সুপারস্টার বাঁধন বৃত্তান্ত

২০০৬ সালে লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার প্রতিযোগিতার দ্বিতীয় রানার আপ হওয়ার মধ্য দিয়েই আজমেরি হক বাঁধনের মিডিয়া জীবনে পা রাখা। তার আগে ভবিষ্যতের একজন নামকরা ডেন্টিস্ট হওয়ার সব সিঁড়ি যখন বিনা বাঁধায় তরতর করে পার হয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই তার মনোজগতে ঘাঁটি গেড়ে বসল রাস্তার ধারে সাঁটানো একটি বড় বিলবোর্ড। “ দারুচিনি দ্বীপের নায়িকার খোঁজে” লেখা সে বিলবোর্ড টি বাঁধনের পড়াশোনায় ঘটিয়ে দিল এক ছন্দ পতন। লাক্সতারকার পরের গল্প সবাই জানেন…

তারকার দিনলিপি
শুটিং থাকলে ভোর ছয়টা থেকে সাতটার মধ্যেই ঘুম থেকে উঠতে হয় তাকে। অ্যালোভেরা, হলুদের রস, আর ফ্রেশ পানির সমন্বয়ে তৈরি তিন গ্লাসের একটি প্যাকেজ হয়ে থাকে তার দিনের প্রথম খাবার। এর পর ফ্রেশ হওয়ার জন্য কিছুটা সময় নিয়ে নাস্তার টেবিলে বসে পড়া। তারপর ছুট শুটিংয়ের উদ্দেশে। ফিরতে ফিরতে রাত। অবশ্য শুটিং না থাকলে দিনযাপনের নিয়মে কিছুটা ছেদ পড়ে। একটু আরাম করে ঘুমনো, ঘুম ভেঙ্গে গেলে একমাত্র মেয়ে সায়রার সাথে বিছানায় শুয়ে শুয়ে রাজ্যের গল্প করা… সারাদিন বাসায় কাজ সেরে বিকেলের দিকে সায়রাকে নিয়ে আশেপাশে কোথাও ঘুরতে যাওয়া… এভাবেই কেটে যায় বাঁধনের প্রতিটি দিন।

যে রাঁধে সে চুল ও বাঁধে
ঘর গোছানো অভিনেত্রী বাঁধনের প্রিয় কাজগুলোর মধ্যে একটি। বাসাজুড়ে তার ছাপ খুব স্পষ্ট। সাজানো গোছানো আর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন বাসার প্রতিটি কক্ষ। দেয়াল জুড়ে বাধানো অনেকগুলো ছবি সংস্কৃতিমনা বাঁধনের পরিচয় তুলে ধরে আছে যত্ন করে। নিজের খাবার দাবার তৈরির ভারটা মায়ের উপর ছেড়ে দিলেও বাঁধন নাকি খুব ভাল রান্না করতে পারেন। পায়েস, কাস্টার্ড, গরুর মাংস, মুরগির মাংস কিংবা যে কোন ধরনের মিস্টি জাতীয় রান্নায় পারদর্শিতার কথা শোনা গেল বাঁধনের কথা থেকেই। অবশ্য এতসব খাবারের মধ্যে বাঁধনের একমাত্র প্রিয় খাবার নাকি মিষ্টি, আর মিষ্টি জাতীয় যে কোনও কিছু। ভাত –আলুভর্তা -ডিম ভাজি-ডাল মাঝে মাঝেই খেতে পছন্দ করেন। আর পোলাও কোরমাতে খুজে পান এক অন্যরকম তৃপ্তি।

শাড়িতেই সুরুচি
লাইফস্টাইলের জিজ্ঞাসায় অনেকটা সহজ ভাবেই উত্তর দিয়ে গেলেন এ জনপ্রিয় অভিনেত্রী “ আমার সবচেয়ে পছন্দের পোশাক শাড়ি। সালোয়ার কামিজও পরা হয়, কিন্তু শাড়িতেই আমি খুব স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। কেনাকাটার ব্যাপারে তেমন কোন ব্র্যান্ড কিংবা আলাদা কোন জায়গা নেই। যখন যেখানে যা ভালো লাগে সেখান থেকেই কেনাকাটা করি। টাঙ্গাইলের শাড়ি আমার অনেক পছন্দের। সেটা কিনতে চলে যাই টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরে। আর আগে যেমন নিজের পছন্দের ব্যাপারটিকে খুব বেশি অগ্রাধিকার দিতাম, সেই জায়গায় এখন ভাগ বসিয়েছে সায়রা। এখন ওর সাথে ম্যাচিং করে জামা কাপড় কিনি। মাঝে মাঝে মা মেয়ে একই পোশাক পরি। পোশাক আশাকের ব্যাপারে আমার একমাত্র পছন্দ লাল রঙ। বলতে পারেন আমি লালের প্রতি আকৃষ্ট। এছাড়া কালো সাদা রঙ ও ভাল লাগে।

শখের পসরা
বাঁধনের শখের তালিকাটা অনেক দীর্ঘই। ছোটবেলায় যে শখগুলো ছিল স্ট্যাম্প সংগ্রহ কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার মত… বড় বেলায় এসে সে শখগুলো পরিবর্তিত হয়েছে ঘোরাঘুরি, কেনাকাটা, গান শোনায়। এত সব শখের মাঝেও বাঁধনের এখনকার সবচেয়ে প্রিয় শখ তার মেয়ের সঙ্গে খেলা করা!!!!

অবসরে একান্তে
অবসর সময়গুলোকে মুলত মেয়ে সায়রার সাথেই ভাগ করে নেয়া হয় তার। এরই সাথে চলে টিভি দেখা , গান শোনা কিংবা ঘোরাঘুরি। প্রিয় গানের জিজ্ঞাসায় বললেন রবীন্দ্রসঙ্গীত এর কথা। “ আমারও পরান যাহা চায়” রবীন্দ্রসঙ্গীতটি তার সবচেয়ে প্রিয় গানগুলোর মধ্যে একটি। নিজের নাটকের পাশাপাশি অন্যান্য শিল্পীর কাজগুলও দেখতে পছন্দ করেন। বাংলাদেশের কক্সবাজার, সিলেট, আর বাইরের দেশের কলকাতা তার প্রিয় জায়গাগুলোর মধ্যে কয়েকটি।

প্রিয় মুহূর্ত
জীবনের সেরা সময়টুকুর কথা বলতে গিয়ে বাঁধন এক বাক্যে বলে গেলেন মা হওয়ার সময়ের কথা, মেয়ে সায়রার মুখটি প্রথমবারের মত দেখার যে অনুভূতি, তা নাকি তার সারাজিবনের জন্যই সবচেয়ে সুন্দর আর প্রিয় অনুভূতি হয়ে থাকবে।

প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি
প্রাপ্তির খাতাটা তার অনেকটা ভারিই বলতে হবে। সেখানে আছে মেয়ে সায়রার কথা, নিজের একটি পরিপূর্ণ জীবনের কথা, মানুষের অসম্ভব ভালবাসার কথা।

সব সময়ের সঙ্গী
বাসার মধ্যে সবকিছুকে হাতের কাছে পেলেও বাসার বাইরে গেলে অনেক কিছুই প্রয়োজন থাকা সত্তেও নিয়ে যাওয়া যায়না। তারপরও বাসার বাইরে যেতে তার সবসময়ের সঙ্গী হয়ে থাকে মোবাইল ফোন, পার্স, নেইল কাটার, কলম, ছাতা আর সাজগোজের হালকা কিছু অনুষঙ্গ।

একই সুতোয়
বাক্তিগত জীবনে বাঁধন পুরোপুরি সাধারণ একজন মানুষ। স্বামী সনেট, একমাত্র মেয়ে সায়রাই পরিবারে তার প্রধান সঙ্গী।

ক্ষোভ
অসম্ভব রকমের সময়সচেতন আর সামাজিক প্রকৃতির এ অভিনেত্রী তার ব্যাক্তিগত কিছু হতাশার কথাও বলে গেলেন খোলামেলা ভাবে। মানুষের সময়জ্ঞান নিয়ে কিছুটা ক্ষুব্ধই দেখা গেল তাকে। নারীর একেবারেই কিছু ব্যাক্তিগত স্বাধীনতায় সমাজ কিংবা পরিবারের আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টি নিয়ে অনেকটাই হতাশা ঝরে পড়ল তার কণ্ঠে। ভালো-খারাপ প্রশ্নে নারী আর পুরুষের মধ্যে যে পার্থক্যগুলো সমাজে তৈরি করা হয়েছে সে বিষয়টিকে অনেকটা ন্যাক্কারজনক নিষ্ঠুরতা মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, “একটি মেয়ের মা হওয়ার ব্যাপারটিতেও কখও কখনও তার পরিবার কিংবা আপনজন মাথা ঘামাচ্ছে- এমন ব্যাপারটি দেখতে বা শুনতে একদম ই ভাল লাগেনা আমার। আমার কথা হলো খারাপ সব সময়ই খারাপ, তাতে ছেলে মেয়ের মধ্যে পার্থক্য থাকবে কেন। একটি মেয়েকে সবসময় কেন মেয়েই ভাবতে হবে, কেন মানুষ ভাবা হবেনা… আমি আসলেই হতাশ এসব বিষয় নিয়ে”।

বাংলা ট্রিবিউন

Comments are closed.