স্পিড বোট : আশঙ্কার ভেতরেও স্বপ্নের বসত ৩শ’ চালকের

মাওয়া-জাজিরার যে পয়েন্টে স্বপ্নের পদ্মাসেতু হচ্ছে সেখানটায় নদী পারাপারের সবচেয়ে দ্রুত গতির যান এখন স্পিডবোট। শ’ তিনেক স্পিড বোডে হাজার হাজার যাত্রী পারাপার হয় প্রতিদিন। আর এই তিনশ’ বোট ঘিরে আবর্তিত হয় হাজারো মালিক-শ্রমিকের জীবিকা। যাদের মুখের খাবার, পড়ার খরচ জোটে এই স্পিডবোট থেকে।

প্রশ্ন উঠেছে পদ্মাসেতু তৈরি হয়ে গেলে কি হবে এই মানুষগুলোর? দুঃশ্চিতাতো রয়েছেই। কিন্তু সে তো একান্তই নিজেদের সমস্যা। পদ্মাসেতু হলে তাকে স্বাগত জানাতেই প্রস্তুত পদ্মার স্পিডবোট চালকরা। তাদের মতে, একটা ব্যবস্থা হয়েই যাবে। কিন্তু পদ্মাসেতু হলে কোটি মানুষের স্বপ্ন পূরণ হবে। সেটাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

এমনই একজন স্পিডবোট চালক মো. ফয়েজ শেখ (৩৩) মাওয়ার দক্ষিণ মেদিনী মণ্ডল পাড়ার চুন্নু শেখের ছেলে। আট বছর ধরে মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌ-পথে স্পিড বোট চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। তার আয়ের ওপর ভর করেই মা-বাবা, স্ত্রী, দুই সন্তানসহ ৬ সদস্যের মুখে আহার উঠে। মাওয়া-জাজিরা নৌপথে পদ্মাসেতুর নিমার্ণ কাজ শুরু হওয়ায় বেশ উৎফুল্ল ফয়েজ শেখ। তবে সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হলে তার নিজের পেশা যে বন্ধ হয়ে যাবে সে নিয়েও দুশ্চিন্তা আছে তার।

শুক্রবার (২২মে) সকাল সাড়ে দশটায় শিমুলিয়ায় স্পিড বোটের ঘাটে কথা হয় চালক ফয়েজ শেখের সঙ্গে। বুঝতেই পারছেন, পদ্মাসেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের পর গুরুত্ব হারাবে স্পিড বোট। এমনকি স্পিড বোটের যে ঘাট সেখানেও নির্মিত হবে পদ্মাসেতু সংশ্লিষ্ট অন্য স্থাপনা।

এরপর কি পেশা বেছে নেবেন? এমন প্রশ্ন করলে কিছুটা হতাশাই ঝরলো ফয়েজের চেহারায়।

তবে একটা কিছু ব্যবস্থা হয়ে যাবে এমন ভরসাও রয়েছে এই যুবকের। বিকল্প ভাবনাও ভাবতে শুরু করেছেন।

বললেন, তখন যারা নদীতে ঘুইরা ঘুইরা পদ্মাসেতু দেখতে চাইবো তাদের নিয়া যাবো।

আরেক স্পিডবোট চালক আল আমিন (৩০)। তিনি ও তার বাবার আয়ে চলে সংসার। পরিবারের মোট সদস্য ৯ জন। স্পিডবোটে যখন যাত্রী পারাপার হবে না, তখন কি করবেন- জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করেননি আল আমিন। কেবল বললেন, আল্লাহ একটা কিছু ব্যবস্থা করবেন।

মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌপথে যাত্রী পারাপার করে প্রায় ৩শ’ স্পিডবোট। চালক ছাড়াও অর্ধশত মালিকের এসব স্পিডবোটের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন শতাধিক ম্যানেজার। সব মিলিয়ে অন্তত এক হাজার পরিবারের গড়ে পাঁচ হাজার সদস্য আছে। এদের সবারই আহার জোটে স্পিডবোটে যাত্রী পারাপার করে আয় করা অর্থে।

মেসার্স মাতবর এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার শামীম হোসেন। তার মালিকের এই নৌপথে চলাচলকারী ১৮টি বোট দেখাশুনা করেন তিনি। প্রতিদিন বেতন পান চারশ’ টাকা। এ দিয়েই চলে মা-বাবা, ছোট দুই ভাই-বোনের সংসার। পড়ালেখার খরচও চলে তার আয় থেকেই।

তার মতেও বোটগুলো পরে পর্যটনের কাজে লাগতে পারে। পদ্মাসেতু দেখতে অনেক সুন্দর হবে। যারা দেখতে চাইবে তাদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাতে পারবে এসব স্পিড বোট, এমনটাই মনে করছেন শামীম।

তিনি বলেন, অনেক স্থানেই এমন স্পিড বোটের প্রচলন আছে। পদ্মাসেতু হয়ে গেলে সেতু অঞ্চলটি হয়ে উঠবে দেখার মতো। যাত্রী পারাপার না করে তখন দর্শনার্থীদের নিয়ে ঘোরাঘুরি করার আনন্দ পাওয়া যাবে।

তবে এর পরেও স্পিডবোট সংশ্লিষ্টদের দাবি, কিছু ক্ষতিপূরণ কিংবা পুনর্বাসনের। তাদের মতে, স্বপ্নের পদ্মাসেতু নির্মাণ কাজ চলছে। সেতু এলাকার মানুষের জমি অধিগ্রহণ করার সময় দেওয়া হয়েছে নগদ টাকা। পুনর্বাসনের জন্য করা হয়েছে আবাসনের ব্যবস্থা। কিন্তু পদ্মাসেতু চালু হলে মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌপথে চলাচলকারী স্পিড বোট চালকরা বেকার হয়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় তাদেরও পুনর্বাসন বা বিকল্প কর্মসংস্থানের প্রয়োজন হবে। সরকারের কাছে সে প্রত্যাশাও রয়েছে স্পিড বোট চালকদের।

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর

Comments are closed.