মুন্সীগঞ্জ এখন আতঙ্কের শহর!

শেখ মো. রতন: রাজধানী ঢাকার অদূরের জেলা শহর মুন্সীগঞ্জ এখন সন্ত্রাসী-অপরাধীদের অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই হত্যাকাণ্ড, ধারাবাহিক চুরি-ডাকাতি, গণপিটুনিতে হত্যা, পুলিশের ওপর হামলা, রাইফেল লুট, পুলিশের গুলিতে সন্ত্রাসী নিহতসহ একাধিক অপরাধ কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে জেলাটিতে। আর এসব কারণে মুন্সীগঞ্জ অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়ে উঠেছে।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত হলেই জেলার গ্রামাঞ্চলে ডাকাত-আতঙ্কে এক ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে এসব ঘটনায় জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

জেলার পুলিশ বিভাগ মুন্সীগঞ্জের ১৫ লক্ষাধিক মানুষের নিরাপত্তা বিধানে প্রতিনিয়তই ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। বাধ্য হয়ে বর্তমানে জেলার বিভিন্ন গ্রামে নিজ উদ্যোগে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে গ্রামবাসী।

এ অবস্থায় প্রতি মাসে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সম্মেলনকক্ষে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় দ্রুত সময়ের মধ্যে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য জেলা পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন কমিটির উপদেষ্টা ও মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মৃণাল কান্তি দাস।

তিনি পুলিশ প্রশাসনকে সতর্ক অবস্থান নিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘হরতাল-অবরোধের নামে বিএনপি-জামায়াতসহ ২০ দলীয় জোট যেকোনো সময় নাশকতামূলক ঘটনা ঘটাতে পারে। সে জন্য আপনারা সতর্ক থাকবেন।’

খোজঁ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৪ সালে প্রথম তিন মাসে তিনটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। তবে চলতি বছরে মুন্সীগঞ্জে একই সময়ে সাতটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যা উদ্বেগজনক।

এদিকে, হত্যাকাণ্ডগুলোতে অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার হলেও এখনো পর্যন্ত কোনো অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। গত চার মাসে একাধিক সংঘর্ষে ও হত্যাকাণ্ডে প্রকাশ্য অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করেছে অপরাধীরা। হত্যাকাণ্ড এখনো চলমান রয়েছে। অথচ পুলিশ সেসব অস্ত্র উদ্ধার করতে পারছে না।

এ ছাড়া গত ১৮ এপ্রিল সকাল সাড়ে ৭টায় শ্রীনগরের ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের কেয়টখালী এলাকায় অজ্ঞাতপরিচয় এক যুবতীর (৩২) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। একই দিন সকাল ৯টায় সিরাজদিখানের ইছাপুরা ইউনিয়নের উত্তর মধ্যপাড়া গ্রামে জমিসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে চাচাতো ভাইদের হামলায় মো. মনির হোসেন হাওলাদার (৪০) নামে এক যুবক নিহত হন।

১৬ এপ্রিল সদর উপজেলার শিলই গ্রামের কচুখেত থেকে স্বামী পরিত্যক্তা শাহীনা ওরফে শাহীন বেগম (৩২) নামের এক যুবতীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।

অন্যদিকে, জেলার বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক ডাকাতির ঘটনা ঘটেই চলছে। টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বেতকা বাজরে স্বর্ণের দোকানে ডাকাতি, শ্রীনগরের তন্তর ইউনিয়নের পুরারবাগ গ্রামে তিনটি বাড়ি ডাকাতি ও গ্রামবাসীর গণপিটুনিতে ডাকাত নিহত, গজারিয়ায় বালুয়াকান্দি এলাকায় ১৯৭ বস্তা চাল লুটের ঘটনায় জেলার সর্বত্র ডাকাত-আতঙ্ক বিরাজ করছে। পদ্মা, মেঘনা নদী ঘেঁষা গ্রামগুলোতে রাত হলেই ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকায় জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে বলে আলোচনা-সমালোচনা করছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

অপরদিকে, পুলিশের বিরুদ্ধেও একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে গজারিয়া থানা পুলিশ শীর্ষে রয়েছে। তারা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানবাহন থেকে আটক ইয়াবাসহ মাদকের বড় বড় চালান উদ্ধারের পর সোর্স মানির কথা বলে সিজার লিস্টে জব্দ কম দেখিয়ে ওই মাদক বাইরে বিক্রি করে। স্বর্ণ চোরাচালান মামলায় জব্দ করা প্রাইভেট কার গজারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফেরদৌস আহমেদের ঢাকা-গজারিয়া যাতায়াতে ব্যবহার করাসহ একাধিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

এ ছাড়া জেলার ছয়টি থানা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেছেন সাধারণ মানুষ।

জেলার আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার বিপ্লব বিজয় তালুকদার জানিয়েছেন, জেলা পুলিশ বিভাগ সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। হত্যা ও ডাকাতির ঘটনায় পুলিশ সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

তিনি আরো জানান, ঊর্ধ্বতন ক্ষমতাসীন নেতৃবৃন্দের ছত্রচ্ছায়ায় থাকার কারণে অনেক চিহ্নিত অস্ত্রধারী ক্যাডার, মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করা সম্ভব হয় না। তবে জেলার বাকি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে আছে বলে জানান তিনি।

এ ছাড়া, যেসব পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগতসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান পুলিশ সুপার বিপ্লব বিজয় তালুকদার।

রাইজিংবিডি

Comments are closed.