সাঙ্গ হলো জাপান প্রবাসীদের প্রাণের মেলা টোকিও বৈশাখী মেলা

রাহমান মনিঃ বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা আনন্দ উচ্ছাসে অনুষ্ঠিত হলো জাপান প্রবাসীদের প্রাণের মেলা টোকিও বৈশাখী মেলা। ১৯ এপ্রিল ২০১৫ রোববার টোকিওর প্রাণকেন্দ্র তোশিমা সিটির ইকেবুকুরো নিশিগুচি পার্কে দিনব্যাপী এই মেলায় আগমন ঘটেছিল ধর্ম-বর্ণ-দল-মত নির্বিশেষে সর্বস্তরের প্রবাসীর। শুধু প্রবাসীরাই নয়, স্থানীয় জাপানি অতিথি ছাড়াও বিভিন্ন দেশের নাগরিকগণ ইকেবুকুরো নিশিগুচি পার্কে স্বল্প সময়ের জন্য একচিলতে বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশীয় সংস্কৃতি উপভোগ করেন।

টোকিও বৈশাখী মেলা, নামে টোকিও হলেও আসলে জাপানে বসবাসরত সবার অংশগ্রহণে হয়ে ওঠে জাপান বৈশাখী মেলা। তাই তো জাপানের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি এবং তাদের সুহৃদগণ স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মেলা আর মেলাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, হয়ে ওঠে মহামিলন মেলা। তাই টোকিও বৈশাখী মেলা হয়ে ওঠে জাপান প্রবাসীদের একক এবং বৃহৎ মিলন মেলা।

প্রবাসে বাংলাদেশ কমিউনিটি বাংলাদেশের জাতীয় দিবসগুলো পালনে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে থাকে। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রেক্ষাপটে জাতীয় দিবসগুলো আয়োজনে প্রায়শই কিছুটা ভিন্নতা পরিলক্ষিত হলেও মহান শহিদ দিবস যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যে এবং বাংলা নববর্ষ উৎসাহ উদ্দীপনা ও আনন্দ উৎসবে পালন করে থাকে। এর মধ্যে আবার বৈশাখী মেলা আয়োজনে আদিকাল থেকেই এর ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। বিশেষ করে গ্রামবাংলা। শহর অঞ্চলে আধুনিকতার ছোঁয়ায় কিছুটা পরিবর্তন এবং কৃত্রিমতা পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। বিশেষ করে ঘটা করে আয়োজন করে পান্তা-ইলিশ খেয়ে একদিনের জন্য বাঙালি সাজার প্রবণতা। তবে তা বাঙালির হৃদয়ে স্থান নেয়া নববর্ষ উদযাপন বিন্দুমাত্র মøান করতে পারেনি। এই একটি মাত্র আয়োজনেই সবাই একাকার হয়ে যায়। ভুলে যায় তাদের দলীয় মতামতের ভিন্নতা কিংবা ধর্মীয় অনুসরণের স্বকীয়তা। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাই আনন্দে মেতে ওঠে। জানান দেয় বৈশাখী মেলা বাংলাদেশি বাংলাভাষীদের প্রাণের মেলা।

টোকিও বৈশাখী মেলাকে ঘিরে প্রবাসীদের উৎসাহ উদ্দীপনা কাজ করে বেশ কিছুদিন পূর্ব থেকেই। ড. শেখ আলীমুজ্জামানের নেতৃত্বে একদল কর্মী ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে বৈশাখী আয়োজনকে সুন্দর ও সার্থক আয়োজনের জন্য। বিভিন্ন সভা করে কমিটি, সাব কমিটিতে ভাগ হয়ে একাধিকবার আলোচনায় বসে নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে এই বৃহৎ মেলাকে সার্থক করে তোলে।

শিশু-কিশোররা ব্যস্ত হয়ে পড়ে তাদের প্রতিভা বিকাশ ও প্রকাশে। একাধিকবার অনুশীলন করে তাদের সর্বোচ্চ প্রতিভা প্রকাশে নিজেদের গড়ে তোলে।

ব্যবসায়ীরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে নানা রকম পসরা সাজাবার প্রয়াসে। বেশ কিছুদিন পূর্ব থেকেই প্রস্তুতি নেয়া হয় অতিথি ক্রেতাদের সর্বোচ্চ দৃষ্টি আকর্ষণে। অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ দেয়া হয় ক্রেতাদের উত্তম সেবা দেয়ার জন্য। তাই তো বৈশাখী মেলাকে ঘিরে প্রবাসীদের প্রাণ-চাঞ্চল্যতা দেখা দেয় সর্বস্তরে।

বাংলাদেশে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের কথা এলে যেমন রমনার বটমূলে ছায়ানটের আয়োজনের কথা সর্বাগ্রে চলে আসে, ঠিক তেমনি জাপান প্রবাসীদের বাংলা নববর্ষ উদযাপন বলতে একবাক্যে চলে আসে ইকেবুকুরো নিশিগুচি কোয়েনের কথা। যদিও জাপানের বিভিন্ন স্থানে প্রবাসীরা বৈশাখী মেলার আয়োজন করে থাকে। বিশেষ করে যেখানে বা যেসব এলাকাগুলোতে বাংলাদেশিদের বসতি বেশি এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, যেখানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আধিক্য বেশি।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা বর্ষবরণ উৎসবের আয়োজন করে জানান দেন বাংলা সংস্কৃতির ঐতিহ্য, সমৃদ্ধ এবং নিজস্বতার কথা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি থাকলেও অনেক উন্নত দেশগুলোরই নিজস্ব পঞ্জিকা নেই। তাই বর্ষবরণ করতে হয় ইংরেজি নববর্ষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। সেই হিসেবে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা গর্ববোধ করতেই পারে।

ইকেবুকুরো নিশিগুচি কোয়েন যে শুধু বৈশাখী মেলা প্রাঙ্গণ হিসেবে সুপরিচিত, তা কিন্তু নয়। এ মাঠেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বাঙালি জাতির গর্ব, বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন, বিশ্ব মাতৃভাষা স্বাধিকারের প্রতীক, আমাদের মহান শহিদ মিনার। এই স্থানে বৈশাখী মেলার সফল আয়োজনের সাফল্যের ধারাবাহিকতা এবং মেলা কমিটির ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও টোকিওস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় দেশের বাইরে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত/স্থাপিত প্রথম শহিদ মিনার। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২০০৫ সালে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং ২০০৬ সালে বৈশাখী মেলার দিনে তৎকালীন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী মেজর কামরুল ইসলাম (অব.) এর উদ্বোধন করেন। সেই সময় জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন জনাব সিরাজুল ইসলাম।

টোকিও শহিদ মিনার হয়ে উঠেছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সবকিছুর প্রাণকেন্দ্র। বাংলাদেশ থেকে বিশিষ্টজনরা জাপান সফর করলে এই স্থান পরিদর্শন করে থাকেন। প্রাণের টানেই তারা এই পরিদর্শন করে থাকেন। বিশিষ্টজনদের পদচারণে মুখরিত হয়ে ওঠে টোকিও শহিদ মিনার প্রাঙ্গণ।

এই মহাউৎসব বাংলাদেশে ১৪ এপ্রিল (১লা বৈশাখ) পালিত হলেও দিনটি জাপানে কর্মদিবস হওয়ায় পরবর্তী রোববার অর্থাৎ ১৯ এপ্রিল টোকিওতে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়। তবে যথারীতি এর কার্যক্রম শুরু হয় তিন মাস আগে থেকেই। একাধিক সভা করে বিভিন্ন কমিটি, উপকমিটি বণ্টন করে সমন্বয়ক, মূল্যায়ক, উপদেষ্টা এবং সদস্য সচিব নির্বাচিত করে দায়িত্ব বণ্টন করে কাজের তদারক করা হয় কেন্দ্র থেকে। কেন্দ্রীয় কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ড. শেখ আলীমুজ্জামান নেতৃত্ব দেন এই তদারকির কাজে।

ড. শেখ আলীমুজ্জামানের দক্ষ নেতৃত্ব ও পরিচালনায় টোকিও বৈশাখী মেলা যে কতটা গোছালো, পরিকল্পিত ও প্রাণবন্ত তা না দেখলে বোঝার উপায় নেই। সেই সঙ্গে রয়েছে প্রবাসীদের অকুণ্ঠ সমর্থন এবং স্থানীয় প্রশাসন ও জাপানি জনগণের অকৃত্রিম সহযোগিতা।

বিভিন্ন দেশের দর্শনার্থীদের পদাচরণে মেলা প্রাঙ্গণ মুখরিত হয় সকাল থেকেই। যদিও এর আমেজ শুরু হয় পূর্ব রাতেই। পূর্ব রাতেই মেলা প্রাঙ্গণ স্টল এবং মেইন স্টেজের অনেক কাজই সমাপ্ত হয়ে যায়। শিল্পী কামরুল হাসান লিপু রাত জেগে স্টেজের কাজটি সমাপ্ত করেন শিল্পী হোসাইন মুনীরের সহযোগিতা ও নির্দেশনায়। বাকি কাজগুলো মেলার দিন সকালেই সবার সহযোগিতায় সমাপ্ত করা হয়।

সকাল ১০টায় মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী ঘোষণা করা হয়। এবারের মেলাতেও ১০ হাজারেরও বেশিসংখ্যক দর্শনার্থীর আগমন ঘটে, যার অধিকাংশই স্থানীয় জাপানি ও অন্যান্য দেশের নাগরিক। আর এখানেই জাপান প্রবাসীদের সার্থকতা। জাপান প্রবাসীদের দ্বারা আয়োজিত প্রায় প্রতিটি আয়োজনেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জাপানি নাগরিকদের অংশগ্রহণ থাকে। আর এই সার্থকতা দেখে অভিভূত হন বাংলাদেশ থেকে আগত অতিথি ও শিল্পীবৃন্দ। প্রায় সব অতিথিবৃন্দ তাদের শুভেচ্ছা বক্তব্যে তা স্বীকার করেন।

এবারের মেলার উদ্বোধনী আয়োজনেও দীর্ঘদিনের প্রচলিত ফিতা কাটার নিয়ম রাখা হয়নি। কবিগুরুর ‘এসো হে বৈশাখ’ গান দিয়ে মেলার উদ্বোধন হয়। গত বছর থেকেই ফিতা কাটা প্রথা বাদ দেয়া হয়। সাদামাঠা উদ্বোধন হলেও প্রবাসীদের উচ্ছ্বাসের কমতি ছিল না। এসময় মেলা আয়োজক কমিটি সংশ্লিষ্ট ছাড়াও স্বতঃস্ফূর্তভাবে আগত দর্শনার্থীও স্টেজে উদ্বোধনী গানে অংশ নেয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের উপস্থাপনাতেও নতুন মুখ দেখা যায় এবার। জুয়েল আহসান কামরুলের সঙ্গে এবার নতুন মুখ হিসেবে নারমিন হক। এই প্রথমবারের মতো নারমিন হক উপস্থাপনা করে জানান দিয়েছেন তার শক্ত অবস্থানের কথা। প্রথমবার অংশ নিলেও কোনো প্রকার জড়তা ছিল না তার মধ্যে। অত্যন্ত সাবলীল এবং সহজবোধ্য ভাষায় তিনি বৈশাখী মেলার উপস্থাপনায় অংশ নেন। এবারের আয়োজন ছিল ষষ্ঠদশ বা ১৬তম আয়োজন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর একে একে শুরু হয় পরিচিতি পর্ব (মেলা পরিচালনা কমিটি, স্টল ও স্পনসরদের পরিচিতি), বড়দের উন্মুক্ত অনুষ্ঠান (এ পর্বে উপস্থিত যে কেউ অংশ নিয়ে প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারেন), ছোটদের চিত্রাঙ্কন (উন্মুক্ত), ছোটদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান (নাচ, গান, আবৃত্তি, অভিনয়, কৌতুক, যেমন খুশি সাজো ইত্যাদি দিয়ে সাজানো হয়), বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে জাপানি প্রোগ্রাম (জাপানি নৃত্যদল আরাধনা কর্তৃক নৃত্য পরিবেশন, কোয়ো ঢাক দলের ঢাকের বাজনা), বাংলাদেশ থেকে আগত নৃত্যদল ‘নৃত্য নন্দন’-এর নৃত্য পরিবেশন (নৃত্য নন্দন, নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে বাংলাদেশ দূতাবাসের ডাকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে জাপান সফর করেন। দলের সদস্যরা হলেন শর্মিলা ব্যানার্জি, সুদেশনা স্বয়াম্প্রভা, কৃষ্ণা রায়, মেহ্রাজ হক, মোঃ রাসেল আহমেদ, সাইফুল ইসলাম ইভান এবং বেবী ইরা বালা), অতিথি সংবর্ধনা (প্রধান অতিথি রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন, আয়োজক সংগঠন জেবিএস-এর চেয়ারম্যান ড. ওসামু ওৎসুবো, বিশেষ অতিথি স্থানীয় প্রশাসন তোশিমা সিটি ডেপুটি মেয়র মিজুশিমা মাসাহিকো, বিশেষ অতিথি জাপান-বাংলাদেশ কিয়োকাই সভাপতি এবং বাংলাদেশে জাপানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাৎসুহি হোরিগুচি এবং জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি কমিটির মহাসচিব ইচিরো ৎসুকাদা), মেলার স্পনসরদের পরিচিতি ও ক্রেস্ট প্রদান, বৈশাখী কনসার্ট (স্থানীয় প্রবাসী সাংস্কৃতিক দল উত্তরণ বাংলাদেশি সাংস্কৃতিক দল, স্বরলিপি কালচারাল একাডেমী এবং সবশেষে বাংলাদেশ থেকে আমন্ত্রিত শিল্পীরা এই পর্বে অংশ নেন) এবং সবশেষে সমাপনী ঘোষণা দিয়ে শেষ হয় দিনব্যাপী বৈশাখী মেলার।

এবার দেশ থেকে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন চ্যানেল আই সেরাকণ্ঠ-২০০৮ জানিতা আহমেদ ঝিলিক এবং বাংলাদেশি আইডল সেরাকণ্ঠ প্রথম রানারআপ আরিফুর রহমান আরিফ। যন্ত্রে এসেছিলেন প্রখ্যাত গিটারিস্ট রাজীবুল হোসেন সোহেল, পারকাশনিস্ট ও ড্রামার সজল কুমার মিঠু এবং কি-বোর্ডে নাদিম ভূঁইয়া।

আমন্ত্রিত শিল্পীদের মধ্যে ঝিলিক ঝিলিক দিয়ে না উঠতে পারলেও স্টেজ মাতিয়েছেন আরিফ। হাজার হাজার দর্শক-শ্রোতা আরিফের গানে মেতেছেন, কণ্ঠ মিলিয়েছেন। তবে তার চেয়ে বেশি মাতিয়েছেন যন্ত্রে যারা এসেছিলেন। বিশেষ করে কি-বোর্ডে নাদিম ভূঁইয়া। নাদিম ভূঁইয়ার কারুকাজ দর্শক উপভোগ করেছে। অনেক ঝানু শিল্পীরাও (প্রবাসী) স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, ছেলেটি কাজ জানে এবং কি-বোর্ডে মাস্টারদেরও মাস্টার। ঝিলিক এবং আরিফ বিভিন্ন শিল্পীদের জনপ্রিয় গানগুলো গেয়ে দর্শকদের মন জয় করার চেষ্টা করেছেন। সবশেষে একটি ডুয়েল গানের প্রথম কলি গেয়ে তাদের পর্ব সমাপ্ত করেন।

বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান টোকিও বৈশাখী মেলার একটি অন্যতম মানবিক উদ্যোগ। এবারও তার ব্যতিক্রম ছিল না। শুধু বাংলাদেশিদের জন্য জাপান-বাংলাদেশ সোসাইটির উদ্যোগে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হয়ে থাকে। কর্মব্যস্ততার জন্য কিংবা আর্থিক অসচ্ছলতার জন্য যে সমস্ত প্রবাসী বাংলাদেশি নিয়মিতভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে উঠতে পারেন না এবং বিশেষ করে ভাষাগত সমস্যার কারণে যারা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে ইতস্তত বোধ করেন তাদের জন্য এই উদ্যোগ। শুরুতে স্বাস্থ্যবীমা জটিলতার কথা চিন্তা করে এই মহতী উদ্যোগটি নেয়া হয়েছিল। ভ্রাম্যমাণ হলেও এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সঠিক পরীক্ষার মাধ্যমে পরবর্তীতে রিপোর্ট এবং পরামর্শ ডাকযোগে জানানো হয়ে থাকে। এটা প্রশংসনীয় একটি সেবামূলক উদ্যোগ, প্রতিবছরই এই সেবা কেন্দ্রের গুরুদায়িত্বটি পালন করে থাকেন ড. নোরিকো কিনুকাওয়া। মেলার প্রধান সমন্বয়কারী ড. শেখ আলীমুজ্জামানের সহধর্মিণী।

মেলার শুরুতে উন্মুক্ত অনুষ্ঠানের সমন্বয়কারী ও উপস্থাপনায় ছিলেন তানিয়া ইসলাম মিঠুন। সহযোগিতায় ছিলেন রাহমান মাহিনুর আইকো ইফা। এই আয়োজনটিতে বিভিন্ন প্রতিভা বিকাশের সুযোগ থাকে, প্রতিবছর নতুন নতুন শিল্পী উঠে আসে এই পর্ব থেকে। যারা কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নন অথচ প্রতিভার অধিকারী তারাই শুধু এই পর্বে অংশ নিয়ে থাকেন।

শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি প্রতিবারই মেলায় অন্যতম আকর্ষণীয় পর্ব হয়ে থাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম ছিল না। নাসরাহ, জোসিয়া, লামিয়া হায়দার টুনটুনি’র নাচের পাশাপাশি কলির নির্দেশনায় স্বরলিপির এক ঝাঁক খুদে নৃত্যশিল্পীর নাচ দর্শক মনে রাখবে বেশ কিছুদিন। দর্শক মনে রাখবে উত্তরণের শিশু-শিল্পীদের জাপানিজ গানের (সারানবুশি) সঙ্গে নাচটির কথা।

এবার বৈশাখী মেলায় প্রথমবারের প্রবাসী লেখকদের পরিচিতি করানো হয়। যাদের লেখা বই বাংলা একাডেমি বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তাদেরকে মূল স্টেজে পরিচিত করানো হয়। শত ব্যস্ততার মাঝে থেকেও আটজন প্রবাসী তার বই বের করেন বাংলা একাডেমি বইমেলা ২০১৫তে।

এই ৮ জন প্রবাসীর মধ্যে ড. আশির আহমেদ এর ‘জাপান কাহিনী’ টোকিও বৈশাখী মেলায় দশদিক বুকস্টলে সর্বোচ্চ বিক্রির তালিকায় ওঠে। ‘ঐতিহ্য’ প্রকাশ সংস্থা থেকে প্রকাশিত জাপান কাহিনী প্রবাসী লেখকদের মধ্যে ২০১৫ বইমেলা (বাংলা একাডেমি) ২য় সর্বোচ্চ বিক্রয়ের রেকর্ড গড়ে।

উন্মুক্ত চিত্রাঙ্কন (শিশু-কিশোরদের) এবং বৃষ্টির জন্য কিছুটা হোঁচট খায়। বৃষ্টির জন্য অনেক বাচ্চাই তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারেনি। বৃষ্টি শুধু চিত্রাঙ্কনই ব্যাঘাত ঘটায়নি। ব্যাঘাত ঘটিয়েছে পুরো মেলাতে। ভরদুপুরে বৃষ্টি শুরু হলে একপর্যায়ে আয়োজকদের ভাবিয়ে তুলে। প্রায় দুই/ আড়াই ঘণ্টা গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি অব্যাহত থাকে। একপর্যায়ে মেলা প্রাঙ্গণে বিছানো চাদর বসায় অনুপযোগী হয়ে ওঠলে সকলে দাঁড়িয়ে যায়। তবুও প্রবাসীদের অনুষ্ঠান উপভোগে বাধা হতে পারেনি বৈরী আবহাওয়া।

অতিথি বরণ এবং বক্তব্য প্রদান পর্বে স্থানী প্রশাসন তোশিমা সিটির ডেপুটি মেয়র মাসাহিকো মিজমিমা বলেন, গত ১৫ বছর যাবৎ বাংলাদেশিরা এখানে তাদের নববর্ষ উদযাপন করে আসছে কৃতিত্বের সঙ্গে। বাংলাদেশের নববর্ষ উদযাপনে অংশীদার হতে পেরে তোশিমা সিটির জনগণ গর্বিত। বাংলাদেশিদের উচ্ছ্বাস, ইচ্ছাশক্তি এবং মনোবলের কাছে বৃষ্টি কোনো ব্যাঘাতই নয়। আমি মনে করি আপনাদের অটুট মনোবলের কাছে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাবে এবং এখনি। মিজুমিমার বক্তব্যের পরই বৃষ্টিপাত বন্ধ হয়ে যায়।

জাপান-বাংলাদেশ কিয়োকাই এর প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশে প্রাক্তন জাপান রাষ্ট্রদূত মাৎসুমিরো হোরিগুচি-সাম্প্রতিক বাংলাদেশের অভাবনীয় সাফল্যের ফিরিস্তি তুলে ধরেন। হোরিগুচি বলেন, উন্নয়নশীল বাংলাদেশ যেসব ক্ষেত্রেই ততোটা উন্নতি লাভ করেছে তা না দেখলে বুঝা যাবে না। এই বছর আমি তিন বছর পর বাংলাদেশে গিয়েছিলাম, স্বচোখে দেখে এসেছি বাংলাদেশিদের সাফল্য।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত মাসুদ-বিন মোমেন বলেন, জাপানে প্রবাসীরা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলে অনেক কাজ করে থাকে। বৈশাখী মেলা আয়োজন তার অন্যতম। এই মেলার মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য, খাদ্য সংস্কৃতির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহ্য তুলে ধরছেন। আমি আপনাদের এই প্রয়াসের প্রশংসা করি। রাষ্ট্রদূত বলেন, ভবিষ্যতে দূতাবাস এবং প্রবাসীরা মিলে আরও বৃহৎ পরিসরে কিছু করা যায় কি-না তা নিয়ে চিন্তা আমার এবং দূতাবাসের রয়েছে। আপনাদের সহযোগিতা পেলে অবশ্যই বাংলাদেশকে আরও ব্যাপকভাবে জাপানে তুলে ধরা যাবে বলে রাষ্ট্রদূত আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বিশেষ অতিথি হিসেবে জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি কমিটির মহাসচিব সংসদ সদস্য ইচিরো সুকাদা ব্যস্ততার জন্য আসতে না পারায় তার ম্যাসেজ পাঠ করেন তার পিএস হোনমা।

বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর মেলাপ্রাঙ্গণে প্রবাসীদের ঢল নামে। উপচে পড়ে ইকেবুকুরো নিমিগুচিপার্ক। যথাসময়ে মেলায় সমাপ্তি ঘোষণা দেন প্রধান সমন্বয়ক ড. শেখ আলীমুজ্জামান। সমাপ্তি ঘোষণা আনুষ্ঠানিকভাবে দেয়া হলেও এই যেন শেষ হইয়াও হইলো না শেষ। প্রবাসীরা মেতে ওঠেন আলাপচারিতা এবং একই সঙ্গে সেলফি তোলায়। দেখা হবে আগামী মেলায় এই প্রত্যয় ব্যক্ত করে একপর্যায়ে প্রবাসীরা মেলা প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন। সঙ্গে হয় এক বছরের অপেক্ষার পর একদিনের ‘ষষ্ঠদশ টোকিও বৈশাখী মেলা ২০১৫।

rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক

Comments are closed.