মুন্সিগঞ্জসহ ৯ জেলা শহরে নেই সিনেমা হল

লোকসানের ভারে বন্ধ হচ্ছে ঢাকার মধুমিতা
দেশের ৯ জেলা শহরে কোনো সিনেমা হল নেই। বিনোদনের অভাবে সেখানে বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা। অন্য ৯ জেলায় একটি করে থাকলেও সেগুলোও বন্ধের পথে। তা ছাড়া ঢাকাসহ সারা দেশে বন্ধ হচ্ছে বহু সিনেমা হল। রাজধানীর মধুমিতা চালু রাখা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে ঢাকায় প্রায় এক ডজন সিনেপ্লেক্স নির্মাণ হলেও তাতে বেশি চলে ইংরেজি ছবি। এ তথ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির।

সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিয়া আলাউদ্দিন বলেন, নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত দেশে সিনেমা হল ছিল প্রায় ১৩০০। বর্তমানে এ সংখ্যা ৩১৮। সিনেমা হল বন্ধের জন্য মানসম্মত চলচ্চিত্রের অভাবই মূলত দায়ী। এ ছাড়া নব্বইয়ের দশকের শেষ ভাগে অশ্লীল সিনেমা নির্মাণের কারণে সম্ভ্রান্ত পরিবার দেশীয় সিনেমাবিমুখ হয়। ফলে সিনেমা হল হারায় মধ্য থেকে উচ্চ বিত্তের দর্শক। তবে ভালো ছবি পেলে দর্শক যে আবার হলমুখী হয় তার অন্যতম উদাহরণ ‘মনপুরা’ ছবিটি।

মিয়া আলাউদ্দিন জানান, বর্তমানে খাগড়াছড়ি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মুন্সীগঞ্জ, ঝালকাঠি, নরসিংদী, বরগুনা, নাটোর, চুয়াডাঙ্গা ও বাগেরহাট জেলা শহরে কোনো সিনেমা হল নেই। চাঁদপুর, পঞ্চগড়, ফরিদপুর, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, নড়াইল, দিনাজপুর, নেত্রকোনা ও বগুড়া জেলা শহরে একটি করে সিনেমা হল থাকলেও ভালো ছবি ও দর্শকের অভাবে সেগুলোও বন্ধের পথে।

মিয়া আলাউদ্দিন বলেন, নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত রাজধানীতে ছিল ৪৪টি সিনেমা হল। বর্তমানে রয়েছে ২৮টি। এর মধ্যে মধুমিতা সিনেমা হলটি চালু রাখা নিয়ে কর্তৃপক্ষ দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে। মধুমিতার অন্যতম কর্ণধার ইফতেখার নওশাদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন লোকসান গুনে সিনেমা হলটি চালাচ্ছি। মাস শেষে বিদ্যুৎ বিল, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনসহ নানা মেইনটেন্যান্স খরচ রয়েছে। ছোট ভাই রফিকউদ্দিন বাবলু লোকসান সত্ত্বেও বাবার স্মৃতি ধরে রাখতে সিনেমা হলটি বন্ধ করতে চায়নি। সম্প্রতি মারা গেছেন। এখন আমি ও আমার মেজ ভাইয়ের পক্ষে লোকসানি এই প্রতিষ্ঠানটি আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।’

নওশাদ বলেন, ‘গত রোজার ঈদে মুক্তি পাওয়া একটি সুপার হিট ছবি সম্প্রতি আবার মধুমিতায় প্রদর্শন করা হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রথম শোতে টিকিট বিক্রি হয় মাত্র ৯০০ টাকার মতো। এভাবে আর কত লোকসান গুনব? দুপুর ২টা থেকে বাণিজ্যিক রেটে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হয়।’

মিয়া আলাউদ্দিন আরও বলেন, অশ্লীলতার আগ্রাসন ও ভালো ছবির অভাবে শুধু ঢাকা নয়, বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামেও চলচ্চিত্র ব্যবসার বেহাল দশা। সেখানে ২১টি সিনেমা হলের মধ্যে এখন রয়েছে আলমাস, দিনার ও সিনেমা প্যালেস। রাজশাহীতে ছয়টির স্থলে আছে একটি ‘উপহার’, খুলনায় ছিল ১৪টি। এখন আছে চারটি। যশোরে আছে একটি ‘মণিহার’। প্রাচ্যের ডান্ডি খ্যাত নারায়ণগঞ্জে বন্ধ হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ডায়মন্ড ও হংস সিনেমা হল। দেশের বাকি সিনেমা হলগুলোও বন্ধের পথে।

মিয়া আলাউদ্দিন বলেন, এতে শুধু চলচ্চিত্র ব্যবসারই বিলুপ্তি ঘটছে না, বিনোদনের অভাবে মফস্বল শহরগুলোয় অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। মফস্বলে বিনোদন বলতে সিনেমা ছিল একমাত্র ভরসা। শ্রমজীবী মানুষ দিনভর খাটুনির পর সন্ধ্যায় বিনোদনের মাধ্যমে ক্লান্তি দূর করতে সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখত। একসময় তারা মনের মতো ছবির অভাবে সিনেমা হলবিমুখ হয়। হাতে গোনা কয়েকজন গেলেও এখন প্রায় জায়গায় সিনেমা হল না থাকায় বিনোদন হিসেবে তারা সিডি-ডিভিডিতে সেন্সরবিহীন আপত্তিকর দৃশ্যের সিনেমা ও নীল ছবি দেখে এবং জুয়া, হাউজি, মাদকদ্রব্যের আশ্রয় নিয়ে সমাজে অপরাধ বাড়াচ্ছে।

তিনি আরও জানান, ঢাকায় বসুন্ধরা শপিং মলে চারটি, যমুনা ফিউচার পার্কে সাতটি, শ্যামলীতে একটি সিনেপ্লেক্স নির্মাণ চলচ্চিত্র ব্যবসার জন্য শুভ সংবাদ হলেও এগুলো দেশীয় ছবির পরিবর্তে হলিউডের ছবিনির্ভর হয়ে পড়েছে।

মিয়া আলাউদ্দিন বলেন, বর্তমান সরকার চলচ্চিত্রশিল্পের উন্নয়নে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় এ শিল্প এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এ বিষয়ে সরকারি মনিটরিং ব্যবস্থা জরুরি।

বাংলাদেশ প্রতিদিন

Comments are closed.