতে শিগগির ‘আলটিমেটাম’ দেওয়া হবে বিএনপিকে। বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যে জামায়াত না ছাড়লে বিএনপি আবারও ভেঙে নতুন দল গঠন করা হতে পারে। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে ভেতরে-ভেতরে ‘হোমওয়ার্ক’ শুরু করেছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা। এক্ষেত্রে বিএনপি থেকে জামায়াতবিরোধী নেতাদের বড় একটি অংশ ‘বিদ্রোহ’ করে নতুন ওই দলে যোগ দিতে পারেন। একইসঙ্গে বিএনপি থেকে আগে বেরিয়ে যাওয়া সাবেক সংসদ সদস্য এবং খালেদা জিয়ার বিরাগভাজন সাবেক বেশ কিছু সংসদ সদস্যও যোগ দেবেন নতুন দলটিতে। নতুন দলটির নেতৃত্বে থাকতে পারেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ও বিকল্পধারার সভাপতি অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী। বর্তমানে বিএনপির ভেতর বঞ্চিত ও কোণঠাসা সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন তিনি। একাধিক নেতা সমকালকে বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

সূত্র জানায়, নতুন ওই দলটি হবে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত। জিয়ার ১৯ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নকেই প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা করবেন তারা। বর্তমানে বিএনপি জিয়াউর রহমানের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে বলে দাবি ওই নেতাদের। পবিত্র রমজান মাসে ভেতরে-ভেতরে প্রস্তুতির কাজ চালাবেন তারা। ইতিমধ্যে বিএনপির ভেতর ক্ষুব্ধ জাতীয় স্থায়ী কমিটি, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদ, জাতীয় নির্বাহী কমিটি, মহানগর ও জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের নাম তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে।

নতুন দল গঠনের উদ্যোগী কয়েকজন নেতা সমকালকে জানান, দেশি-বিদেশি মহল চায় না বিএনপি মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্ত দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রাখুক। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে চূড়ান্তভাবে জামায়াত ত্যাগ করতে বলা হবে। শেষ পর্যন্ত যদি তিনি তার বর্তমান অবস্থানে অনড় থাকেন, তাহলে বিএনপি ভাঙনের মুখে পড়তে বাধ্য হবে। অন্যথায়, আগামী ডিসেম্বর বা জানুয়ারির দিকে বিকল্প বিএনপি গঠনের তৎপরতা দৃশ্যমান হতে পারে।

নতুন দল গঠনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিএনপি থেকে বেরিয়ে যাওয়া সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত সাবেক সাংসদ ও নেতাদের উদ্যোগে গতকাল বিকেলে রাজধানীতে লেকশোর হোটেলে সাবেক স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলীর স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ও সাবেক হুইপ আশরাফ হোসেন। সভায় বলা হয়, শেখ রাজ্জাক আলী বিএনপি থেকে কষ্ট পেয়ে চলে গেছেন। সভায় সাবেক হুইপ শহিদুল হক জামাল, বিএনপি দলীয় সাবেক সাংসদ আবু হেনা, আবদুল করিম আব্বাসী, জিএম সিরাজ, আবদুল গনি, এম আবদুল্লাহ, জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট মহসিন রশিদ, এফবিসিসিআইর সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি দেওয়ান সুলতান, এএসএম আবদুল মতিনসহ কয়েকজন সংস্কারপন্থি বিএনপি নেতা উপস্থিত ছিলেন।

এ বিষয়ে বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আশরাফ হোসেন গতকাল রাতে সমকালকে বলেন, বিএনপিতে গণতন্ত্র নেই বলেই আজকে দলের এ পরিস্থিতি হয়েছে। দলের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে জড়িত নেতাদের বক্তব্যকে মূল্যায়ন করলে এই হাল হতো না। বিএনপিতে নতুন মেরুকরণ সম্পর্কে প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান তিনি। শেখ রাজ্জাক আলীর স্মরণসভা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা সাবেক এমপিরা হঠাৎ করেই স্মরণসভাটির আয়োজন করেন। সময়ের অভাবে গণমাধ্যমকেও আমন্ত্রণ জানানো সম্ভব হয়নি।

রাজনীতির নতুন মেরুকরণ সম্পর্কে গতকাল একটি বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানেও ‘ইঙ্গিতপূর্ণ’ বক্তব্য দিয়েছেন বিকল্পধারার সভাপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তিনি বলেছেন, জামায়াতনির্ভর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির রাজনীতি টিকবে না। বিএনপির রাজনীতির তিনটি স্টেজ রয়েছে। প্রথমে জিয়াউর রহমানের বিএনপি। তারপর এলো খালেদা জিয়ার রাজনীতি। এ নিয়ে মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। তৃতীয় স্টেজে বর্তমানে যেটা চলছে, সেটি জামায়াতনির্ভর খালেদা জিয়ার রাজনীতি। দেশে-বিদেশে এখন যে চাপ তাতে এ রাজনীতি টিকবে বলে মনে হয় না। চতুর্থ স্টেজে বিএনপিকে আবারও জিয়ার রাজনীতি চালু করতে হবে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব বদরুদ্দোজা চৌধুরী মনে করেন, ‘যদি বিএনপি বাঁচতে চায়, আবার জনগণের দল হতে চায় তাহলে তাকে অবশ্যই জিয়াউর রহমানের আদর্শের কাছে ফিরে যেতে হবে।’

এর আগে তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় এবং নিজ দলের একটি অনুষ্ঠানে বিএনপি সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করেন। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সভায় অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছিলেন, বিএনপি জিয়ার আদর্শ থেকে দূরে সরে গেছে। বিএনপি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, দেশের পরিবর্তন ঘটানোর আগে নিজেদের বদলাতে হবে। নিজেদের ভুল-ত্রুটি সংশোধন করতে হবে। ব্রিটেনপ্রবাসী বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ভ্রাতুষ্পুত্রের কথা চিন্তা করে রাজনীতি করলে হবে না। সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে রাজনীতি করতে হবে। বি চৌধুরীর এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন বিএনপির অনেক নেতাও। বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন তারা।

গত ৪ জুন কুড়িলে বিকল্পধারার কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগ যেমন বঙ্গবন্ধুর কর্মসূচি গ্রহণ করেনি, তেমনি বিএনপিও জিয়ার একটি কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করেনি। বঙ্গবন্ধু বাকশাল করেছিলেন মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য। যদিও মানুষ এটা গ্রহণ করেনি। এমনকি বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগও বাকশাল চায়নি। একইভাবে জিয়াউর রহমানের বৈপ্লবিক খালকাটাসহ কোনো কর্মসূচিই বিএনপি বাস্তবায়ন করেনি।

এছাড়াও দলটির শীর্ষ নেতারাও আত্মসমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছেন। শীর্ষ নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বেশি সোচ্চার। বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ টেলিফোনে এক নেতাকে বলেছেন, ‘এই বিএনপি দিয়ে কিছু হবে না। এটুকু জেনে রাখো। … জিয়াউর রহমানের বিএনপি যদি করতে পারো …।’ গত ৪ মে মওদুদ আহমদ ও ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি বজলুল করিম চৌধুরী আবেদের মোবাইল ফোনের কথোপকথনটি পরে ইউটিউবে ফাঁস হলে দলের ভেতর ও বাইরে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।

দলের স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমানও বর্তমান বিএনপি নিয়ে অনুরূপ নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। মাহবুবুর রহমান ও যুবদলের কেন্দ্রীয় সদস্য অ্যাডভোকেট রইসের কথোপকথন ফাঁসে তা জানা যায়। সেখানে তিনি বলেছেন, খালেদা জিয়াকে দিয়ে হবে না! ওই যুব নেতাকে তিনি বলেন, তোমাদের বিপদ আছে। এছাড়া শ্রমিক দলের এক আলোচনা সভায় তিনি বলেছেন, জিয়াউর রহমানের বিএনপিতে দুর্নীতি ছিল না, আর এখন যেন দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি নিত্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সঙ্গত কারণেই জিয়ার আদর্শে গড়া সেই বিএনপির মতো দলকে আবারও সাজাতে হবে। গতকাল এসব বিষয়ে আলাপকালে বিএনপি ভাঙনের আশঙ্কার বিষয়টি উড়িয়ে দেননি মাহবুবুর রহমান।

জামায়াতে ইসলামীকে ত্যাগ করতে দীর্ঘদিন ধরে দলটির ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছে দেশি-বিদেশিরা। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশ ও দাতা সংস্থাগুলো প্রকাশ্যে ও পর্দার আড়ালে বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার পরামর্শ দিচ্ছে। ভোটের রাজনীতির হিসাব-নিকাশ করে জামায়াতকে ছাড়তে নারাজ দলটি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ৭ জুন বাংলাদেশ সফরকালে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎকালে একই বার্তা দিয়েছেন। ভারত গণতন্ত্রকে সমর্থন করলেও সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে সমর্থন করে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন মোদি।

২০১২ সালের শেষ দিকে খালেদা জিয়ার সপ্তাহব্যাপী ভারত সফরকালে দেশটির নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রধান শিবশঙ্কর মেনন বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে পাকিস্তানভিত্তিক বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীর যোগাযোগ রয়েছে বলে জানান খালেদা জিয়াকে। এ বিষয়ে তাদের হাতে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত রয়েছে বলেও জানান তিনি। জবাবে তখন খালেদা জিয়া বলেন, জঙ্গিদের সঙ্গে জামায়াতের কোনো সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবেন তারা। অবশ্য সাক্ষাতের দুই বছর পার হলেও জামায়াতকে সঙ্গে নিয়েই জোট বহাল রেখেছে বিএনপি।

সমকাল

Comments are closed.