কেবল আবেগ-ভালোবাসার ওপর ‘বিক্রমপুর’ দাঁড়িয়ে আছে

মুন্সীগঞ্জ জেলার নাম পরিবর্তন করে বিক্রমপুর করা ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শেষ প্রতিশ্রুতি। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে দাবি জানিয়েছেন মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য ও হুইপ সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি। বিক্রমপুর নামটি শুধু মানুষের আবেগ আর ভালোবাসার ওপর দাঁড়িয়ে আছে মন্তব্য করে তিনি বলেছেন, বাস্তবে কোথাও নেই বিক্রমপুর।

সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি মঙ্গলবার কালের কণ্ঠের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘মুন্সীগঞ্জ জেলার নাম পরিবর্তন করে বিক্রমপুর করা আমার নিজের নির্বাচনী অঙ্গীকার।’ তিনি বর্তমান সরকারের মেয়াদে এই দাবি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের আবেগ-ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিক্রমপুরের নাম। কিন্তু বাস্তবে এখন বিক্রমপুর কোথাও নেই। কেবলই স্মৃতি হয়ে আছে বিক্রমপুর।’

বঙ্গবন্ধুর কথা স্মরণ করে সংসদ সদস্য এমিলি বলেন, বঙ্গবন্ধু মৃত্যুর আগে ঘোষণা দিয়েছিলেন, জেলা হোক বা মহকুমা হোক তিনি এই জায়গার নাম বিক্রমপুর করবেন। জাতির পিতার এই শেষ ইচ্ছা সত্ত্বেও তাঁর মৃত্যুর পর স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি এই জেলার নাম ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবর্তন করে মুন্সীগঞ্জ করে। যারা দেশের স্বাধীনতা চায়নি অথচ দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে, তারাই প্রতিশোধ হিসেবে এই জেলার নাম মুন্সীগঞ্জ করেছে।পদ্মা নদী বিধৌত এই এলাকাকে সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের মিলনস্থল আখ্যায়িত করে বিক্রমপুরের মেয়ে এমিলি এমপি বলেন, পৃথিবীর কোথাও এমন আলোচিত ও ঐতিহ্যবাহী জায়গার নাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া বা মুছে ফেলার নজির নেই। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সব জেলার ঐতিহ্য আছে। যেমন, সমুদ্র চট্টগ্রামের প্রাণ।

সমুদ্রকে ঘিরেই এই জেলার উন্নয়ন। এ রকমভাবে বিক্রমপুর দেশের ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। দেশের আর কোনো জেলায় এত প্রাচীন ঐতিহ্য নেই। হুইপ এমিলি বলেন, পাল ও সেন আমলে এটা ছিল বাংলাদেশের রাজধানী। মুন্সীগঞ্জ শহরের ইদ্রাকপুর এলাকায় রাজা বল্লাল সেনের কেল্লা আজও বিক্রমপুরের প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে। পরবর্তী সময়ে সুবে বাংলার আমলে বিক্রমপুর পরগনার বাংলা অঞ্চলে অত্যন্ত স্বনামধন্য রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক অঞ্চল হিসেবে খ্যাতি লাভ করে।

অতীশ দীপঙ্করের নাম উল্লেখ করে সরকারদলীয় এই এমপি বলেন, বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে ৯৮২ অব্দে বৌদ্ধ ধর্মগুরু এবং বিশ্বখ্যাত জ্ঞানতাপস অতীশ দীপঙ্কর জন্মগ্রহণ করেন। দীপঙ্কর একটি নির্দিষ্ট ধর্মের জন্য সারা পৃথিবী ভ্রমণ করেছেন। চীনে তাঁর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। এখনো চীন-জাপানসহ বিভিন্ন দেশের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষ বিক্রমপুর ভ্রমণ করেন। এলাকার মানুষ আজও দেশের বাড়ি বিক্রমপুর বলে পরিচয় দেয় মন্তব্য করে হুইপ এমিলি বলেন, সারাবিশ্ব বিক্রমপুরকে চেনে। এত ঐতিহ্যবাহী এবং এত ঘটনার সাক্ষী বিক্রমপুরের নামটা হারিয়ে যাবে, এটা হতে পারে না। জেলার নাম মুন্সীগঞ্জ হওয়ার কোনো কারণ নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, সব কিছু মিলে এই জেলার নাম বিক্রমপুর হওয়া উচিত।

এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করে এমিলি এমপি বলেন, শ্রীনগরের এক জনসভায় তিনি মুন্সীগঞ্জ জেলার নাম পরিবর্তন করে বিক্রমপুর করার ঘোষণা দিয়েছেন। এমিলি জানান, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বরাবর তিনি আবেদন জানিয়েছেন এবং তাঁর পরামর্শে প্রধানমন্ত্রীর কাছেও ডিও লেটার দিয়েছেন।প্রধানমন্ত্রী বরাবর পাঠানো ডিও লেটারে সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি দেশের প্রাচীন ঐতিহ্য, ভৌগোলিক সমৃদ্ধি এবং বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ভূখণ্ডের স্বীকৃতি প্রদানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আহ্বান জানিয়েছেন।

ডিও লেটারে তিনি বিক্রমপুরের অতীত ঐতিহ্য তুলে ধরে বলেছেন, বিক্রমপুরে অতীশ দীপঙ্কর, বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু, কৃতী সাঁতারু ব্রজেন দাশ, বহুমাত্রিক লেখক হুমায়ুন আজাদ, রাজনীতিক সরোজিনী নাইডু, কমরেড সত্যেন সেন, চলচ্চিত্রকার আবদুল জব্বার খান, সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন বিক্রমপুরের মাটিতে জন্মগ্রহণ করে এই মাটিকে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করেছেন।

কালের কণ্ঠ

Comments are closed.