কমেডিয়ানে কোনো ভাগ নেই, কমেডিয়ানকে সবারই ভালো লাগে

একসময় কমেডিয়ান বললেই চলে আসত তাঁর নাম। সমানতালে অভিনয় করেছেন সিনেমায়, টেলিভিশনে। পেয়েছেন তুমুল জনপ্রিয়তা। ছেলেবেলা, অভিনয়জীবন নিয়ে ওমর শাহেদের সঙ্গে কথায় মেতে উঠলেন টেলি সামাদ।

আপনার জন্ম কোথায়? ছেলেবেলায় সিনেমার প্রতি নেশা কেমন ছিল?
আমার জন্ম মুন্সীগঞ্জে। গ্রামের নাম নয়াগাঁও পূর্বপাড়া। এতটুকু থাকতেই অভিনয়, গান, ছবি আঁকার প্রতি নেশা। প্রচুর সিনেমা দেখতাম। একটা ছবি যদি একবার ভালো লাগে, তাহলে সেটি সাত দিন থাকলে প্রতিদিন তিনটা শো দেখতাম। হলে বসে টিকিট আনতাম-‘এই টিকিট দাও।’ ম্যানেজার বলত, ‘এই তুই! একটু আগে দেখলি। আবার?’ ‘তাতে তোমার কী?’ শরীরে তেলটেল মেখে মানুষের ওপর দিয়ে ডিঙিয়ে ভেতরে ঢুকে টিকিট নিয়ে চলে আসতাম। ওই সময় স্কুলে পড়তাম। বাবা সকালবেলা হলের সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেন-‘সামাদকে দেখছ?’ বলত-‘দাদা! সামাদ বোধ হয় হলের ভেতর সিনেমা দেখতাছে।’ একদিন বের হওয়ার পর হঠাৎ বাবা আমার কানে ধরেছেন। বললাম-‘কোন শালায় রে?’ চোখ তো বন্ধ ছিল আমার। এরপর দিয়েছে এক থাপ্পড়। তাকিয়ে দেখি বাবা। সঙ্গে সঙ্গে দৌড়!

লেখাপড়া করতেন?
লেখাপড়া কিছু করতাম না। মুন্সীগঞ্জের নামকরা হাই স্কুলে পড়তাম। প্রতিদিন থার্ড পিরিয়ডের পর অ্যাপ্লিকেশন লিখে স্যারের কাছে দিয়ে আসতাম। অ্যাপ্লিকেশনটা হলো-‘মাননীয় প্রধান শিক্ষক মহোদয়, আমার মা খুব অসুস্থ।’ তাই তৃতীয় পিরিয়ডের পর আমাকে ছুটি দিয়ে স্যার বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন। এক সপ্তাহে তিনবার ছুটি দিয়েছেন। একদিন বলেন, ‘তোর মায়ের খালি অসুখই হয়; ঘটনা কী রে সামাদ?’ ‘মায়ের অসুখ হয়। তো আমি কী করব?’ এমন সময় হাই স্কুলে বাবা ঢুকেছেন। হেডমাস্টারকে ‘তুমি’ করে বলতেন। ‘কাকা আসেন, বসেন।’ ‘ওর কী এখানে?’ ‘সে অনেক কাহিনী। ওসব রাখেন। চাচি কেমন আছে?’ ‘তোমার চাচি ভালো আছে।’ ‘চাচির সারা মাস ভইরা কী অসুখ?’ ‘না না, কে বলছে?’ ‘এই দ্যাহেন অ্যাপ্লিকেশন লেখছে। আমি প্রতি সপ্তাহে দুইবার কইরা কাকিরে দেখবার লাইগা ছুটি দেই।’ ‘কাকিরে দেখবার লাইগা ছুটি দাও, মানে? বেতটা কই তোমার?’ বেত নিয়ে আমাকে যে বাড়ি! হেডমাস্টার উল্টো তার পা ধরেছে, ‘থাক কাকা! মাইরেন না, মাইরেন না।’

আর্ট কলেজে লেখাপড়া করেছেন।
যখন ঢাকা এলাম, বাবার ইচ্ছা হলো, পিএইচডি করাবেন, উচ্চ ডিগ্রি নেওয়াবেন, চাকরি করতে দেবেন না। বললাম, ‘আর্ট কলেজে ভর্তি হব।’ বাবা বললেন, ‘সাবধান! এসব কথা মুখেও আনবি না।’ অনেকক্ষণ পর বড় ভাই বলল, ‘বাবা! ও যখন আর্ট কলেজে ভর্তি হতে চায়, ঠিক আছে ওকে আর্ট কলেজেই ভর্তি করিয়ে দেন। ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করলে আর পড়াশোনা হবে না।’ বাবা মনে খুব কষ্ট পেলেন, ‘আমি আজকে প্রতিজ্ঞা করলাম, তোকে একটা পয়সাও দেব না।’ পায়ে ধরে সালাম করলাম, ‘বাবা! আপনাকে একটা পয়সাও দিতে হবে না। আমাকে শুধু একটু দোয়া করবেন।’ শুরু হলো আর্ট কলেজের জীবন। কষ্ট, কষ্ট আর কষ্ট। হোস্টেলে থাকি। নাশতা খাই না। ভাত খাই না। রাতে হোস্টেলে একটুখানি খাই। তাও দুজনে মিলে। হেঁটে হেঁটে কলেজে আসি। টিফিনের সময় শরিফ মিয়ার ক্যান্টিনে সবাই বিরিয়ানি আর মাংস খেতে বসত। যেতাম না। শাহবাগ হোটেলের পাশে লিচুগাছ ছিল। একজন ঘোড়াওয়ালাকে দেখলাম। তার কাছে রুটি আর ডাল। ওখান থেকে খেতাম-‘একখানা রুটি আওর থোড়াসা ডাল দি জে না?’ হাত পেতে তার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। সমরজিৎ রায় চৌধুরী স্যার ছিলেন আমার ভাই আবদুল হাইয়ের বন্ধু, হাউস টিচার। বললেন, ‘সামাদকে ডাকো তো!’ পিয়ন এসে বলল, ‘স্যার আপনাকে ডাকে।’ ওপরে গিয়ে আদাব দিলাম। বললেন, ‘বসো। আচ্ছা সামাদ! প্রতিদিনই তুমি বলো, আজকে বিলটা লেখবেন না। বিল না লেখলে তো আমার টাকা ওঠে না। সত্যি কথা বলো তো, তুমি কী খাও, নাকি না খেয়ে থাকো? কেঁদে ফেললাম, ‘স্যার! আমার কাছে কোনো পয়সা নেই। আপনি লিখলে তো টাকা দিতে হইবো, তাই বন্ধুর কাছে একটুখানি খাইছি।’ স্যার আফসোস করে বলেন, ‘তোমার ভাই আবদুল হাই কী শানশওকতে চলেছে। তার টাকা-পয়সার অভাব ছিল না।’ ‘বাবার কাছ থেকে নেই না। আমি আর্ট কলেজে পড়ব বইলা আমাকে সে দেবে না বলেছে।’

সেই ছেলেটি কিভাবে সিনেমায় এলো?
একজন স্টিল ফটোগ্রাফার আমাকে খুব আদর করত। একদিন উনি আমাকে নিয়ে গেলেন পাকিস্তানি পরিচালক নজরুল ইসলামের মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের বাসায়। নজরুল ইসলাম বললেন, ‘তুম আর্ট কলেজ মে পড়তা হায়। বহুত আচ্ছা লাড়কা হায়! তুম হামকো এক পিকচার বানা দো।’ মানে ছবি এঁকে দাও, তাঁর পেয়ারির জন্য। সুন্দর করে এঁকে দিলাম। বললেন, ‘বহুত আচ্ছা হোয়া। বেটা! তুম কাম করো গে?’ আমি তো কাজ করার জন্যই বসে আছি, কে আমাকে সিনেমায় ডাকবে! বললাম-‘মেঁ কাহা কাম করোঙ্গা ভাইয়া?’ ‘সিনেমা মে।’ ‘শিওর।’ ‘ঠিক হায়। তুম পরশু নারায়ণগঞ্জ মে চলে আঁও।’ নারায়ণগঞ্জে চলে যাই। তার অ্যাসিসট্যান্ট ছিল খসরু নোমান। ১৫ দিন হয়ে যায়, কিন্তু সে ডিরেক্টরের সঙ্গে দেখা করতে দেয় না। এদিকে আর্ট কলেজও খোলা। মাত্র ভর্তি হয়েছি। পরে সে চিনতে পেরে বলল, ‘আরে সামাদ! তুমি কবে আইছ?’ ‘আমি তো সেই কবেই আইছি। আপনি তো আমারে নজরুল সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে দিচ্ছেন না।’ এমন সময় নজরুল ভাই বেরিয়েছেন, ‘সামাদ! বেটা তুম কব আয়া?’ ‘চৌদ্দ, পনেরো দিন হোয়া।’ ‘চৌদা-পনরো দিন হো গায়া? অ্যাসিসট্যান্ট ডিরেক্টর হামকো নেহি বোলা?’ এ শোনো খসরু, ‘কিয়া বাত হায়! ও কব আয়া হায়?’ বেচারা লজ্জায় পড়ে যায়। নজরুল সাহেব বললেন, ‘স্টুডিও মে আজ শুটিং নেহি হোঙ্গা! সব আর্টিস্ট কো পেকআপ। সামাদ কা আজ শুটিং হোগা। ও স্টুডেন্ট হায়। রেডি হো যাও তুম বেটা!’ রেডিটেডি হয়ে নারায়ণগঞ্জের রেলস্টেশনে গেলাম। শট হলো, নায়িকা বিয়ের রাতে পালিয়েছে। দৌড়াতে দৌড়াতে সে স্টেশনের গেট দিয়ে ঢোকে। অনেক লোক জড়ো হয়ে গেছে। আমি তো জানি না। জিজ্ঞেস করছি, ‘কোথায় যাও? কোথায় যাও?’ লোকেরা বলছে, ‘এই সরো, সরো।’ আবারও বলছি, ‘কোথায় যাও?’ ‘বউ হারিয়ে গেছে। বউ হারিয়ে গেছে।’ আমি বললাম, ‘কার বউ?’ এর পরেই ছবি শুরু হলো। এই ছিল পাট। উনি অত্যন্ত খুশি হলেন, ‘এতনা আচ্ছা কিয়া হায় তুম নে!’ ‘কার বউ?’ ছিল প্রথম অভিনীত ছবি। সিঙ্টি টু-থ্রির ঘটনা। সেই থেকে প্রায় ছয়-সাত শ ছবিতে অভিনয় করেছি।

তারপর?
প্রথম ব্রেক ‘পায়ে চলার পথ’, পরে খান আতাউর রহমানের ‘সুজন সখী’। এই ছবির গান ‘ডাইলে চাউলে উতরাইলি গো সই। সেই উতরানি মোরে উতরাইলি, শ্যাম পিরিতি আমার অন্তরে’ ইন্ডিয়াতেও গেয়েছি। শুটিংও করেছি। সুপার হিট। এ ছবি আমাকে হিট করা শুরু করল। পরে এলো কাজী জহিরের ‘অবাক পৃথিবী’। শুরুতে কেউ পয়সা দিত না। ডিরেক্টরের কাছে চাইতাম। একবার একজন বলল, ‘এদিকে আসো খোকা! ধরো। এই ছবির জন্য তোমাকে অনেক টাকা দিলাম। ধরো তিন শ টাকা।’ নিলাম। একজনে বলল, ‘এই মিয়া? কত দিছে?’ ‘তিন শ।’ ‘মাত্র তিন শ?’ ‘আপনি আফসোস করেন গিয়া। আমি করব না।’ কারণ আমি জানি, এরাই একদিন টাকার গাট্টি নিয়ে পেছন পেছন ঘুরবে। সেদিন বলব, সময় নাই। তা-ই হয়েছে। তারা পেছন পেছন ঘুরছে, ওই ছবিতে, এই ছবিতে অভিনয় করতে হবে। আমার টাইম নেই, শিডিউল নেই।

এই যে অনেক ছবি করলেন, এর ভেতর কোনোটার কথা আলাদা করে বলবেন?
রাজ্জাক আর আমি অবাক পৃথিবীতে অভিনয় করেছি। রাজ্জাক জেলে। গাছ বেয়ে জেলখানায় ঢুকে ওই গাছ দিয়ে আবার তাকে ছুটিয়ে নিয়ে দৌড় দিই। পুলিশ, জেলের অন্যরা বলছে-‘এই চোর গেল, ডাকাত গেল।’ দৌড়াতে দৌড়াতে দেখি পাহাড়ি এলাকা, কঙ্বাজার। শটটা হলো, সকালবেলা, চারদিকে পাহাড়। হয়রান হয়ে গেছি। আমি বলি, ‘টায়ার্ড হয়ে গেছি। সে বলে-‘হ।’ এমন সময় সামনে চার-পাঁচটা বল্লম পড়েছে। ভয় পেয়ে গেছি। পেছন দিকে তাকিয়ে দেখি, সাত-আটটা মেয়ে। ‘ব্যাপার কী!’ তীর দিয়ে খোঁচাচ্ছে, আটকে দিয়েছে। ডায়ালগ লেখা ছিল, ‘ডর করে, ভয় লাগে।’ ওসব না বলে বলি, ‘পাহাড়ি বইনা গো।’ এটা কিন্তু পরে ডায়ালগ হয়ে গিয়েছিল। ভেতর থেকে এসে পড়েছিল, ‘আহা রে বইনা রে গো, পাহাড়ি বুইনেরা। তীর ছাইড়া শরীর দিয়া পেছন থেকে গুঁতা দিলে হয় না!’ সঙ্গে সঙ্গে মনে মনে বলি, ‘হায় হায় কী কইলাম!’ কাজী ভাই বলেন, ‘এই এই, তুই কী কইলি? কী ডায়ালগ কইলি?’ ‘আর কবো না, আর কবো না। স্যরি।’ ‘না, তুই আবার ক, কী কইলি! এই ডায়ালগই কবি।’ এটা ছিল সাংঘাতিক একটা ডায়ালগ। এরপর আমজাদ ভাইয়ের ওই ছবিটার কথা। আরে নামটা কী যেন দূর! বিখ্যাত যে ছবিটা…! আমার, ববিতা, ফারুক, এ টি এম শামসুজ্জামানের ছবি। গ্রামের ছবি। ও, মনে পড়েছে, ‘নয়নমণি’। ঢোলক বাজাই। ফারুক যাত্রায় গান গায়। এ টি এম এসে ধমক দিল, ‘তোরা গান গাস না? গান গাস? যে গান শরিয়তে নিষেধ, সেই গান গাস?’ আমার চুল ধরে বলে, ‘এই, তুই গান-বাজনা করোস, আবার ঢোলক বাজাস।’ দেয় এক থাপ্পড়। বলে, ‘কালকে সকালবেলা তুই এই গ্রাম ছাইড়া চইলা যাবি। নয় তরে মাইরা ফালামু।’ বললাম, ‘জ্যাডা, অসুইখ্যা মানুষ। দূষিত রক্ত। রাইত অইলে কালাজ্বর আসে। আপনি আমারে মারবেন ক্যা? আমারে ছাইড়া দ্যান।’ সকালে গাধার মতো একটা ঘোড়া ছিল, সেই ঘোড়ায় চড়ে মালপত্র সব আর দু-তিনটা গরু বেঁধে নিয়ে যাচ্ছি, ‘দেশবাসীরা! আমি চইলা যাইতেছি গা!’ বলে চিৎকার করতে করতে চলে গেলাম। আরেকটা ছবি আছে, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’। আমি বাড়ির চাকর। গরুকে ঘাস খাওয়াই। গান গাচ্ছি, ‘আমার মনপাখি চইলা গেল রে…। তোরে আর তো পাইলাম না।’ না বলে হাঁ করে আছি। ঠিক সে সময় এ টি এম এসে পড়ে, ‘কী রে! গরুয়ে ঘাস খায় না?’ আমি তো তখনো হাঁ। ঘাসটাস নিয়ে আমার মুখের ভেতর দিয়ে বলে, ‘তুই খাইয়া দ্যাখ তো, ক্যান খায় না?’ চিন্তা করতে পারছেন? অভিনয় না দেখলে বোঝা যাবে না। একজন থেকে আরেকজন কম না। যাওয়ার পর ওনাকে গালি দিই। থাকতে গালি দিই না-‘শালা, হারামজাদার বাচ্চা বুইড়া! শালা, বুইড়া খাটাশ! শালা, গরুর ঘাসগুলা সব আমার মুখের ভেতর দিল। শালা, একদিন তোমারে আমি ঘরের থেইকা বাইর কইরাই ছাড়মু। উঁ উঁ।’ কাঁদছি এ রকম করে। এভাবে করতে করতে তিনটা ছবিতে হিরো হলাম, ‘মনাপাগলা’, ‘দিলদার আলী’, ‘ডাইনিবুড়ি’।

নায়ক হলেন?
আমার কাছে কাজী হায়াৎ এলো। পনেরো দিন পেছন পেছন ঘুরল, ‘আমার ছবিতে আপনি নায়ক।’ ‘আমি করব না।’ যদি আমি নায়ক ফিল করি, তাহলে তো আমার সর্বনাশ না? অনেকে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি হিরো হইলা না কেন?’ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখেছি। চেহারাটা তেমন খারাপ না। তার পরও বেছে নিলাম, আমি কমেডিয়ান হব। কমেডিয়ানে কোনো ভাগ নেই। আপনার কাছে রাজ্জাককে ভালো লাগে, আরেকজনের কাছে ববিতাকে ভালো লাগে। কিন্তু কমেডিয়ানকে সবারই ভালো লাগে। সে জন্য এ পথ বেছে নিয়েছি। আমি টেলি সামাদ, কমেডিয়ান হয়ে তো খারাপ করিনি। খারাপ করেছি বলুন? এখন সবাই আমাকে সাংঘাতিক ভালোবাসে। যেটা বলছিলাম, কাজী হায়াৎ আমাকে তার ছবি করার কথা বলল। খুব করে বলল। এরপর এলো টাকার কথায়, ‘আপনাকে এত এত টাকা দেব।’ শুরু করলাম ‘দিলদার আলী’। সুপার হিট হলো। আমার লেখা ও গাওয়া গান, ‘দিলদার আলী আমার নাম। খেল দেখানোই আমার কাম। রাস্তায় রাস্তায় ঘুইরা মরি কেউ দিল না দাম। আমার কেউ দিল না দাম। হায় রে কেউ দিল না দাম।’ অনেক জায়গায় গান করেছি। বাংলাদেশ, নেপাল, সিঙ্গাপুর, লন্ডন, আমেরিকা, মিডলইস্টের সব দেশ; কোনো দেশ বাকি নেই, যেখানে স্টেজে গান করিনি। আমেরিকায় গেলেই দিলদার আলী গাও, চিল্লাচিল্লি। গানের একটা ক্যাসেটও বের করেছিলাম, ‘পাঙ্কটেলি’ নামে। পাঙ্কু সেজে, চুলটুল কালার করে, গিটার-টিটার হাতে।

প্রডিউসার হলেন কিভাবে?
এরপর শখ জাগল, প্রডিউসার হই। ছবির নাম ‘মনাপাগলা’। নতুন এলো আঁখি। সে আর আমি অভিনয় করি। গান লিখলাম। সুর করলাম। কণ্ঠ আমার এবং সাবিনা ইয়াসমীনের। দুজনে সাতটা গান গাইলাম। সুপার হিট। নায়িকা সাঁকোতে ওঠে, আমি বসে বসে বিশ্রাম নিচ্ছি। একজন বলল, ‘কোন শালায় রে জিরাইতেছে! মাছ ধরতে যাস না?’ রাগ করে বললাম, ‘যাঃ শালা! মাছ ধরব না।’ এই বলে সাঁকোতে উঠলাম। তখন নায়িকাকে দেখি। ‘ওই, ওই ধাক্কা দেব।’ গাইলাম, ‘পাখি খ্যাপাইস না খ্যাপাইস না পাগলারে খ্যাপাইস না।’ সুপার সুপার হিট। আরেকটা গান গেয়েছিলাম-‘মনাপাগল, মনাপাগল সবাই বলে, দুঃখ নাই আমার। এই দুনিয়ার রাজা আমি হও হুঁশিয়ার। হুঁশিয়ার…।’

ইন্ডিয়ার ছবিগুলোতে রেসপন্স কেমন ছিল?
ওদের দেশে একটা স্টাইল আছে, দাঁড়ি-কমাসহ ডায়ালগ মুখস্থ বলতে হবে। বললাম, ‘দাদা! এটা কি পুরোটাই এভাবে বলব না আমার মতো করে আমি বলব?’ ‘না, না। আপনার মতো না। এখানে যা আছে, সেভাবেই বলতে হবে।’ আমিও শয়তান কম না। ক্যামেরাম্যান ছিল আমাদের অরুণদা। মুখটা ভেংচি কেটে বলল, ‘এই বেটা ছাগল! বুঝলি না রে, টেলি সামাদ কী করত।’ ওনার ডায়ালগই বললাম। একজনও হাসল না। তখন অরুণদা বলল, ‘দাদা! একটা কথা বলি, ফিতা না হয় নষ্ট হবে। ওকে ওর মতো করে একটা ডায়ালগ বলতে দেন না।’ ‘আচ্ছা দেন!’ আমার মতো সাজালাম ডায়ালগটাকে। দিলাম। মিয়া ভাই, মানুষ হাসতে হাসতে একটা আরেকটার ওপর পড়ে গড়াগড়ি করছে। ডিরেক্টর বলে, ‘দাদা! আর আমার ডায়ালগ নয়, এখন থেকে আপনি আপনার মতো করে সাজিয়ে ডায়ালগ বলবেন।’

টেলিভিশনের জীবনটা একটু বলুন। টেলিভিশনেই আপনাকে ‘টেলি’ উপাধি দেওয়া হয়?
প্রথমে ‘কার বউ?’ তারপর দুটি সিনেমা। এর পরই টেলিভিশনে। ওয়ান ফাইন মর্নিংয়ে টেলিভিশনের জিএম সাব ডাকলেন, ‘তুমি টেলিভিশনে এসো।’ যাওয়ার পর বললেন, ‘বসো।’ ওই যে মাহমুদ সাহেব আছেন না, ক্যামেরাম্যান মাহমুদ সাহেব, এটিএনে বসেন এখন। এই মাহমুদ সাহেব ‘পায়ে চলার পথ’ ছবি করেছিলেন। উনি বললেন, ‘সামাদ! তোমার নাম তো আবদুস সামাদ। তুমিই পেতে পার টেলিভিশনের একটা টাইটেল, আর কেউ না। কারণ তোমার এত নাম হয়ে গেছে!’ বললাম, ‘কী স্যার, কী দেবেন?’ ‘আজ থেকে তোমার নাম থেকে আবদুস কেটে ‘টেলি’ লাগিয়ে দিলাম। তুমি টেলি সামাদ হবে।’ ‘টেলি সামাদ? টেলি সামাদ হলে তো মানুষ আমাকে টিটকারি করবে।’ ‘না না, তোমার এই নামটা সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে যাবে। তোমাকে বাংলাদেশের সবাই চিনবে।’ ওনার ‘পায়ে চলার পথ’ ছবিতে একটা চরিত্র করলাম ‘টেলি সামাদ’ হিসেবে। টেলিভিশনে আবদুল্লাহ ইউসুফ ইমাম, খুব রাগী এবং ভালো ডিরেক্টর। আমি খুব টিংটিঙে। এখনো। অভিনয় করতে করতে একটা শট দুবার দেখিয়েছেন। তিনবারের সময় একটা থাপ্পড় দিয়ে ফেলে দিয়েছেন। অনেক সিনিয়র শিল্পীর মনে লেগেছে, ‘ছেলেটা নতুন, থাপ্পড় দিল?’ বললাম, ‘না। কিছু মনে করি নাই।’ চোখে ছলছল পানি, পরেরবার শটটা দিলাম। আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘সামাদ! কিছু মনে করো না ভাই। তোমারে থাপ্পড় দিছি।’ বললাম, ‘না, না। কিছু মনে করি নাই। আপনি তো আমার ভালোর জন্যই দিছেন। থাপ্পড় না দিলে তো শিখতে পারতাম না।’ একবার আবদুল্লাহ আল মামুন বলল, ‘সামাদ! যদি কিছু মনে না করো, ১০ মিনিট কম হয়ে গেছে। তুমি পারবা, ১০ মিনিটের কমেডি কিছু একটা করতে?’ নাজমুল হুদা বাচ্চু ভাইকে ডাকলাম-‘বাচ্চু ভাই! চলেন দুজনে মিলে একটা কিছু করি।’ খানিক বাদে বললাম-‘হ্যাঁ, রেডি করেছি। চলেন।’ শট দিলাম। মানুষ হাসতে হাসতে শেষ। কাহিনী হলো, আমি একটু সরলসোজা। বাজারে গেছি। বাচ্চু ভাইকে রাস্তায় পেয়ে বললাম, ‘চাচা! কেমন আছ? ‘ভালোই তো আছি। তুই কই থেকে আসলি?’ ‘আমি চাচা বাজারে গেছিলাম।’ ‘বাজারে গেছিলি ক্যান?’ ‘সে অনেক কাহিনী।’ ‘কী কাহিনী?’ ‘চাচা! তুমি তো আমার নানিরে চেনো।’ ‘তর নানিরে চিনুম না! তর নানি তো লাউগাছ লাগায়।’ ‘নানিই তো লাউগাছ লাগাইব। আর কে লাগাইব দ্যাশে?’ মানে আমি যেটা বলি, সে তার উল্টোটা বলে। ‘একবার তো লাউ হইল তিন-চাইরডা।’ ‘তর নানি লাগাইছে। লাউ হইব না? ভালোই হইছে।’ ‘চাচা! লাউডা আমি খামু।’ ‘তুই-ই তো খাবি। তর নানির লাউ মাইনষে খাইব নাকি!’ ‘নানি তো দেয় না।’ ‘দিব ক্যান? নানির লাউ হইছে। তরে দিব ক্যান লাউ খাইতে?’ ‘নানি কয় ব্যাচবো বাজারে। শেষে বাজার থেইকা একটা লাউ নিয়া আইছি। কইছে পাঁচ টাকার নিচে বেচবি না। যাওয়ার পথে দারোগা সাব কয়, লাউ কত? কইলাম পাঁচ টাকা। কয়, দূর বেটা, পাঁচ টাকা! আট আনায় দিবি? না, আট আনায় দিব না। হেই বেটা, আট আনায় দিবি না মানে? হেই ধরছে গোড়ার দিকে, আমি ধরছি বোডার দিকে। টানাটানি করতে করতে বোডা ছিঁড়া আমার হাতে আইছে আর লাউ সে লইয়া গেছে গা।’ খুব সরলভাবে বললাম, ‘চাচা! এহন আমি নানির কাছে গিয়া কী কমু? চাচা, এক কাম করি। তোমার কাছে পাঁচটা টেহা আছে?’ ‘আছে।’ ‘দ্যাও তো তাইলে আমারে পাঁচটা টেহা। তোমারে পরে দিমু নে।’ টাকা হাতে নিয়ে বললাম, ‘চাচা! পাঁচ টাকা পাইলাম, নানিরে বুঝাই দেই গা? লাউ তো দারোগা নিছে। আর লাউয়ের বোডাডা তোমারে দিয়া গেলাম। তুমি রাখো।’ এ রকম অনেক অনেক কাহিনী আছে।

তখন কিভাবে জীবন কাটাতেন?
আর্ট কলেজ থেকে পাস করে তিন শ টাকা বেতনের চাকরি করেছি একটা। এরপর আস্তে আস্তে টেলিভিশনে ঢুকে যা পাই তা দিয়ে চলি। এভাবে চলতে চলতে এ পর্যন্ত এসেছি।

মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এখন শরীর কেমন?
এখনো পুরোপুরি সুস্থ হইনি। মোটামুটি ভালো। কাছাকাছি হাঁটাচলা করতে পারি। বেশি দূরে যাই না।

কালেরকন্ঠ

Comments are closed.