পদ্মাপাড়ে বিশ্বসেরা হ্যামারে নতুন চমক

এক সপ্তাহ আগে যারা পুরাতন মাওয়া ঘাটে যাননি এখন গেলে চমকে উঠবেন। অনেক কিছু দেখে অচেনা ও অজানা মনে হবে। সপ্তাহ বললে ভুল হবে, মূলত প্রতিনিয়তই পাল্টে যাচ্ছে পদ্মাসেতুর দুই পাড়।

বিশেষ করে মাওয়া ঘাটের পরিবর্তন একটু বেশিই লক্ষ্য করা গেছে। মাওয়া চৌরাস্তা থেকে নদীর পুরাতন ঘাটের সোজা পথটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

সেখানে এখন নদী ও তীরের চারদিকে ছোট ছোট হ্যামার আর ক্রেনের যেন মেলা বসেছে।

এর আগে থেকেই মাওয়া ঘাটে ভেতরে নদীতে দুটি স্থানে ৫০০ ও ২৫০ টন ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি এবং ৫০ টনের কয়েকটি ক্রেন ভাসমান বার্জে বসিয়ে পরীক্ষামূলক পাইলিংয়ের কাজ চলছে। দু’টি টেস্ট পিলারের কাজ সম্পন্ন করা হয়ে গেছে। এখন চলছে স্থলভাগে একটি টেস্ট পিলারের কাজ।

পদ্মাসেতু প্রকল্পের এলাকায় কথা হয় শ্রমিক শফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি পিলার টেস্টের কাজে চায়না প্রকৌশলীদের সাহায্য করছিলেন। ৫০০ টন হ্যামারের কর্মযজ্ঞ দেখাতে দেখাতেই তিনি বললেন, ইডা (এটা) আর কি হ্যামার দ্যাখছেন, নদীতি(নদীর মধ্যে) বিরাট বড় হ্যামার আইচে(এসেছে)। দ্যাখেন গে।’

নদীর পাড় থেকেই চোখে পড়ে সে হ্যামার। ট্রলারে নদীর ভেতরে গিয়ে দেখা গেলো হ্যামারের মূল চেহারা। বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রায় আড়াই হাজার টন ক্ষমতাসম্পন্ন এই হ্যামারই বহুল প্রতিক্ষিত হাইড্রোলিক হ্যামার।

এটিই এখন পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রধান আকর্ষণ। কারণ এর আগে বাংলাদেশে এত বড় হ্যামার কোনো স্থাপনার কাজে ব্যবহার করা হয়নি। আর বলা হচ্ছে বিশ্বের কোথাও এত শক্তিধর হ্যামারের ব্যবহার হয়নি। পদ্মাসেতু প্রকল্পের জন্য বিশেষ অর্ডারে বানানো হয়েছে এই হাইড্রোলিক হ্যামার।

হ্যামারের দিকেই শ্রমিক থেকে শুরু করে সবার কৌতুহলের দৃষ্টি।

মূল সেতু নির্মাণ করছে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড(এমবিইসি)। চুক্তি অনুযায়ী তারা ১২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকায় কাজ পেয়েছে।

এই এমবিইসিই জার্মান প্রযুক্তিতে তৈরি হ্যামারটি বাংলাদেশে নিয়ে আসে। এর পরে মংলা পোর্ট হয়ে গত সপ্তাহে পদ্মাসেতু প্রকল্পে এসে পৌঁছায় এটি।

এমবিইসি’র বিশাল আকৃতির ‘প্রুডেন্ট অপারেশনাল’ জাহাজে হ্যামারের খণ্ড খণ্ড হলুদ বর্ণের অংশগুলো রাখা হয়েছে। সব চেয়ে বড় অংশ হচ্ছে জেনারেটর ও পাওয়ার প্রেসার।

হ্যামারটি ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ১০টি অংশে বিভক্ত করা আছে। খণ্ড খণ্ড হলুদ অংশে ইংরেজি অক্ষরে লিখা ‘এমইএনসিকে’।

হ্যামারের যে ‍অংশ দিয়ে পানির নীচে প্রেসার দেওয়া হবে সেটিও বড় দুটি অংশে বিভক্ত। এর অগ্রভাগ দেখে মনে হবে যুদ্ধে ব্যবহৃত কোনো মিশাইল অথবা রকেট।

পেছনের দিকটি বিশাল আকৃতির কোনো কালভার্ট।

হ্যামারের সঙ্গে রয়েছে হাইড্রলিক তার, রশিসহ আরও গুরুত্ত্বপূর্ণ অংশ। বড় বড় অংশগুলো ক্রেনের সাহায্যে সেট করা হবে।

বাংলাদেশি শ্রমিক সৌরাভ হোসেন, কবির, সুমন ব্যাপারী, মো.নুরুজ্জামান, সুজন মিয়া, লিটনরা হ্যামারের খণ্ড খণ্ড অংশগুলো সেট করার জন্য কাজ করছেন। তাদের কারোরই যেন দম ফেলার ফুসরত নেই।

সৌরভ হোসেন শ্রমিকদের কাছে ফোরম্যান নামে পরিচিত। হ্যামার সেট করা শ্রমিকদের সর্দার তিনি। কবির হোসেন হ্যামারের হলুদ ‍অংশগুলো দেখিয়ে বলেন, এটা বিশ্বে সেরা হ্যামার, বসরা(চায়না প্রকৌশলী) আমাদের বলেছেন।

‘ক্রেনের সাহায্যে হ্যামারটা সেট করতেই ১০ থেকে ১২ দিন সময় লাগবে। এই কাজে আমার ১৫ জন শ্রমিক আছি,’ বলেন সৌরভ।

তিনি আরও বলেন, ‘হ্যামারের ওজন ২৫’শ টন নয় এর মাধ্যমে ২৫’শ টন পেশার দেয়া যাবে।’

বিশাল আকৃতির হ্যামার সেট করার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করছেন এমবিইসির অন্যতম প্রকৌশলী ফাও পি এবং জাং জিং পিং। ফাও পি বাংলাদেশি শ্রমিকদের কাছে ‘ফাই বস’ নামে পরিচিত।

নো ইংলিশ বলে কোনও মন্তব্য না করেই এগিয়ে গেলেন ফাও পি।

জাং জিং পিং ভাঙ্গা ভাঙ্গা কয়েকটি ইংরেজি বাক্যে হ্যামার সম্পর্কে কিছু তথ্য জানালেন। পিং বলেন, এটা বিশ্ব সেরা হ্যাম‍ার। পদ্মাসেতু নির্মাণের জন্য এটি বিশেষভাবে জার্মান প্রযুক্তির তৈরি। পুরো হ্যামারটি সেট করতে সময় লাগবে ১০ থেকে ১২ দিন সময় লাগবে। জুলাই মাস থেকে এই হ্যামারের ব্যবহার শুরু হবে।’

পদ্মাসেতুর সেতুর পাইলগুলো ১২০ মিটার বা ৪০ তলা ভবনের সমান কাঠামো পানির নিচে থাকবে। পাইলগুলো বসানো হবে এই হ্যামারের সাহায্যে। সেই জন্যই পদ্মাপাড়ে বিশেষ এই হ্যামারের প্রতি সৃষ্টি হয়েছে বিশেষ কৌতুহল।

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর

Comments are closed.