ঘুষের খেলা: ‘খ’ তালিকাভুক্ত অর্পিত সম্পত্তি

শেষ হয়ে যাচ্ছে নামজারির সময়সীমা, না হলে খাস হয়ে যাবে
সারা দেশে সরকারের দখলে না থাকা ও গেজেট করে বাতিল করা ‘খ’ তালিকাভুক্ত অর্পিত সম্পত্তির নামজারি নিয়ে ব্যাপক ঘুষ ও জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে। জাল দলিল দিয়ে একজনের জমি অন্যজন নামজারি করে নিয়ে মালিক বনে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত মালিকরা মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে পারেননি বলে অনেকেই নামজারি করে জমির মালিক হতে পারেননি। এর মধ্যে নামজারির নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেছে বলে ‘খ’ তালিকাভুক্ত সম্পত্তি নিয়ে নতুন করে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে ‘খ’ তালিকাভুক্ত সম্পত্তি নামজারি করতে না পারলে তা খাসজমি হিসেবে সরকারের ১ নম্বর খতিয়ানে চলে আসবে। অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাত তাঁর এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, গত চার দশকে সারা দেশে এ আইনে ১২ লাখ সংখ্যালঘু পরিবারের ৬০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা হারিয়েছে প্রায় ২৬ লাখ একর জমি। অথচ দুর্নীতির কারণে এর অধিকাংশ জমিই বর্তমানে প্রকৃত মালিকদের নামে খতিয়ানভুক্ত হয়নি। অনেক ভূমির মালিক ঘুষের চাহিদা মেটাতে না পেরে নামজারি করাতে পারছেন না।

ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এ চারটি জেলায় প্রচুর ‘খ’ তালিকার অর্পিত সম্পত্তি রয়েছে। এখনো অনেক জমির নামজারি বাকি রয়ে গেছে। এর মধ্যে নামজারির সময়সীমাও শেষ হয়ে গেছে। ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে এর সময় বৃদ্ধি করা না হলে সব সম্পত্তি খাস খতিয়ানভুক্ত হয়ে যাবে। এতে নতুন করে মামলা-মোকদ্দমা ও ভূমিবিরোধ সৃষ্টি হবে; যার কারণে যে উদ্দেশ্য নিয়ে ‘খ’ তালিকা বাতিল করা হয়েছে, সে উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে।

ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এ মাসেই ‘খ’ তালিকাভুক্ত জমির নামজারির সময়সীমা শেষ হয়ে যাচ্ছে। ২০১৪ সালের ১০ অক্টোবর ‘খ’ তালিকাভুক্ত জমির গেজেট প্রকাশ হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে নভেম্বর মাসের ২১ তারিখ ভূমি মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন যুগ্ম সচিব (আইন) ইব্রাহিম হোসেন খান স্বাক্ষরিত একটি পরিপত্র জারি করা হয়। পরিপত্রে অর্পিত সম্পত্তি ‘খ’ তালিকার সম্পত্তি বিষয়ে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জনস্বার্থে সাতটি নির্দেশনা দেওয়া হয়।

‘খ’ উপধারায় বলা হয়েছে, রেজিস্ট্রিকৃত বৈধ দলিলাদি থাকার পরও যাদের নামে হোল্ডিং খোলা হয়নি তাদের নামে হোল্ডিং খুলে খাজনা আদায় করতে হবে। বিনিময় দলিলের ক্ষেত্রে তথ্য-উপাত্ত যাচাইপূর্বক পৃথক হোল্ডিং খুলে খাজনা গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়।

পরিপত্রের ‘ঘ’ উপধারায় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ‘খ’ তালিকা গেজেটে প্রকাশিত হওয়ার আগে উপযুক্ত আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে যেসব জমি অবমুক্তির আদেশ দেওয়া হয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

‘ঙ’ উপধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘খ’ তফসিলভুক্ত যেসব সম্পত্তি ইতিমধ্যে ১/১ খতিয়ানে রেকর্ডভুক্ত হয়েছে তা অর্পিত সম্পত্তি ‘খ’ তালিকা বাতিল আইন গেজেট হওয়ার পর অকার্যকর হয়ে গেছে। তবে এরূপ সম্পত্তির ক্ষেত্রে সরকারের কোনো স্বত্ব ও স্বার্থ থাকলে তা রক্ষার্থে জেলা প্রশাসন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

‘চ’ উপধারায় বলা হয়, ভূমি মন্ত্রণালয়ের বর্তমান পরিপত্র জারির পর ‘খ’ তালিকাভুক্ত সম্পত্তির ভোগদখলকৃত মালিকরা এক বছরের মধ্যে বৈধ প্রমাণপত্র ও দলিলাদি উপস্থাপনে ব্যর্থ হলে সেসব সম্পত্তি জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০-এর ৫২ ধারা মতে খাস ঘোষণা করা হবে। এ ছাড়া ‘ছ’ উপধারায় বলা হয়েছে, ‘খ’ তালিকাভুক্ত সম্পত্তির খাজনা আদায়ের ক্ষেত্রে বকেয়াসহ হাল সন পর্যন্ত খাজনা আদায় করতে হবে।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশের কোথাও মন্ত্রণালয়ের এ নির্দেশ মাঠপর্যায়ের ভূমি অফিসগুলোতে পুরোপুরিভাবে পালন করা হচ্ছে না। কোথাও কোথাও সীমিত আকারে তা কার্যকর করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ উপেক্ষা করে ভূমি অফিসগুলোতে ‘খ’ তালিকাভুক্ত জমির খাজনা ও নামজারি করতে গেলে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভূমি কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়া না হলে তা কার্যকর করা হচ্ছে না। কোনো কোনো এলাকায় শতাংশ হারেও ঘুষ আদায় হচ্ছে।

ঢাকার পাশের আশুলিয়া এসি ল্যান্ড অফিসে একাধিক দিন গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে ‘খ’ তালিকাভুক্ত জমির প্রকৃত মালিকদের প্রতিনিয়ত হয়রানি করা হচ্ছে। ফুলবাড়িয়া এলাকার বাসিন্দা নুর হোসেন মাতবর বলেন, ‘খ তালিকাভুক্ত ২০ শতাংশ জমি নামজারি করাতে এসে মাসের পর মাস ঘুরছি। অফিসের সার্ভেয়ার সাইফুল, অফিস সহকারী সৌরভ বাবু এক লাখ টাকা ঘুষ দাবি করছেন। এত টাকা ঘুষ দেওয়া আমার মতো কৃষকের পক্ষে সম্ভব নয়।’

আশুলিয়া এসি ল্যান্ড অফিসের নিচে একাধিক ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করে বলেন, তাঁরা মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়েও ‘খ’ তালিকাভুক্ত জমির নামজারি পাচ্ছেন না। মাসের পর মাস ঘোরানো হচ্ছে। আব্দুল হাকিম নামের একজন ভুক্তভোগী বলেন, এসি ল্যান্ডকে ঘুষ দিয়ে ম্যানেজ না করতে পারলে কোনো নামজারিতেই স্বাক্ষর হয় না। এভাবে ভয় দেখিয়েও নিরীহ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করছেন এসি ল্যান্ড অফিসের কর্মচারীরা।

এসব অভিযোগ সম্পর্কে আশুলিয়ার এসি ল্যান্ড ফাহাদ পারভেজ বসুনিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি গত দুই মাস ধরে প্রশিক্ষণে ছিলাম। তাই ঘুষ ও হয়রানির কথা জানি না। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো দুর্নীতি হলে অবশ্যই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ডগাইর মৌজার বাসিন্দা ফারহানা তারেক গত এক বছর ঘুরেও তাঁর ২৭ শতাংশ ‘খ’ তালিকাভুক্ত জমির নামজারি করাতে পারেননি। তিনি দুই লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে চেয়েছিলেন। কালের কণ্ঠকে তিনি জানান, একটি খতিয়ানে কয়েক বিঘা জমি রয়েছে। এর কিয়দংশ ‘ক’ তালিকাভুক্ত জমি থাকার অজুহাতে ২৭ শতাংশ জমির নামজারি দেওয়া হচ্ছে না। অথচ এ জমি তিনি বিক্রি করে ব্যাংকের ঋণ ও ব্যক্তিগত দেনা মেটাবেন।

ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবুল ফজল মীর বলেন, জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে এসি ল্যান্ড কিংবা তহশিল অফিসে অর্পিত সম্পত্তি ‘খ’ তালিকার কার্যক্রম করতে কোনো রকম নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। ভূমি মন্ত্র্রণালয় থেকে জারি করা পরিপত্রের আলোকে নামজারি করে খাজনা আদায় করতে তাদের কোনো বাধা নেই। তবে যেসব জমিতে সরকারি স্বার্থ রয়েছে শুধু সে ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।

হিন্দুু অধ্যুষিত মুন্সীগঞ্জ এলাকায় ‘খ’ তালিকাভুক্ত সম্পত্তি নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেখানে শতাংশ হারে ঘুষ আদায় করা হচ্ছে। ১ শতাংশ সম্পত্তির জন্য তিন হাজার টাকা ঘুষ দিতে হচ্ছে। দেওভোগ মৌজায় ইকবার খান নামের এক ব্যক্তি ৩৩ শতাংশ জমি এক লাখ টাকায় নামজারি করান। ইকবাল খান বলেন, মোটা অঙ্কের ঘুষের জন্য হাজার হাজার মানুষ ‘খ’ তালিকার জমি নিজেদের নামে নামজারি করাতে পারছে না।

তুরাগ নদের উত্তর পাশে আমিনবাজার ভূমি অফিসে গিয়ে দুর্নীতির ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। তহশিলদার ইসমাইল ও সহকারী তহশিলদার রেজাউল করিমকে প্রকাশ্যে ঘুষ নিতে দেখা গেল। বিশেষ করে ‘খ’ তালিকাভুক্ত জমির নামজারি করতে এলে সরাসরি বলে দেওয়া হচ্ছে, ৫০ হাজারের নিচে কোনো নামজারি করা হবে না। বরদেশী গ্রামের হাবিল অভিযোগ করেন, ‘খ’ তালিকাভুক্ত তাঁর ৩ শতাংশ জমির নামজারির জন্য ৩০ হাজার টাকা দাবি করা হচ্ছে। ওই জমি বিক্রি করলেও এত টাকা পাওয়া যাবে না। অবশ্য আমিনবাজারের তহশিলদার ও সহকারী তহশিলদার এ অভিযোগ অস্বীকার করেন।

কালেরকন্ঠ

Comments are closed.