হুমায়ুন আজাদ – আলোর পাখি, নাম জোনাকি

নাবীল অনুসূর্যঃ আমাদের আলোর পাখি। তাকে জোনাকি হিসেবেই চিনতে চাই। কারণ, তিনি আমাদের অন্ধকার সমাজে আলো ছড়িয়েছেন অবিরাম। তার নাম হুমায়ুন আজাদ- বাংলা ভাষার এক অসামান্য পণ্ডিত। তিনি একাধারে কবি, লেখক, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, সমালোচক।

জন্মেছিলেন বিক্রমপুরের রাঢ়িখাল গ্রামে, ১৯৪৭ সালের ২৮ এপ্রিল। এই গ্রামে জন্মেছিলেন বাংলার আরেক কৃতী সন্তান- জগদীশচন্দ্র বসু। তার নামে একটি স্কুলও আছে সেখানে- স্যার জগদীশচন্দ্র বসু ইন্সটিটিউশন। সেখানেই স্কুল জীবন পার করেন হুমায়ুন আজাদ। পরে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। সেখান থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা পাস করেন ১৯৬৪ সালে। তারপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। স্নাতক সম্মান এবং স্নাতকোত্তর সম্মান ডিগ্রি অর্জন করেন যথাক্রমে ১৯৬৭ ও ১৯৬৮ সালে, দুটোই প্রথম শ্রেণীতে। পেশাগত জীবনে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগেরই অধ্যাপক।

হুমায়ুন আজাদ যখন বাংলায় পড়ছিলেন, পৃথিবীর ভাষাবিজ্ঞানের আসরে তখন চলছে তোলপাড়। নোয়াম চমস্কি ব্যাকরণের এক নতুন তত্ত্ব দিয়েছেন- সৃষ্টিশীল রূপান্তরমূলক ব্যাকরণ। এই নতুন তত্ত্ব নিয়েই তখন তোলপাড় চলছিল। আগেই বলেছি, হুমায়ুন আজাদ ছিলেন বাংলা ভাষার বিশাল এক পণ্ডিত। তিনি এই তত্তে¡র কাঠামোর উপর ভিত্তি করে বাংলা ভাষার বাক্যতত্ত¡ নিয়ে পিএইচডি করলেন। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তার এই পিএইচডি-র বিষয় ছিল Pronominalization in Bengali অর্থাৎ বাংলা সর্বনামীয়করণ। এটি বই আকারে ইংরেজিতে বের হয় প্রথমে ১৯৮৩ সালে। পরে ১৯৮৪ সালে বের করেন বাংলা বাক্যতত্ত্বের বই –বাক্যতত্ত্ব। একই বছরে বের হয় তার সম্পাদিত দুই খণ্ডের গ্রন্থ– বাঙলা ভাষা।বইটিতে বাংলা ভাষার উপরে বিভিন্ন ভাষাবিদ ও পণ্ডিতের লেখা নানা গুরুত্বপূর্ণ রচনা স্থান পায়। বাংলা ব্যাকরণচর্চায় এই তিনটি বইয়ের গুরুত্বই অপরিসীম। পরে ভাষাবিজ্ঞান বিষয়ে তিনি আরও দুইটি বই প্রকাশ করেন তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান ও অর্থবিজ্ঞান।

তার সম্পর্কে বলা হয়, তিনি প্রথাবিরোধী লেখক। কারণটিও স্পষ্ট, তিনি প্রচলিত সব প্রথাকেই তার লেখা দিয়ে আক্রমণ করতেন। আক্রমণ করতেন ধর্মান্ধতা আর মৌলবাদের আড়ালে প্রচলিত জঙ্গিবাদকেও। কাজেই, ধর্মান্ধ-জঙ্গিবাদীরা তার উপরে খুবই ক্ষিপ্ত ছিল। তারই প্রকাশ ঘটে ২০০৪ সালে। সে বছরের অমর একুশে গ্রন্থমেলা চলাকালে হুমায়ুন আজাদের উপর সন্ত্রাসী হামলা হয়। পরে সে হামলার দায়দায়িত্ব স্বীকার করে নেয় জামায়াতুল মুজাহেদীন নামের জঙ্গি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন।

কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর তিনি সে বছরই বৃত্তি নিয়ে জার্মানি যান। জার্মান ভাষার একজন বিখ্যাত কবি হলেন হাইনরিশ হাইনে। তিনি এই হাইনে-র উপরেই গবেষণা করতে যান। কিন্তু জার্মানি যাওয়ার মাত্র ৫ দিনের মধ্যেই, ১১ অগাস্ট ২০০৪ তারিখে মিউনিখ শহরে তিনি মারা যান। পরদিন নিজ ফ্ল্যাটে তার মৃতদেহ পাওয়া যায়।

হুমায়ুন আজাদ রচিত বইয়ের সংখ্যা ৭০-টিরও বেশি। তারমধ্যে শিশুদের বইও আছে অনেকগুলি। শিশুদের জন্য লেখা তার দুটো বই একটু বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য- ‘লাল নীল দীপাবলী বা বাঙলা সাহিত্যের জীবনী’ এবং ‘কত নদী সরোবর বা বাঙলা ভাষার জীবনী’। অন্য বইগুলো হল- ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, আব্বুকে মনে পড়ে, বুকপকেটে জোনাকিপোকা, আমাদের শহরে একদল দেবদূত, অন্ধকারে গন্ধরাজ এবং Our Beautiful Bangladesh।

ছোটবেলায় হুমায়ুন আজাদ কিন্তু শহরে থাকতেন না। তিনি থাকতেন গ্রামে। সে গ্রামের নাম রাঢ়িখাল। রাঢ়িখাল গ্রামটিকে তিনি খুবই ভালোবাসতেন। তার সেই রাঢ়িখাল গ্রামের কথা আর রাঢ়িখালের প্রতি তার ভালোবাসার কথা তিনি তোমাদের জন্য লিখে গেছেন ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’ বইটিতে। বইটির কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃত করা হল, পড়ে দেখতে পারো।

‘মৌলি, তোমাকে বলি, তোমার মতোই আমি একসময় ছিলাম ছোট, ছিলাম গ্রামে, গাঁয়ে, যেখানে মেঘ নামে সবুজ হয়ে, নীল হয়ে লম্বা হয়ে, বাঁকা হয়ে। শাপলা ফোটে; আর রাতে চাঁদ ওঠে সাদা বেলুনের মতো। ওড়ে খেজুর গাছের ডালের অনেক উপরে। যেখানে এপাশে পুকুর ওপাশে ঘরবাড়ি। একটু দূরে মাঠে ধান, সবুজ ঘাস, কুমড়োর হলদে ফুল। একটা খাল পুকুর থেকে বের হয়ে পুঁটি মাছের লাফ আর খলশের ঝাঁক নিয়ে চলে গেছে বিলের দিকে। তার উপর একটি কাঠের সাঁকো। নিচে সাঁকোর টলোমলো ছায়া। তার নাম গ্রাম।’

‘পৌষের কুয়াশায় চুলোর পাড়ে কী যে সুখ! আমার চোখ পড়ে চুলোর ভেতরের দৃশ্যের উপর। চারপাশ তখন স্বাদে ভরা রসের ঘ্রাণ, নারকোলের সুগন্ধ, ঘন দুধের গাঢ় ঘ্রাণ। আর ঐ চুলোর ভেতরে দাউদাউ জ্বলছে সৌন্দর্য। চুলোর ভেতরে কি ফুটেছে একলা গোলাপ? লাল হয়ে উঠেছে কৃষ্ণচূড়ার বাগান? না, চুলোর ভেতরে দাউদাউ জ্বলছে সুগন্ধি আমকাঠের চেলা; আর তার টুকরোগুলো বিশাল দামি হীরকখণ্ডের মতো দগদগ করছে।’

‘গ্রাম মরে যাচ্ছে। গ্রামেরা মরে যাচ্ছে। মরে যাচ্ছে রাঢ়িখাল। ছিল একটি মিষ্টি মেয়ের মতো, খুব রূপসী, চাঁদের মতো। কোন্ মড়কে ধরল তাকে! তার চোখ বসে যাচ্ছে, কালচে দাগ চোখের চারপাশে। সে গোলগাল মুখটি নেই, কেমন শুকনো। এখনি ঢলে পড়ে যাবে যেন। গ্রাম মরে যাচ্ছে। মরে যাচ্ছে রাঢ়িখাল। তার বুকের ভেতর কোন্ অসুখ বাঁধল বাসা? খুঁটেখুঁটে কুরেকুরে খাচ্ছে তাকে কোন্ অসুখ? সে কি একেবারে মরে যাবে? ঢুকবে কবরে? তাকে ঘিরে রাতভর চিৎকার করবে কয়েকটা লালচে শেয়াল?’

‘আমি কত ডাক পারি। তুমি হুমইর দ্যাও না ক্যান? তোমারে ভুলুম ক্যামনে? তুমি ভুইলা যাইতে পার, আমি তা পারুম না কোনো কাল। আমি আছিলাম পোনর বচ্ছর ছয় মাস তোমার ভিৎরে। থাকুম পোনর শ বচ্ছর… রাঢ়িখাল। রাঢ়িখাল। তুমি ক্যান হুমইর দ্যাও না।’

ছোটদের জন্য লেখা হুমায়ুন আজাদের ছড়া-কবিতাগুলো আছে ‘বুকপকেটে জোনাকিপোকা’ বইতে। সে বই থেকে দুটি ছড়া টুকে দিলাম।

ফাগুন

ফাগুনটা খুব ভীষণ দস্যি মাস,
পাথর ঠেলে মাথা উঁচোয় ঘাস।
বাঙলাদেশের মাঠে বনের তলে,
ফাগুন মাসে সবুজ আগুন জ্বলে।
ফাগুনটা যে ভীষণ দুঃখী মাস,
হাওয়ায় হাওয়ায় ছড়ায় দীর্ঘশ্বাস।
ফাগুন মাসে গোলাপ কাঁদে বনে,
কান্নারা সব ডুক্রে ওঠে মনে।
ফাগুন মাসে মায়ের চোখে জল,
ঘাসের ডগায় কাঁপে টলোমল।

ফাগুন মাসে দুঃখী গোলাপ ফোটে
বুকের ভেতর শহীদ মিনার ওঠে।

 

কখনও আমি

কখনও আমি স্বপ্ন দেখি যদি
স্বপ্ন দেখব একটি বিশাল নদী।
নদীর উপর আকাশ ঘন নীল
নীলের ভেতর উড়ছে গাংচিল।
আকাশ ছুঁয়ে উঠছে কেবল ঢেউ
আমি ছাড়া চারদিকে নেই কেউ।

কখনও আমি কাউকে যদি ডাকি
ডাকব একটি কোমল সুদূর পাখি।
পাখির ডানায় আঁকা বনের ছবি
চোখের তারায় জ্বলে ভোরের রবি।
আকাশ কাঁপে পাখির গলার সুরে
বৃষ্টি নামে সব পৃথিবী জুড়ে।

বিডি নিউজ

Comments are closed.