পাউসারের এক মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁর পরিবারের করুণ পরিনতি

মোহাম্মদ মোক্তার হোসেন: ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ পাক হানাদার বাহিণী যখন আমাদের দেশের ঘুমন্ত মা বোন, শিশু সন্তান সহ সকলের উপর নির্মমভাবে ঝাপিয়ে পড়েছিল ঠিক তখনি আমাদের দেশের সূর্য সন্তানরা খালি হাতে পাক হানাদারদের উপর লঘি বৈঠা নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলে মাত্র ৯ মাসে প্রিয় মাতৃভূমিকে শক্রুমুক্ত করেন। সেই সূর্য সন্তানদের মধ্যে একজন হলেন মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার পাউসার গ্রামের শহীদ তানজর আলী মাষ্টার। তিনি ১৯৩৪ সালে পাউসার গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জম্মগ্রহণ করে সেখানেই শৈশব ও কৈশর কাল অতিবাহিত করেন । তিনি ১৯৫৪ সালে স্নাতক পাশ করে স্থানীয় চুড়াইন তারিণী বালা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় নিযুক্ত হন। তিনি ১৯৬৫ সালে সাহিদা বেগমের সহিত বিবাহে আবদ্ধ হন।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশ রক্ষার জন্য এ বীর সেনা পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও ২ বছরের শিশু কন্যার মায়া ত্যাগ করে তিনি নিজেকে দেশ রক্ষার জন্য নিজেকে সমর্পন করেছেন। তিনি ৬ জুন, ১৯৭১ থেকে ৬ জুলাই, ১৯৭১ পর্যন্ত এই ১ মাস যুদ্ধকালীন কমান্ডার মো. নাসির উদ্দিন খানের অধীনে শিবরামপুর ক্যাম্পে সশস্ত্র ট্রেনিং গ্রহণ করেন। তিনি সশস্ত্র ট্রেনিং সফলভাবে শেষ করার পর ২নং সেক্টরে বাকী সময় যুদ্ধ করে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে পাক হানাদার মুক্ত করেন। এই বীরের স্মৃতিচারন করে যুদ্ধকালীন কমান্ডার মো. নাসির উদ্দিন খান বলেন, তানজর আলী মাষ্টার যেমনি শিক্ষকতায় মেধাবীর পরিচয় দিয়েছেন তেমনি রনাঙ্গনে তাহার রণ কৌশল ও সাহস প্রশংসার দাবীদার। তিনি একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তাহার ভেতর ছিল অফুরন্ত দেশ প্রেম।

শহীদ তানজর আলী মাষ্টার

এই বীরের স্মৃতিচারন করে যুদ্ধকালীন কমান্ডার আনসার উদ্দিন হায়দার বলেন, তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে আমার সাথে যুদ্ধ করেছেন। তিনি একজন বীর সেনা ও দেশপ্রেমিক। তাহার যুদ্ধ কৌশল আমাকে মুগ্ধ করেছে। তিনি পাক হানাদারদের জয় করতে পারলেও তাদের দুষরদের নিকট পরাজিত হন। তিনি ২৩জুন, ১৯৭৯ সালে পাকিস্তানের দুষর ও স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন। পাকিস্তানের দুষর ও স্বাধীনতা বিরোধীরা তাহাকে শহীদ করেই ক্ষান্ত হননি তাহার বাড়ী ঘর সহায় সম্পত্তি দখলে নেয় এবং তাহার পুরো পরিবারকে হত্যার চেষ্টা চালায় । অবস্থা বুঝতে পেরে তাহার স্ত্রী সাহিদা বেগম তাহার পিতার বাড়ী সৈয়দপুরে আশ্রয় নেয় সেখানেও হায়নার দল তাদের মেরে ফেলার চক্রান্তে লিপ্ত থাকে। অবস্থার বেগতি দেখে সাহিদা রহমান রাতের বেলায় ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের নিয়ে পালিয়ে ঢাকায় আশ্রয় নেন । সহায় সম্পত্তি হারিয়ে কোন রকমে একটি চাকুরী করে সন্তানদের সু শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলেন।

স্বাধীনতার ৪৪ বছর পেরিয়ে গেলেও দেশ কি স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে ? যেখানে মুক্তিযোদ্ধা প্রকাশ্যে নিহত হন, যেখানে মুক্তিযোদ্ধার সম্পত্তি গ্রাস করে, যেখানে মুক্তিযোদ্ধা ভিক্ষা বৃত্তির পথ বেছে নেয়, যেখানে মুক্তিযোদ্ধা অপমানিত,পদদলিত যেখানে রাজাকারের গাড়ীতে জাতীয় পতাকা উড়ে ? যেখানে রাজাকারের বিরুদ্ধে কিছু বললে প্রকাশ্যে বোমা মারে? আমরা কি আজও স্বাধীন হতে পেরেছি ? এজন্যই কি তানজর আলী মাষ্টাররা জীবন দিয়ে দেশ স্বাধীন করে গেছেন ? স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাসকে ইতিহাসের পাতা থেকে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। জাতি মুক্তির অপেক্ষায় বসে আছে । কখন নিস্পাপ সূর্য উঠবে ? কখন পাখি স¦াধীন ভাবে গান গেয়ে উঠবে? কখন এদেশের শতভাগ লোক দেশ প্রেমিক হবে ? কখন রাজাকারের বংশ ধ্বংস হবে ?

মুন্সীগঞ্জ বার্তা

Comments are closed.