উদীচীর প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রগতি লেখক সত্যেন সেন (১৯০৭ – ১৯৮১)

উদীচীর প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের সদস্য হিসেবে পরিচিত সাহিত্যিক সত্যেন সেন। তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি বিপ্লবী ও শ্রমিক সংগঠক। সত্যেন সেন ১৯০৭ সালের এ দিনে (২৮ মার্চ)বিক্রমপুর (বর্তমান মুন্সীগঞ্জ) জেলার টঙ্গীবাড়ী উপজেলার সোনারং গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

সত্যেন সেনের ডাক নাম লস্কর। তার বাবা ধরনীমোহন সেন ও মা মৃণালীনি সেন। সত্যেনের কাকা ক্ষিতিমোহন সেন ছিলেন বিশ্বভারতীর উপাচার্য। আরেক কাকা মনোমোহন সেন ছিলেন শিশুসাহিত্যিক। সত্যেন সেন বাড়িতে গৃহশিক্ষকের কাছে ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েন। এরপর স্কুলে ভর্তি হন। ১৯২৪ সালে সোনারং হাই স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাশ করেন। কলকাতার একটি কলেজ থেকে এফএ ও বিএ পাশ করেন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে এমএ শ্রেণীতে ভর্তি হন। বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কারণে ১৯৩১ সালে জেলে থেকে পরীক্ষা দিয়ে বাংলা সাহিত্যে এমএ পাস করেন।

সত্যেন সেন কলেজে পড়াকালে যুক্ত হন বিপ্লবী দল যুগান্তরের সাথে। ছাত্র অবস্থায় ১৯৩১ সালে বহরমপুর জেলে ৩ মাস বন্দি ছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র বিপ্লববাদী আন্দোলনের যুক্ত থাকার অভিযোগে তিনি ১৯৩৩ সালে দ্বিতীয়বার গ্রেফতার হন। এ সময় ৬ বছর জেল হয়। ১৯৩৮ সালে মুক্তি পান এবং শান্তি নিকেতন থেকে তাকে দেওয়া হয় ‘গবেষণা বৃত্তি’। ১৯৪৩ সালের মহাদুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় ‘কৃষক সমিতি’র মাধ্যমে সত্যেনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কৃষক সমিতির নেতা-কর্মীকে নিয়ে দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় কাজ করেন। ১৯৪৬ সালে আইন সভার নির্বাচনে কমিউনিস্ট নেতা ব্রজেন দাস ঢাকা থেকে প্রার্থী হন। ব্রজেনের পক্ষে তিনি নির্বাচনী প্রচারণা চালান। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৪৭ সালে স্বাধীন ভারত সৃষ্টি হওয়া পর্যন্ত সত্যেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

১৯৪৮ সালে তার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করে পাকিস্তান সরকার। ১৯৪৯ সালে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার জন্য তাকে গ্রেফতার করা হয়। দীর্ঘ কারাবাসে তিনি অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হন। ফলে শারীরিক অসুস্থতা ও চোখের অসুখ দেখা দেয়। কারাবাসে অবস্থানকালে সত্যেন মার্কসবাদী-লেনিনবাদী রাজনৈতিক মতাদর্শ ও দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হন। দীর্ঘদিন কারাভোগ শেষে ১৯৫৩ সালে মুক্তি পেয়ে সোনারঙে ফিরে আসেন। ওই সময় প্রতিকূল পরিবেশের কারণে পরিবারের সবাই কলকাতায় পাড়ি জমালেও তিনি দেশে থেকে যুক্ত হন কৃষক আন্দোলনে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করেন।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণে সত্যেন সেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এক পর্যায়ে তার চোখের অসুখ গুরুতর রূপ নেয়। প্রায় অন্ধ হতে চললে কমিউনিস্ট পার্টি তাকে চিকিৎসার জন্য মস্কো পাঠায়। ওখানে বিভিন্ন দেশের বিপ্লবীদের পরিচিত হন এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে অবহিত করেন। মস্কো হাসপাতালে অবস্থানকালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সংবাদ পান। মুক্ত বাংলাদেশে ফিরে আসেন ১৯৭২ সালে।

১৯৬৯ সালে সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত ও শহিদুল্লা কায়সারসহ একঝাঁক তরুণ মিলে উদীচী গঠন করেন। উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ধারা নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্বাধীনতার পর সত্যেন উদীচী পুনর্গঠনের কাজ করেন। সাহিত্য চর্চাও অব্যহত রাখেন। গণমানুষের জন্য জীবন বাস্তবতার গান লিখেন। তার গানের মূল বিষয়বস্তু অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, শোষণমুক্তির জন্য আন্দোলন ও সাম্য-সুন্দর মানুষের পৃথিবী নির্মাণ।

গান রচনার মাধ্যমেই মূলত সত্যেনের লেখালেখি জগতে আসা। পাশাপাশি সুর করা ও গান শেখানোর কাজও করেন। গানের দল গঠন করে শ্রমিকদের এ কবিগান তিনি রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ পরিবেশন করতেন। তার লেখা ১১টি গানের মধ্যে ‘চাষি দে তোর লাল সেলাম, তোর লাল নিশানারে’ গানটি চাষিদের জাতীয় সঙ্গীত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৫৬ সালে বিক্রমপুরের ষোলঘরে কৃষক সমিতির সম্মেলনে প্রথম তারই নেতৃত্বে গানটি গাওয়া হয়। এ ছাড়া গানের মাধ্যমে তিনি বরিশালে মনোরমা বসু মাসিমার ‘মাতৃমন্দিরের’ জন্য তহবিল সংগ্রহ করেন। সত্যেন সেন একজন নির্ভীক সাংবাদিক ছিলেন। প্রথমে দৈনিক মিল্লাত ও পরে দৈনিক সংবাদে সাংবাদিকতা করেন।

সত্যেন সেনের সাহিত্যকর্ম সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার একটি নিদর্শন ও বাংলা সাহিত্যের অনন্য পথিকৃৎ। তার লেখা উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে— ভোরের বিহঙ্গী (১৯৫৯), রুদ্ধদ্বার মুক্ত প্রাণ (১৯৬৩), অভিশপ্ত নগরী (১৯৬৯), পুরুষমেধ (১৯৬৯), সাত নম্বর ওয়ার্ড (১৯৭০), বিদ্রোহী কৈর্বত (১৯৭০), মা (১৯৭০) ও একুল ভাঙ্গে ওকুল গড়ে (১৯৭১)। ইতিহাস আশ্রিত গল্প-উপন্যাস-সাহিত্যের মধ্যে রয়েছে— গ্রামবাংলার পথে পথে (১৯৬৬), আমাদের পৃথিবী (১৯৬৮), মশলার যুদ্ধ (১৯৬৯), অভিযাত্রী (১৯৭০), মনোরমা মাসিমা (১৯৭১), বিপ্লবী রহমান মাস্টার (১৯৭৩) ও সীমান্ত সূর্য আবদুল গাফফার (১৯৭২)। ছোটদের জন্য লেখা বইয়ের মধ্যে পাতাবাহার (১৯৬৮) অন্যতম।

সত্যেন সেন সাহিত্য কীর্তির জন্য অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৯), বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭০) ও সাহিত্য মরণোত্তর একুশে পদক (১৯৮৬)।

ভারতের শান্তি নিকেতনের গুরুপল্লীতে ১৯৮১ সালে ৫ জানুয়ারি সত্যেন সেন মারা যান।

উইকিপিডিয়া।

Comments are closed.