রত্নসম্পদ : ইদ্রাকপুর কেল্লা

মুন্সিগঞ্জ শহরে অবস্থিত ঐতিহাসিক ইদ্রাকপুর কেল্লা l ছবি: প্রথম আলোনদীবেষ্টিত রাজধানী ঢাকা। মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের কবল থেকে নগরটিকে সুরক্ষিত রাখতে মোগল আমলে ইছামতী নদীর তীরে নির্মাণ করা হয় ইদ্রাকপুর কেল্লা বা দুর্গ। ইছামতী ও মেঘনার সঙ্গমস্থলে দুর্গটি তখন সামরিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ধারণা করা হয়, এটির নির্মাণকাল বাংলার মোগল সুবাদার মীর জুমলার শাসনকালে (১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দ)।

৩৫০ বছরের বেশি পুরোনো স্থাপনাটির অবস্থান বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলা সদরে। কালের পরিক্রমায় সেই ইছামতীর গতিপথ পাল্টে গেছে। তবে দুর্গটির এক থেকে তিন কিলোমিটারের মধ্যে ধলেশ্বরী, মেঘনা ও শীতলক্ষ্যা নদী এখনো বহমান। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সম্প্রতি ইদ্রাকপুর কেল্লা সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। সে পরিকল্পনা অনুযায়ী, দুর্গের ভেতরে জাদুঘর ও সংস্কৃতিকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। প্রথম ধাপের কাজও ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আর দ্বিতীয় ধাপের কাজ শুরুর প্রক্রিয়াও প্রায় চূড়ান্ত।

জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রকাশিত মুন্সিগঞ্জের ইতিহাস (২০০৩) বইয়ে দুর্গটি সম্পর্কে লেখা হয়েছে, বারভূঁইয়াদের দমনের উদ্দেশ্যে এবং ঢাকাকে জলদস্যুদের কবল থেকে রক্ষার জন্য সুবাদার মীর জুমলা ১৬৬০ সালে ইদ্রাকপুর দুর্গ নির্মাণ করেন। ধারণা করা হয়, এ দুর্গকে ঘিরেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে মুন্সিগঞ্জের বসতি। স্থাপনাটি থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে ইদ্রাকপুর নামে একটি এলাকাও রয়েছে।

মুন্সিগঞ্জ শহরে অবস্থিত ঐতিহাসিক ইদ্রাকপুর কেল্লা

১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের সময় মোগলদের পতন হলে ইদ্রাকপুর দুর্গটি ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯০৯ সালে ব্রিটিশ ভারতে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ কর্তৃপক্ষ ইদ্রাকপুর দুর্গটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। পরবর্তী সময়ে মহকুমা গঠিত হওয়ার পর প্রশাসকেরা ইদ্রাকপুর দুর্গকে বাসস্থান হিসেবে ব্যবহার করে আসছিলেন। জেলা প্রশাসকেরাও একই ধারা অনুসরণ করেন। একপর্যায়ে দুর্গটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়লে জেলা প্রশাসকদের জন্য নতুন বাংলো নির্মাণ করা হয় এবং দুর্গের ওপরে নির্মিত বাংলোটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর গত বছর দুর্গটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ইট নির্মিত চার কোনা দুর্গটি উত্তর-দক্ষিণে প্রসারিত এবং এর দৈর্ঘ্য ৮৬.৮৭ মিটার ও প্রস্থ ৫৯.৬০ মিটার। দুর্গটির গায়ে বন্দুকের গুলি চালানোর উপযোগী ফোকর আছে। লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো, ড্রামের পাদদেশে ভূগর্ভস্থ একটি কুঠুরি এবং কুঠুরিতে অবতরণের জন্য নির্মিত সিঁড়ি। জনশ্রুতি আছে, সিঁড়িটি ছিল একটি গোপন সুড়ঙ্গপথের অংশ, যার মধ্য দিয়ে দুর্গে অবস্থানকারীরা কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদ আশ্রয়স্থলে সরে যেতে পারত। আসলে সিঁড়িটি ছিল ভূগর্ভস্থ একটি গোপন কক্ষে অবতরণের পথ। আর কক্ষটি ছিল অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুত রাখার গুদামঘর।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ঢাকা অঞ্চল কার্যালয় সূত্র জানায়, প্রথম ধাপে দুর্গ সংস্কার ও জাদুঘর নির্মাণের জন্য ৫৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ২০১৩ সালের জুন থেকে ২০১৪ সালের জুনের মধ্যে ওই অর্থ ব্যয় করা হয়। এ কাজের অংশ হিসেবে দুর্গের ওপরের বাংলোটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। সেখানে আঞ্চলিক সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। জাদুঘর স্থাপন ও সংস্কারের বাকি কাজের জন্য দ্বিতীয় ধাপে পাঁচ লাখ টাকার আরেকটি প্রকল্প নিয়েছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। সেই প্রকল্পটি এখন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, দুর্গের প্রাচীরে চুন-সুড়কি দিয়ে রং করার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পশ্চিম-দক্ষিণ কোণে অবস্থিত পুরোনো জেলখানা ভবনে জাদুঘর স্থাপনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। দুর্গের ভেতরে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার কার্যালয় ও তাদের কর্মচারীদের থাকার জন্য ছোট ছোট নির্মিত ঘর সার্বিক সৌন্দর্য নষ্ট করছে। বাইরে প্রধান ফটকের পাশে পৌরসভার নির্মিত শৌচাগারটি দুর্গের সৌন্দর্যে আরও একটি বড় অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, দুর্গের ভেতরে ও বাইরে শৌচাগার, ডাকবাংলো, কার্যালয়সহ যেসব স্থাপনা আছে এগুলো সরিয়ে নেওয়া উচিত। কারণ এগুলো দুর্গের সৌন্দর্য বিনষ্ট করছে।

এদিকে জাদুঘরের নাম কী হবে, এখনো ঠিক হয়নি। তবে মুন্সিগঞ্জ জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মতিউল ইসলাম ও সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এম এ কাদেরসহ স্থানীয় অনেকের প্রস্তাব, প্রতিষ্ঠানটির নাম হোক ‘মুন্সিগঞ্জ প্রত্নতত্ত্ব জাদুঘর’।

তানভীর হাসান – প্রথম আলো

Comments are closed.