আমার জীবনে একটা বড় ক্ষতির উপলক্ষ হ্ল মমতাজ

শাহ আলম সরকার যুগপৎ গীতিকার ও শিল্পী। ‘আকাশটা কাঁপছিল ক্যান’-এর মতো আধ্যাত্মিক গান যেমন লিখেছেন, তেমনি লিখেছেন ‘বুকটা ফাইট্টা যায়’। তার গেন্ডারিয়ার বাড়িতে বসে তার সঙ্গে গান ও আরাধনার নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন মোহাম্মদ রোমেল

প্রশ্ন : আপনার দেশের বাড়ি কোথায়?

শাহ আলম সরকার : আমার গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার কুড়িগাঁও গ্রামে।

প্রশ্ন : আপনি কিভাবে এ গান লেখালেখি বা ভাবচর্চার মধ্যে এলেন?

সরকার : আমি পারিবারিকভাবেই সঙ্গীতটাকে পাইছি। আমার দাদা গান করত। নামকরা শিল্পী ছিল। গোলাম আলী ব্যাপারী।

প্রশ্ন : উনি কি ধরনের গান করতেন?

সরকার : উনি বৈঠকী ভাবগান করতেন। তার পর আমার চাচা আবদুর সাত্তার মুহন্থ ‘আমি ত মরে যাব রেখে যাব সবই’ এই গানটা যিনি লিখছেন, তিনি আমার আপন চাচা। আমি আমার দাদাকে পাই নাই কিন্তু এই চাচাকে পাইছি। আমার বড় চাচাও গান করত। তারপর আমার এক ফুফা বাউল সাধক আবদুল করিম। সিলেটের আবদুল করিম না। উনি নারায়ণগঞ্জ থাকেন। মুহন্থ চাচা মারা গেছেন মাস চার-পাঁচ হয়। কাজেই পারিবারিকভাবেই গানের পরিবেশ পাইছি। আমার চাচা গান লিখতেন। সেটা দেখে গান লেখার প্রতি আগ্রহ জন্মে। মনে হতে থাকে চাচা লিখতে পারলে আমি পারব না কেন? এটা খুব ছোটবেলার কথা, ৮/১০ বছর বয়সের কথা। এসব কারণে আমার পড়ালেখা হয় নাই। এ দেশের মানুষ জানে না যে, আমি আক্ষরিক অর্থেই মূর্খ।

প্রশ্ন : স্কুলে না যাওয়ার কারণটা আরেকটু ব্যাখ্যা করবেন?

সরকার : স্কুলে যাওয়া বন্ধ হওয়ার কারণই হলো আমার সঙ্গীত। রাতভর গান-বাজনা হয়। আর যেদিকে গান সেদিকেই আমি। এ সময়ে বিভিন্ন শিল্পীরা গান শুনেছি : আবুল সরকার, পরণ আলী দেওয়ান, শামসু দেওয়ান, আবদুল হালিম বয়াতি, আলাউদ্দীন বয়াতি, রজ্জব আলী দেওয়ান, মালেক দেওয়ান, খালেক দেওয়ান, আমাদের বিক্রমপুর এলাকায় এদের সবার গানের আসর হইত। এদের গান মানে রাতব্যাপী। সারা রাত গান শোনার পর আর স্কুলে যাওয়া হইত না। গান শুইনা স্কুলে যাওয়া সম্ভব না। আসলে পড়ালেখার চেয়েও আমার নেশা ছিল গানের দিকে। আমি কোনটাকে বেছে নিব? শেষে গানের নেশা যখন প্রকট হইয়া দাঁড়াইল, আর পড়ালেখা হয় নাই।

প্রশ্ন : ওই সব গানকে কি গান বলে?

সরকার : পালা গান। বিচার গানও বলে। এক এক এলাকায় এক এক নামে ডাকে। তবে কবি গান থেকেই আমাদের পালা গানটা আসছে। এসব গান শুনতে শুনতে মনে হইত, আমিও একদিন গাইতে পারব। এটা এমনই নেশাÑ যে পালা গান বা বিচার গান শুনছে সে ছাড়া অন্য কেউ বুঝবে না।

প্রশ্ন : এই নেশার ব্যাপারটা আরেকটু খুলে বলবেন?

সরকার : না। এটা খুইলা বলার মতো ভাষা আমার নাই। কোনো নেশাই ব্যাখ্যা করার মতো ভাষা নাই। এটা এমনই নেশা যে, পৃথিবীর সমস্ত সুখের ঊর্ধ্বে এই নেশাটা।

প্রশ্ন : গানের আসল শুরুটা কিভাবে হলো?

সরকার : আমার চাচা যখন লিখত তখন আমিও উনাদের মতো লেখার চেষ্টা করতাম। আমি যখন লেখা শুরু করি তখন কখনও ভাবি নাই যে আমার গান কেউ কোনোদিন শুনবে, বা সমাজে সমাদৃত হবে। এটা আমি কখনও ভাবি নাই। আমি আস্তে আস্তে চাচাদের গান গাইতে শুরু করলাম। অন্যান্য সাধু/মহতিদের গানও গাইতাম। আমার গান করতাম না। ভাবতাম আমারটা করলে মানুষ শুনবে না। একটা সময়ে এসে অন্যান্য গান গাওয়ার পাশাপাশি একটু একটু করে আমার গান গাইতে গাইতে দেখলাম যে শ্রোতারা আমার নতুন গান আগ্রহ করে শুনছে। তখন থেকে গান লেখার আগ্রহটা আরও বেড়ে গেল।

প্রশ্ন : পরিবারের বাইরে আলাদা করে কোনো ওস্তাদ ধরেননি কখনও?

সরকার : ধরছি, পরবর্তী সময়ে যখন মনে হইল আমার একজন ওস্তাদের দরকার তখন আমি ফতুল্লার আবুল সরকারের কাছে গেলাম তালিম নেয়ার জন্য।

প্রশ্ন : তখন আপনার বয়স কত ছিল?

সরকার : ১৫/১৬ বছর। আমার ওস্তাদের লেখা ক্ষুরদার। খুব ভালো লেখেন এবং গাইতেনও খুব ভালো। একটা গান লেখার ক্ষেত্রে, সুর দেয়ার ক্ষেত্রে যা যা করতে হয় বেশির ভাগটাই তার কাছ থেকে আমার পূরণ হইছে। একটা গানে নতুন সুর কিভাবে দিতে হয়। নতুন গান কিভাবে তৈয়ারি করতে হয় মূলত তার থেকেই হাতে-কলমে শিখছি। ওটাই ছিল আমার শিখার পর্ব। তবে তার সাথে আমি বেশিদিন ছিলাম তা না। উনার বিখ্যাত গান যেমন ধরেন, ‘আমার ঘুম আসে না রে একা ঘরে শুইলে’, ‘মানুষ মানুষের নীতি ভুলেছে…’ এ রকম অসংখ্য গানের রচয়িতা।

প্রশ্ন : তার মানে আপনার গানের শিক্ষা চাচা, নানা, বিভিন্ন সাধু আর ওস্তাদ আবুল সরকার?

সরকার : বাউল গান, আর পালা গান যাই বলা হোকÑ এইটার তো কোনো একাডেমি নাই। এই গান আসলে সারা দেশের। শুধু লালনের জন্য একটা একাডেমি করা হইছে তাও সেই কুষ্টিয়ায়। না? আর কোনো একাডেমি নাই। পালাগান-টান যারা লিখবে তারা খুব ছোটবেলা থেকে এভাবেই শেখে।

প্রশ্ন : তার মানে অন্যদের গান গাইতে গাইতে, সাধুদের গান শুনতে শুনতে আপনার নিজেরও শুরু?

সরকার : হ্যাঁ, আমি গান করতে শুরু করলাম। দেশের বিভিন্ন এলাকায়, মানুষের মধ্যে পরিচিত হতে শুরু করলাম। একটা সময় গিয়ে পরিচয় হলো মমতাজের সাথে। মমতাজও কিন্তু আমাদের মতো পালাকার।

প্রশ্ন : কত সালে পরিচয়?

সরকার : এটা হইলো ১৯৯৭-৯৮’র দিকে।

প্রশ্ন : মমতাজ আপনার সিনিয়র নাকি জুনিয়র?

সরকার : মমতাজ আমার বয়সে ছোট। সেও গান করে খুব ছোট বেলা থেইকা। আমি ছোট বেলা থেকে গান করি, সেও ছোট বেলা থেকে গান করে। মমতাজের তখুনি অডিও মার্কেটে খুব চাহিদা ছিল। আমি তখন বাউল ঘরানারই কিন্তু একটু আলাদা গান লেখার চিন্তা করতাম।

প্রশ্ন : কি রকম?

সরকার : যেমন মনে করেন, ‘পাঞ্চার হইয়া গেলে চলবে না আর গাড়ি।’ বাউল ঘরানার গান। কিন্তু একটু অন্য রকম। একটু মডার্ন টাইপের। হ্যাঁ, আধুনিক।

প্রশ্ন : ভাবটা বাউল কিন্তু ভাষাটা মডার্ন। এরকম চিন্তা আপনার আগে থেকেই ছিল?

সরকার : হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমার গানগুলা শোনার পর মমতাজ খুব তাগিদ দিত, ভাই আপনার গানগুলা দেন। আমি একটা ক্যাসেট করি।

প্রশ্ন : তখনো আপনার কোনো গান ক্যাসেট হয় নাই?

সরকার : না না তখনই আমার গান নিয়া ক্যাসেট হইছে। কিন্তু এ ধরনের গান দিতাম না। এই ধারার না।

প্রশ্ন : কোন গান দিতেন?

সরকার : ওই যে আমি যে গান করি। পালা গান। কারণ আমার চিন্তা ছিল ওই ধরনের গান আমার কণ্ঠে জনগণ খাবে না। আবুল সরকারের সাথে, আরও বিভিন্ন শিল্পীর সাথে আমার ক্যাসেট ছিল। কিন্তু আপনার এই মডার্ন ফোক ধরনের কোনো গান তখন আমার মার্কেটে আসে নাই।

প্রশ্ন : মডার্ন ফোক মানে কি?

সরকার : মডার্ন ফোক বলতে আমি বুঝি বাউল গানের মধ্যে কিছু কিছু গান আছে। মডার্ন ইনস্ট্রুমেন্ট দিয়ে গাওয়া। অরজিনালি ওইগুলা ফোক গানই।

প্রশ্ন : আপনি একেই মডার্ন ফোক বলতেছেন?

সরকার : একটু আলাদা আর কি? বাউল গানের মধ্যেই আলাদা যেমন : ঠন ঠনা ঠন জীবন ঘণ্টা/যার যেদিন উঠিবে বেজে। যেতে হবে/ঘরাতে জে বুঝেও তা বুঝে না যে/সা আলমের পাগল মনটা।/ঠন ঠনা ঠন জীবন ঘণ্টা। এরকম, হ্যাঁ এটা একটু আলাদা, বাউল গানের চেয়ে একটু আলাদা।

প্রশ্ন : মর্ডান ফোকের শুরুটা কারা করল বাংলাদেশে প্রথম?

সরকার : ব্যান্ড যারা করে। এরা আমাদের গানটাই বিকৃত করে।

প্রশ্ন : কি রকম?

সরকার : যেমন মনে করেন ‘তাই বুঝি আজ বুক ভেসে যায় নয়নের জ্বলে আমায় কাঁদালে। ভালোবাসি বলেরে বন্ধু আমায় কাঁদালে।’ এটা হলো আমাদের বাউল সুরে গাওয়া গান। একদম খাঁটি বাউল সুরের গান। এই সুরে যখন গানটা করা হয় তখন মানুষ একেবারে নিশ্চুপ হয়ে শোনে এবং চোখ দিয়ে পানি পড়ে তাদের। কিন্তু এই গানটা যখন ব্যান্ডঅলারা করে তারা দেখলামÑ ‘ভালোবাসি-বলে-রে-বন্ধু-আমায়-কাঁদালে’ বলে সুর এমন বিকৃত করে, সুরটাকে চেঞ্জ করে এমন আলাদা করে ফেলে, যা আর ভাবের জগতে, মনে নাড়া দিতে পারে না।

প্রশ্ন : তার মানে ভাষাটা আছে, ভাবটা আর নাই?

সরকার : হ্যাঁ, সুর তো একটা বিশাল ব্যাপার। কথার সাথে যদি সুরের সঠিক সমন্বয় না হয়, তা হলে ভাবটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। মানে ভাবের বিপর্যয় ঘটবে। আমি আপনাকে রাগানোর জন্য একটা বকা দেব, আবার ভালবাসার জন্যও একটা বকা দেব, দুইটার সুর কিন্তু এক রকম হবে না। এরকম চিন্তা ধারা থেকেই আমি একটু অন্য রকম গান করি। ওই চিন্তা ধারার গানেই আমার বুকটা ফাইট্টা যায়। ‘বুকটা ফাইট্টা যায়’ এইটা কিন্তু আমার গান।

প্রশ্ন : কত সালের গান এটা?

সরকার : কত হবে? ২০০০ সাল।

প্রশ্ন : ‘বুকটা ফাইট্টা যায়’ আপনার আগে কেউ এ রকম গান করেছে?

সরকার : আমার আগে না। লিখত। কিন্তু আমার মতো করে লিখত না। যেমন হাসান মতিউর রহমান তার মতো করে লিখত।

প্রশ্ন : ওনার সঙ্গে আপনার মডার্ন ফোকের পার্থক্য কি?

সরকার : হাসান মতিন ভাই প্যারডি করত। বিভিন্ন গানের অনুকরণ করে, অনুসরণ করে প্যারডি করত।

প্রশ্ন : তা হলো আপনার গানের সঙ্গে মূল পার্থক্য হলো চিন্তাগত অর্থে?

সরকার : আমি বাউল থেকে গান তুলে আনতাম। আধ্যাত্মিক কথা থাকে। আর সেটাকেই উপস্থাপন করি মডার্ন আঙ্গিকে। যেমন : ‘তিরিশ বছর বয়স তোমার ভাবছ মনে মনে, ষাট বছরের বাবা থাকতে তুমি মরবে কেনে? নাই গ্রান্টি সামনে তুমি বাঁচবে এক সেকেন্ড, ও মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড, এই বুঝি তোর আইল ওয়ারেন্ট’। হ্যাঁ আমার কথা কিন্তু আধ্যাত্মিক। কিন্তু সুরটা, এর ধরনটা একটু অন্য রকম।

প্রশ্ন : তার মানে এ সময়ে গান শোনাইতে হলে, এমন ভাষা করতে হবে?

সরকার : এখনকার শ্রোতা আগের শ্রোতার মতো নাই।

প্রশ্ন : সেটা কি অর্থে?

সরকার : দেখেন আগে কঠিন কঠিন গান শ্রোতারা বুঝতো। এখনকার শ্রোতারা বোঝে না। এরা ভাষাই বোঝে না। যেমন মনে করেন ‘ঘরের কোনায় কুনি ব্যাঙ্গে সাপ ধরিয়া আহার করে, দেগ গা নিজের ঘরে গিয়া দেগ দা নিজের ঘরে গিয়া।’ এখনকার শ্রোতারা কয় এটা কি গান। এটা কি বুঝাইছে? আগের শ্রোতাদের এটা বুঝাইয়া দিতে হতো না। এরা বুঝতো। এটার লক্ষ্যটা কি, কোন ভাবের উপরে এটা করা হইছে। এখন আক্ষরিকভাবে সবাই শিক্ষিত হইছে কিন্তু জ্ঞানের শিক্ষায় শিক্ষিত কম। আগের দিনে যারা আমার গানটা শুনতো তারা জ্ঞানের শিক্ষায় শিক্ষিত ছিল। তাদের জ্ঞানটা ওই পর্যায়ের ছিল। আপনি এখন গান শুনছেন একদিন। আর আগের দিনে গান মানুষ শুনতো ছোটবেলা থেকেই; শুনতে শুনতে তারা এই গানের উপরে জ্ঞান অর্জন করতো। ফলে এই গান যেভাবেই যে কোনো জায়গায় গাওয়া হইতো সেটা বুঝতো। এখন আপনি শুনতেছেন বছরে একদিন। যার জন্য আপনি বুঝতেছেন না।

প্রশ্ন : তার মানে এখনকার যারা শ্রোতা তার ভাবটা বোঝে না। তাদের বোধগম্য করে আপনি এখন গান করেন?

সরকার : হ্যাঁ, তাদের জন্য এই গান।

প্রশ্ন : মানে মডার্ন ফোক?

সরকার : মডার্ন ফোক।

প্রশ্ন : এমন কতগুলো গান আছে যেমন ধরেন, ‘ও টুনির মা তোমার টুনি কথা শোনে না’ বা যেমন ধরেন, ‘একটা বোরকা পরা মেয়ে আমায় পাগল করেছে’, এ গানগুলো কোন ক্যাটাগরির গান?

সরকার : এগুলো মতি ভাই, হাসান মতিউর রহমান ভাই করে।

প্রশ্ন : এই গানগুলো কি মডার্ন ফোক না?

সরকার : চটুল, চটুল গান।

প্রশ্ন : মডার্ন ফোক মানে আধ্যাত্মিকতা থাকতে হবে?

সরকার : আধ্যাত্মিকতা থাকতে হবে। যেমন মমতাজ আগে বাউল গান করতো। যেমন ধরেন ‘দয়াল আমার এই পথ দিয়া আসবে রে আমি সদায় থাকি পন্থের দিকে চাইয়ারে’ এ গান যখন মমতাজ করতো তখন মমতাজরে মাটির মানুষরাই চিন তো। কিন্তু যখন ওই যে আমার রঙের বাজারমাত করলো…

প্রশ্ন : প্রথম কাজ কি আপনার ‘রঙের বাজার’?

সরকার : রঙের বাজার।

প্রশ্ন : সব গান কি আপনার লেখা ছিল?

সরকার : সব, সব। তার পর করলাম ‘প্রাণো পাখি’ ওটার মধ্যে আবার ওই যে ‘বুকটা ফাই্ট্টা যায়, বুকটা ফাইট্টা’ আরও কি কি গান করছিলাম আমার তো মনেও নাই। গানগুলো খুব হিট করছে।

প্রশ্ন : এবার একটু অন্য কথায় আসি, আচ্ছা বিচার গানের সঙ্গে বিচ্ছেদী গানের কি কোনো সম্পর্ক আছে?

সরকার : একেবারে অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পর্ক। বিচার গানের একটা অংশজুড়েই আছে বিচ্ছেদ গান। বিশাল একটা অংশজুড়ে আছে। আমরা রাত দুইটার পরে গিয়ে যখন বিচ্ছেদ গান শুরু করি, তখন শ্রোতারা মুখিয়ে থাকে ওই বিচ্ছেদ গান শোনার জন্য।

প্রশ্ন : আপনি তো বিচ্ছেদী গান লিখছেন।

সরকার : হ্যাঁ, আমার বিচ্ছেদী গান আছে অনেক। রঙের বাজার ২০০০ সনে, তার আগে আমার গান লেখার সংখ্যা একেবারেই কম। সর্বমোট একশত। তখন মমতাজকে দিয়ে ওই গানটা ক্যাসেটে বের করি। ওই অ্যালবামটা ক্লিক করার পর আমার গানের চাহিদা বাইড়া যায়। এ কারণে লেখাও বাইড়া যায়। মমতাজের ৭০/৭২টা অ্যালবাম আমার করা।

প্রশ্ন : ৭২টা অ্যালবাম?

সরকার : হ্যাঁ।

প্রশ্ন : এটা কত বছরে?

সরকার : এই তো দশ বছরে।

প্রশ্ন : দশ বছরে আপনার ৭২টি অ্যালবাম বেরিয়েছে। সর্বমোট তাহলে গান কতগুলো বেরিয়েছে আপনার?

সরকার : গান প্রায় আড়াই হাজারের মতো আছে। মমতাজ ছাড়া অনেকেই গাইছে। বাংলাদেশের এমন কোনো শিল্পী নাই যে আমার গান করে নাই?

প্রশ্ন : মমতাজ ছাড়া বিখ্যাত আর কারা আপনার গান গাইছে?

সরকার : যেমন ফিল্মের মধ্যে রুনা আপা আছে, সাবিনা আপা আছে, এন্ড্রুদা, তারপরে ডলি সায়ন্তনী, পলাশ, রিজিয়া, তারপর মনির খান, এরকম আমি বলে শেষ করতে পারবো না। যেমন এটা বিখ্যাত ছবি ‘মওলা বাড়ির বউ’ সব গান আমার লেখা।

প্রশ্ন : তাই নাকি?

সরকার : ‘খর কুটার এক বাসা বাঁধলাম বাবুই পাখির মতো এই হৃদয়ের ভালো বাসা দিলাম আছে যত। ময়না পাখি কত যতেœ পুষে রাখি। পাখি যেন উইড়া না যায় কোন খানে।’ এটা মওলা বাড়ির গান।

প্রশ্ন : আচ্ছা বাংলাদেশে যারা পালাগান করতাছে বা করতেছে এদের মধ্যে আপনার বিচারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারা?

সরকার : আবুল সরকার।

প্রশ্ন : আবুল সরকার ছাড়া?

সরকার : আবুল সরকার ছাড়া গায়ক ছিল আমি যাকে সবসময় মূল্যায়ন করতাম, সে রশিদ সরদার।

প্রশ্ন : উনি কে ছিলেন?

সরকার : মমতাজের স্বামী ছিল। ওনি খুব আধ্যাত্মিক জ্ঞানী ছিল।

প্রশ্ন : আপনার কোনো বই কি আছে?

সরকার : না আমার কোনো বই নাই। আমার বই এখনো বের হয় নাই। ইনশাল্লাহ হবে।

প্রশ্ন : মমতাজের কারণে এক অর্থে আপনি, আপনার গান সারা দেশে ছড়িয়ে গেছে।

সরকার : আমাকে সারা দেশে ছড়ায়ে দিছে মমতাজই। অনেকে জানেও না আমি যে পালা গান করি। মমতাজের গানেই আমার পরিচিতি। এই মমতাজ আমার বড় ক্ষতি করছে।

প্রশ্ন : কি রকম?

সরকার : আমার জীবনের একটা বিরাট ক্ষতি। কারণ মমতাজের লেখক পরিচয় হইলো পরে, আগে আমার জীবনের মূল হইলো পালা গান। বিচার গান। কিন্তু সেখান থেকে এই মমতাজ এমন একটা পরিচয় আমায় আইনা দিছে যা আমার কোনো পালা গান না।

প্রশ্ন : কি বলেন?

সরকার : আমি তো এইটা চাই নাই।

প্রশ্ন : আপনি চেয়েছিলেন পালাকার হিসেবে পরিচিত হইতে?

সরকার : এইটাই আমার জীবন। এইটাই আমার পরিচয়।

প্রশ্ন: এটাকে এত গুরুত্বপূর্ণ কেন মনে করছেন, আপনি খ্যাতি পেয়েছেন…।

সরকার : এটা তো আমার রক্তে মিশে আছে। মমতাজের জন্য হইলো ধরেন, আমার অবসর সময়ের করা কাজ।

প্রশ্ন : সেটা আনন্দের কাজ ছিল না?

সরকার : হৃদয়ের কাজ না আনন্দের কাজ? আসলে ওসব হৃদয় থেকে করি নাই। মমতাজ চাইছে। চাহিদার কারণে করছি। এতো এতো গান করছি আমি চাহিদার কারণে, কিন্তু আমার জীবন হলো পালা গান। জীবন-মরণ যা আছে সবই হইলো পালা গান। কিন্তু সেই পরিচয়টা আমার একেবারে হারায়া ফেলাইছি। ওর কারণে অনেকে জানেই না আমি যে গান করি।

প্রশ্ন : আমরাও জানতাম যে আপনি গান লেখেন।

সরকার : ঐ তো! অনেকেই জানে না আমি গান করি।

প্রশ্ন : তো এ থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় পাইছেন?

সরকার : আমার নিজের ৬৫০টা অ্যালবাম। নিজের করা নিজের গাওয়া।

প্রশ্ন : আপনার নিজের করা, নিজের গাওয়া। আপনার ৬৫০টি অ্যালবাম? আপনার অ্যালবামগুলো হিট হয়েছে?

সরকার : হিট, সুপার হিট। এই তো এখনো যেটা হিট করছে মমতাজের সঙ্গে পালা গান ‘হাসরের বিচার-কিয়ামতের আলামত, শরীয়তের আইন মারফতের আলামত’। এই দুটো পালাতো সারা দেশে সুপার হিট।

প্রশ্ন: আপনাকে তাহলে অন্য দিক থেকে প্রশ্ন করি, কি ধরনের বিক্রি হলে হিট হইছে বোঝেন?

সরকার : এর মনে করেন কোনো লেখা ঝোকা নাই।

প্রশ্ন : অনুমান?

সরকার : সারা দেশের মানুষ জানবে, কিনবে সারা দেশের মানুষ, আপনি যেখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করবেন, বাংলাদেশের যে কোনো জায়গায় গিয়ে জিজ্ঞেস করবেন শাহ্্ আলম সরকার আর মমতাজের এই অ্যালবামটা কি আপনারা শুনছেন? একটা গ্রাম থেকে যদি বলেন, শতকরা দশজন বলবে যে আমরা শুনছি। আর এটাই হিট। ওই যে ৫০ হাজার পিস গেল, ১ লাখ বিক্রি হইলোÑ ওইটাকে আমরা হিট কইনা।

প্রশ্ন : আচ্ছা লোকজন কি বলতেছে ওটাই আসল ব্যাপার?

সরকার : হ্যাঁ, সারাদেশে ছড়াইলো কিনা, ওইটা হইলো হিট। আর এমনেতে যারা মডার্ন গান করে। ব্যান্ডের গান করে ৫০ হাজার পিস মাল গেলে এরা কয় হিট। আর আমাদের এসব চলে হইলো নীরবে। বুঝলেন এরা মিডিয়ার ধার ধারে না। আপনি একটা লিখছেন, শুনছেন, কিনবো, শুনবো, এইখানেই শেষ। আমাদেরটা আলাদা, আমাদের সব কিছু আপনার গ্রাম-গঞ্জের মানুষ।

প্রশ্ন: মিডিয়ার বাইরে অন্য মিডিয়া?

সরকার : হ্যাঁ, অন্য মিডিয়া। একটা উদাহরণ দেই, ইদানীং আমার একটা গান হিট করছে এইটা হইলো, ‘ও আমি করি নাই করি নাই, করিতে পারি নাই, পিতা-মাতার খেদমত করিও আমার মন…’

প্রশ্ন : এই গানটা সুপার হিট হইছে?

সরকার : এই গানটা সুপার হিট হইছে।

প্রশ্ন : গানের টানে ঘরের বাইর হইছেন? যেমন মাজারে বা আখড়া?

সরকার : আমরা তো এই ছোটবেলা থাইকা প্রতিদিন মাজারে মাজারে ঘুরেছি। আপনি যেভাবে বলতাছেন ওইভাবে মাজারে থাকি নাই।

আলোকিত বাংলাদেশ

Comments are closed.