পদ্মা সেতু নির্মাণে দিনরাত তিন হাজার শ্রমিকের কর্মযজ্ঞ

উচ্ছ্বাসের জোয়ার পদ্মাতীরে
দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে বহু প্রত্যাশিত পদ্মা সেতুর কাজ। রাত-দিন পরিশ্রম করছেন তিন হাজার দেশি-বিদেশি শ্রমিক। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ করতে চলছে মহা-কর্মযজ্ঞ। পদ্মা তীরে এখন আনন্দ উচ্ছ্বাসের জোয়ার। প্রখর রোদ ও নদীপাড়ের তপ্তবালুর দাহ উপেক্ষা করে কাজ করে চলেছেন শ্রমিকরা। বালুর ওপর বড় ছাতা পেতে কাজ পর্যবেক্ষণ করছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। সেতুর টেস্ট পাইলিংয়ের প্রথমটির (পরীক্ষামূলক পাইলিং) কাজ প্রায় শেষের পথে। ২৬ মে এই টেস্ট পাইলিংয়ের লোড টেস্ট তথা ভর পরীক্ষা করার কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে ২৬টি টেস্ট পাইলিং করা হবে। এর মধ্যে ১০টি হচ্ছে স্টিল পাইলিং এবং ১৬টি বোর্ড পাইলিং। অন্যদিকে প্রায় আড়াই হাজার টনের জার্মানি হ্যামার মংলা থেকে মাওয়া রওনা দিয়েছে। চলতি সপ্তাহে পৌঁছার কথা রয়েছে। জানা গেছে, আগামী অক্টোবরেই সেতুর মূল পাইলিংয়ের কাজ শুরু হবে। আর খুঁটির ওপর সেতুর স্প্যান বসানো শুরু হবে আগামী বছর মে মাসে। ২০১৮ সালে সেতুটি চালু করতে পদ্মাপাড়ে চলছে এই কর্মযজ্ঞ। তবে কাজ যত এগিয়ে যাচ্ছে পদ্মাপাড়ের মানুষের মধ্যে তীব্র হচ্ছে উৎসবের আমেজ।

এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘যে যাই বলুক ২০১৮ সালের মধ্যে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হবে। অনেক কাজ এগিয়েছে। আশা করছি সময় মতো সব শেষ হবে।’ তিনি বলেন, অক্টোবরে সেতুর মূল পাইলিংয়ের কাজ শুরু হবে। এ কাজ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্র“তি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ হচ্ছে। কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।

পুরনো মাওয়া ঘাট এলাকায় চলছে টেস্ট পাইলিংয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রস্তুতি।

মন্ত্রী জানান, মাওয়ায় পদ্মা সেতুর কাজ দেখতে তিনি সেখানে গেছেন ১১৭ বার। অন্য পাড়ে গেছেন ৬৩ বার। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পদ্মা সেতু শুধু যোগাযোগেই নয়, জাতীয় ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতিতে তাৎপর্যময় অবদান রাখবে। সেতুটি নির্মিত হলে দেশের জিডিপি ১ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। ওই অঞ্চলের মানুষের আয় ১ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়বে। আর ৭ লাখ ৪৩ হাজার মানুষের নতুন কর্মসংস্থান হবে।

কাজের বিষয়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, সেতুর টেস্ট পাইলিংয়ের প্রথমটির কাজ প্রায় শেষের পথে। ২৬ মে এই টেস্ট পাইলিংয়ের লোড টেস্ট তথা ভার পরীক্ষা করার কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে ২৬টি টেস্ট পাইলিং করা হবে। এর মধ্যে ১০টি হচ্ছে স্টিল পাইলিং এবং ১৬টি বোর্ড পাইলিং।

প্রকল্প কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পদ্মা সেতুর মূল কাজের মধ্যে রয়েছে- মূল সেতু, নদীশাসন, দুটি সংযোগ সড়ক ও অবকাঠামো (সার্ভিস এলাকা) নির্মাণ। এর বাইরে আছে জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন। এর মধ্যে সংযোগ সড়কের কাজ হয়েছে প্রায় ৪০ ভাগ, নদীশাসন ৫ ভাগ, মূল সেতুর কাজ অনেকটাই এগিয়েছে। আর ভূমি অধিগ্রহণ ৯৫ ভাগ ও পুনর্বাসনের ৫০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে।গতকাল সরেজমিন পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে কর্মযজ্ঞের দৃশ্য। মাওয়া ও জাজিরার মধ্যেই হবে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু। দ্বিতলবিশিষ্ট এই সেতুর ওপর দিয়ে চলবে যানবাহন, নিচ দিয়ে যাবে ট্রেন। মাওয়া চৌরাস্তা বরাবর দিয়ে সেতুটি হবে। এ জন্য সেখান থেকে ফেরিঘাট সরিয়ে আড়াই কিলোমিটার দূরে শিমুলিয়ায় নেওয়া হয়েছে। আগের ফেরিঘাটের দুটি স্থানে ৫০০ ও ২৫০ টন ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি এবং ৫০ টনের কয়েকটি ক্রেন ভাসমান বার্জে বসিয়ে পরীক্ষামূলক পাইলিংয়ের কাজ চলছে। মাওয়ার কুমারভোগে নদীর পারে বিশাল নির্মাণ মাঠে মূল সেতুর মালামাল রাখা হয়েছে।

এদিকে ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন কাজও এগিয়ে যাচ্ছে। প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণ কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৯৫ ভাগ। মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর জেলায় যথাযথভাবে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। তিনটি জেলায় মোট প্রস্তাবিত ১ হাজার ৪২২ দশমিক ৭৫ হেক্টর ভূমির মধ্যে বেশির ভাগ অধিগ্রহণ হয়েছে। বাকি ভূমি দখল বুঝে নেওয়ার কাজ চলছে। ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য মোট ২ হাজার ৫৯২টি প্লটের মধ্যে ১ হাজার ২৭০টি প্লট হস্তান্তর করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬০টি প্লট ভূমিহীন ক্ষতিগ্রস্তদের। বাকি কাজ খুব দ্রুত সময়ে হবে বলে জানান সেতু বিভাগ। সেতুর উভয় পাশে চারটি পুনর্বাসন কেন্দ্র পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে।প্রকল্প কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিনটি ড্রেজার, একটি বহুমুখী কাজের জাহাজ, একটি টাগবোট, তিনটি অ্যাংকর বোট, ২৫টি কনটেইনার ও প্রায় ৫০০ ড্রেজিং পাইপ প্রকল্প এলাকায় বসানো হয়েছে। নদীর দুই তীরে প্রায় ১৪ কিলোমিটারজুড়ে নদীশাসন করা হবে। এ ছাড়া মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে ১৪ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ কাজের অগ্রগতি ৪২ শতাংশ। অবকাঠামো নির্মাণ এগিয়েছে ৩৩ শতাংশ।

Comments are closed.