বড়রা খুশি, ছোটরা বেজার!

কোনোটি কাঠের বাড়ি, কোনোটি পাকা। বাড়িগুলোর সামনে রাস্তা। মূল রাস্তা থেকে সরু গলি গেছে বিভিন্ন বাড়ির পাশ দিয়ে। সবুজ ঘাসের আস্তরণ আর ছোট ছোট গাছ দিয়ে সাজানো-গোছানো এক ছিমছাম এলাকা।

এ যেন পরিকল্পিত আধুনিক মডেল শহর। এ চিত্র পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর।

পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোতে মসজিদ, খেলার মাঠ, মার্কেটসহ নানা সুবিধা আছে। তবে একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে বিদ্যুৎ, কবরের জন্য জায়গা না থাকা এবং বখাটের উৎপাতের কথা জানিয়েছেন সেখানকার অধিবাসীরা।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য যাঁদের জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, তাঁদের সরকার প্লট দিয়ে পুনর্বাসন কেন্দ্র করেছে। ১৫ মে সরেজমিন পদ্মা বহুমুখী সেতু এলাকার মুন্সিগঞ্জের লৌহজং থানার কুমারভোগ পুনর্বাসন কেন্দ্র, শরীয়তপুরের জাজিরার দিয়ারা নাওডোবা পুনর্বাসন কেন্দ্র ও বাখরেরকান্দি পুনর্বাসন কেন্দ্র ঘুরে সেখানকার অধিবাসীদের জীবনযাপনের নানা চিত্র পাওয়া গেছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পে সাতটি পুনর্বাসন কেন্দ্র রয়েছে।

জাজিরার নাওডোবা পুনর্বাসন কেন্দ্রে এভাবেই গড়ে উঠেছে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ঘরবাড়ি। ছবিটি তুলেছেন আবদুস সালাম

কুমারভোগ পুনর্বাসন কেন্দ্রের প্রবেশমুখে দুটি শিশু দাঁড়িয়ে ছিল। অচেনা মানুষ দেখে তাদের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি। কথা বলে জানা গেল, একজনের নাম ফরহাদ ঢালী, আরেক জনের নাম সাব্বির। তারা দুজনেই মেদিনী মণ্ডল নামের একটি বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। আগে বাড়ি কোথায় ছিল—জিজ্ঞাসা করতেই পশ্চিম দিকে হাত উঁচিয়ে ছেলে দুটি বলল, ‘ওই দিকে।’ এই বাড়ি ভালো, না আগের বাড়ি ভালো—এমন প্রশ্নে ছেলে দুটির জবাব, আগের বাড়ি ভালো ছিল। কেন? তাদের জবাব, ‘আগের বাড়িতে আমগাছ, কাঁঠালগাছ, নারকেলগাছ আছিল। এখানে নাই।’

তাদের কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল আরেকটি শিশু। নাম মো. রিসাদ। তার অভিমত, বর্তমান বাড়ির চেয়ে আগের বাড়িই ভালো ছিল। রিসাদ জানাল, আগের বাড়িতে ধুলাবালি ছিল না। গাছ ছিল। ছায়া ছিল। কিন্তু এখানে এগুলো নেই।

শিশু তিনটির সঙ্গে কথা বলে, সামনে এগোতেই এক ব্যক্তির দেখা পাওয়া গেল। তাঁর নাম জয়নাল আবেদিন। ওই বাড়ি ছেড়ে কেমন লাগছে—জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘আমরা পাঁচ ভাই, সবাই পাশাপাশি আছি। ভালোই লাগছে। আমাদের সবার ৫০ শতাংশ জমি ছিল। এখানে আমরা প্রত্যেকে ৪ শতাংশ করে পাইছি। সরকার টেকাও দিছে।’

এ তো গেল মুন্সিগঞ্জ এলাকার কুমারভোগ পুনর্বাসন কেন্দ্রের কথা। কেমন আছেন শরীয়তপুরের জাজিরার দিয়ারা নাওডোবা পুনর্বাসন কেন্দ্রের বাসিন্দারা। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল শাহীন মাতবরের দরজির দোকান। এই পুনর্বাসন কেন্দ্রের অধিবাসী শাহীন বললেন, তাঁদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে বিদ্যুৎ নেই। পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই। আরেক বাসিন্দা হাসান মাতবর বললেন, ময়লা-আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলে মানুষ। ডাস্টবিন নেই। সন্ধ্যা হলেই মশার উৎপাতে থাকতে পারেন না।
দিয়ারা নাওডোবা পুনর্বাসন কেন্দ্রের সঙ্গে বাখরেরকান্দির পার্থক্য বেশ চোখে লাগে। এই পুনর্বাসন কেন্দ্রের ভেতরটা বেশ গোছানো। বিদ্যুৎ-সংযোগ আছে। ভেতরে পাকা রাস্তা, পাকা মসজিদ। বনায়ন কার্যক্রমও পরিকল্পিত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বললেন, প্রতিদিন এখানে বিকেলে বেশ কিছু ছেলে আসে মোটরসাইকেল নিয়ে। যাঁরা নিজেদের সরকারি দলের লোক হিসেবে পরিচয় দেন। রাস্তা দিয়ে জোরে জোরে হর্ন দিয়ে মোটরসাইকেল চালান। যে বাড়িতে মেয়ে আছে, ওই বাড়ির সামনে আড্ডাও দিতে দেখা যায় তাঁদের।
এখানের বাসিন্দা হারুন হাওলাদার (৫৫) বললেন কবরস্থান না থাকার কথা। ‘আগে মরার পরে কবর কই হইব এই চিন্তা আসে নাই। অনেক জায়গাজমি আছে, কোথাও না কোথাও ঠাঁই পামু। অখন এইখানে দেখি কব্বরও নাই’।

পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, পুনর্বাসন প্রকল্পে দুই হাজার নয় শ প্লট আছে। ইতিমধ্যে ১ হাজার ৩০০ প্লট বিতরণ করা হয়েছে। আরও তিন শ বিতরণের অপেক্ষায়।

প্রথম আলো

Comments are closed.