আনিস-তাবিথ সমানে সমান : ফ্যাক্টর মাহী-সাকি

সিটি করপোরেশন এলাকার উত্তর প্রান্তের এক নম্বর অঞ্চলের দুই ওয়ার্ড ১ ও ১৭। উত্তরা ও খিলক্ষেত এলাকার এই দুই ওয়ার্ডে ভোটার সংখ্যা দেড় লক্ষাধিক। সেই ভোটাররা ইতোমধ্যে বিচার করে ফেলেছেন প্রার্থীদের মধ্যে কে ভালো, কে মন্দ। ‘আমার ভোট আমি দেবো, যাকে খুশি তাকে দেবো’- নির্বাচন কমিশনের জনপ্রিয় এ স্লোগান মাথায় রেখে মুখে কুলুপ এঁটেছেন ভোটাররা। তারপরও তাদের কথা আর আলোচনায় বোঝা গেলো, উত্তরের এক নম্বর অঞ্চলের মেয়র পদে লড়াইটা অন্যান্য অঞ্চলের মতো শুধুই আওয়ামী লীগ সমর্থিত আনিসুল হক ও বিএনপি সমর্থিত তাবিথ আউয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কে বেশি এগিয়ে- সে কথা বোঝা না গেলেও, এ কথা স্পষ্ট যে ২৮ এপ্রিলের ‘ব্যালট’ যুদ্ধের প্রধান দুই যোদ্ধা এই দু’জনই। তবে সীমিত হলেও আলোচনায় রয়েছেন মাহী বি চৌধুরী, জোনায়েদ সাকিও। তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় না থাকলেও আনিসুল হক ও তাবিথের বেশকিছু ভোট কেটে নিবেন বলে অনেকের ধারণা।

প্রায় এক সপ্তাহ মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান করে দেখা যায়, মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে আনিসুল হক ও তাবিথ আউয়াল প্রায় সমানে সমানে অবস্থান করছেন। তবে পরিচিত মুখ হওয়ায় প্রচারণার প্রথম দিকে অনেকাংশেই এগিয়ে ছিলেন আনিসুল হক। কিন্তু বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তাবিথের পক্ষে মাঠে নামার পর ভোটার হিসেবে দুই প্রার্থী এখন সমানে সমান।

স্থানীয় এলাকাবাসীরা জানান, প্রথমদিকে তাবিথকে এলাকাবাসী ঠিক মতো চিনতেন না, কিন্তু খালেদা জিয়া মাঠে নামায় তাকে চিনতে শুরু করেছে। সব মিলিয়ে এখানে নির্বাচন হবে আনিসুল হকের সঙ্গে বিএনপির।

আনিসুল হকের পজেটিভ দিক বিবেচনা করতে গিয়ে স্থানীয়রা বলেন, আনিসুল হক বিটিভিতে ‘অন্তরালে’ নামে একটি অনুষ্ঠান উপাস্থপনা করতেন। যে অনুষ্ঠানের ছিল ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা। এর কারণে আনিসুল হকও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। যে জনপ্রিয়তা এখনো বিদ্যমান। সেই সঙ্গে তিনি এফবিসিসিআই ও বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি। ব্যবসায়ী নেতা হিসেবেও তিনি সফল। সেই সঙ্গে তার নামে সেইভাবে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য নেই।

তাবিথ আউয়ালের পজেটিভ দিক বিবেচনা করতে গিয়ে স্থানীয়রা বলেন, তাবিথের মূল শক্তি তার তারুণ্য। তার বাবা আবদুল আউয়াল মিন্টুও আনিসুল হকের মতো ব্যবসায়ী নেতা। সেই সঙ্গে তার পেছনে রয়েছে বিএনপির শক্তি। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া দক্ষিণের প্রার্থী মির্জা আব্বাসের তুলনায় তাবিথের প্রচারণাই বেশি করেছেন। যেটাতে তাবিথের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।

এলাকা ঘুরে জানা যায়, ২৮ এপ্রিলের নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে এলাকায় প্রচারণা চালিয়েছেন দুই প্রার্থী। উত্তরার প্রত্যেকটি সেক্টর, মডেল টাউন, খিলক্ষেত, নিকুঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার অলি, গলি, মাঠ-ঘাট চষে বেড়িয়েছেন। সেই সঙ্গে তাদের পোস্টারেও ছেয়ে গেছে এই দুই ওয়ার্ডের আকাশ।

উত্তরা মডেল টাউন, খিলক্ষেত, কুড়িল, কুঁরাতলী, জোয়ার সাহারা, ওলিপাড়া, জগন্নাথপুরসহ ৭ দশমিক ৫৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়েই ঢাকা উত্তরের এক নম্বর অঞ্চল। যাতে ভোটার রয়েছেন ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪৬৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার রয়েছেন ৯১ হাজার ৪৯৩ জন এবং নারী ভোটার রয়েছে ৭৫ হাজার ৯৭৩ জন।

উত্তরা মডেল টাউন, জসিম উদ্দিন রোড, উত্তরা আওলাদ হোসেন এভিনিউ, ইশা খাঁ এভিনিউ, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, শাহজালাল এভিনিউ, খিলক্ষেত, কুড়িল এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সেখানে ব্যাপকভাবে চলছে ব্যাপক নির্বাচনী প্রচারণা। এলাকার প্রত্যেকটি রাস্তায় ঝুলছে নির্বাচনী পোস্টার ও ব্যানার। সেই সঙ্গে ভোট চাওয়ার জন্য ভোটারদের দরজায় দরজায় ঘুরছেন প্রার্থীরা। যদিও তা শেষ হচ্ছে আজ মধ্যরাত থেকেই। বিগত দিনের নির্বাচনী প্রচারণার পাশাপাশি এবার যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এর মধ্যে ফেসবুক অন্যতম। তরুণ প্রজন্মের কাছে নির্বাচনী দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার জন্য সব প্রার্থী ফেসবুকে সক্রিয় রয়েছেন। সেই সঙ্গে গানে গানেও প্রচারণা চলে উত্তরায়।

১নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আলি ফেরদৌস, খন্দকার মিঠু, আওয়ালাদ হোসেনসহ আরো কয়েকজন ভোটার বলেছেন, আনিসুল হক ও তাবিথ আউয়াল এই প্রার্থীদের কোনো নিজস্ব রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড নেই। ফলে তাদের লড়াইটা হবে সমানে সমান। ভোটগ্রহণ সুষ্ঠুভাবে হলে আনিসুল হকই বিজয়ী হবেন।

তবে তাদের কথায় দ্বিমত পোষণ করলেন ১৭নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা ছাইদুর রহমান, আলী আজম, রনি মোল্লা, সমীর দেবনাথ। তাদের মতে, সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আনিসুল হকের পক্ষে বিজয়ী হওয়া কষ্ট হয়ে যাবে। কারণ হিসেবে তারা বলেছেন, সমাজের উচ্চপর্যায়ে আনিসুল হকের যোগাযোগ থাকতে পারে। কিন্তু আমজনতা তাকে তেমনভাবে চেনে না। আর ভোটাররা নতুন মুখ হিসেবেই তাকে ভোট দিতে পারে বলে তারা মন্তব্য করেন।

তাবিথ আউয়াল সম্পর্কে তাদের বক্তব্য, বাবার পরিচয়েই প্রচারণায় অনেকটাই এগিয়ে। বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তার পক্ষে প্রচারণায় নামায় তার বিজয়ী হওয়ার একটা প্লাস পয়েন্ট। তবে এই দুই প্রার্থীর মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।

আবার উত্তরার তরুণপ্রজন্ম চায় নির্বাচনে মাহী বি. চৌধুরী কিংবা জোনায়েদ সাকি জয়লাভ করুক। কারণ তারা অনেকদিন ধরেই পজেটিভ রাজনীতি করে আসছেন। তারাই মূলত বুঝবেন সাধারণ মানুষের কষ্টগুলো। সে হিসাবে এ অঞ্চলে মোটামুটি ভালোই ভোট পাবেন তরুণ নেতা মাহী ও সাকি।

এলাকাবাসীর প্রধান সমস্যাগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন বেশিরভাগ প্রার্থী। নিজেদের ইশতেহারে দিয়েছেন নানা প্রতিশ্রুতি। তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর বিরোধিতা করে উত্তরা মডেল টাউন এলাকার বাসিন্দা আবু সায়েম, সবুজ উদ্দিন, মিজানুর রহমান বলেন, নির্বাচন আসে নির্বাচন যায়। প্রতিশ্রুতির কোনো বাস্তবায়ন হয় না। এভাবেই বিগত নির্বাচনের বিজয়ীরা পার পেয়ে গেছেন।

তারা যুক্তি দিয়ে বলেন, মেয়র প্রার্থীরা ভুড়িভুড়ি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু এক মেয়াদে তাদের পক্ষে সেটা সম্ভব না। আজ তারা আমাদের ঘরে ঘরে আসছেন, নির্বাচনের পর তাদের দেখাও মিলবে না।

এক নম্বর অঞ্চলের নাগরিক সমস্যা
এলাকার সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে- যানজট, বর্জ্য নিষ্কাষণে অব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা, গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎসহ সব নাগরিক সুবিধার সঙ্কট অন্যতম।

উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের ৪ নম্বর সড়কের অবস্থা বেহাল। রাস্তাটির বিভিন্ন স্থান ভাঙাচোরা। পয়নিষ্কাশনের লাইন ভেঙে যাওয়ায় গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে কিছু স্থানে। যে কোনো সময় ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। এছাড়া উত্তরার ১৪টি সেক্টরের প্রায় প্রতিটির ভেতরের রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা ও খানাখন্দে ভরা। সিটি করপোরেশনের কাছে ধরণা দিয়েও প্রতিকার পাচ্ছেন না স্থানীয় বাসিন্দারা।

উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের ৮ নম্বর রাস্তার কথাই ধরা যাক। একেবারে ব্যস্ত এই রাস্তাটির মাঝখানে বড় গর্তটি মৃত্যুফাঁদ হয়ে আছে প্রায় ছয় মাস ধরে। নর্দমার ওপরে সিমেন্টের তৈরি বড় ঢাকনা ভেঙে গিয়ে এ অবস্থার সৃষ্টি। বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনাও ঘটেছে।

ঢাকা উত্তর সিটির ১নং ওয়ার্ডের উত্তরা আওলাদ হোসেন এভিনিউ। এ পথে ঢুকতেই ময়লা আবর্জনার স্তুপ। রাস্তার অর্ধেক জুড়েই ভাঙা। এবং ময়লা পানি জমে মশার বংশবিস্তার করছে। এরপর উৎকট গন্ধতো রয়েছেই। এ রাস্তা দিয়ে পথচারিদের নাক চেপে চলাচল করতে হয়।

এলাকার বাসিন্দা মির্জা খাদেম জানান, এই রাস্তাটি সংস্কারের জন্য অঞ্চল-১ এর প্রশাসকের কাছে আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু তিনি নজর দেননি। ফলে ময়লা দুর্গন্ধ উপেক্ষাই আমাদের চলাচল করতে হচ্ছে।

আওলাদ হোসেন এভিনিউর দক্ষিণে ইশাখা এভিনিউ, রাজউক উত্তারা মডেল কলেজ ও শাহজালাল এভিনিউ এলাকার রাস্তাঘাটেরও একই চিত্র। পুরো রাস্তা জুড়েই খানা-খন্দ আর ময়লা আর্বজনা।

ঢাকা উত্তর সিটির ১৭নং ওয়ার্ড। গলির রাস্তা সরু। সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িও সব রাস্তায় ঢুকতে পারে না। ময়লা আবর্জনা ফেলা হয় গলির মোড়ে। আর এটা নিয়ে বাসিন্দাদের মধ্যে মনোমালিন্য লেগেই থাকে। প্রতিদিন বসাতে হয় সালিশ বৈঠক।

এছাড়া সড়কে লাইট পোস্ট না থাকায় প্রায়ই ঘটে ছিনতাইয়ের ঘটনা। সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তায় জমে যায় পানি। আছে সুপেয় পানির সমস্যাও। প্রার্থীরা এসব ইস্যুকে গুরুত্ব দিয়ে সেরে নিচ্ছেন প্রচারণা। ওয়ার্ডের বাসিন্দারা বলেছেন, আবর্জনার সমস্যা থেকে সকল সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। এই সমস্যার সমাধান যে প্রার্থী দিতে পারবেন আমরা সমর্থন দেবো তাকেই।

ঢাকার অভিজাত ওয়ার্ড ১৭ নম্বরে রয়েছে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা এবং একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এই ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত এলাকাগুলো হলো- নদ্দা, জোয়ার সাহারা, কুড়িল, কুড়াতলী, খিলক্ষেত, মোল্লা পাড়া, খাঁ পাড়া ও নিকুঞ্জ। এই ওয়ার্ড থেকে ১৮ জন কাউন্সিলর প্রার্থী নির্বাচন করছেন। এসব প্রার্থীদের বেশির ভাগ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত আছেন বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন। এই ওয়ার্ডের মোট ভোটার ১ লাখ ৪ হাজার ৩৪০ জন। পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ৫৬ হাজার ৫৩১ জন এবং নারী ভোটারের সংখ্যা ৪৭ হাজার ৮০৯ জন। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বহিরাগত ভোট ব্যাংক যেই প্রার্থীর দিকে যাবে তার নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

বাংলামেইল

Comments are closed.