জ্যোতিষরাজ লিটন বাসের হেলপার থেকে কোটিপতি !

তোহুর আহমদ: যার ছিল ছন্নছাড়া জীবন। নুন আনতে পান্তা ফুরাত। তিনিই এখন অঢেল সম্পত্তির মালিক। দিনমজুরি করে যখন সংসার চলত না, তখন তিনি বেছে নেন বাসের হেলপারি। কিন্তু এ কাজ করেও তার স্বস্তি হচ্ছিল না। তখন তিনি ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে বেছে নেন ঝাড়ফুঁক আর কবিরাজির পথ। এর কয়েক বছরের মধ্যে গ্রামের হতদরিদ্র ছেলে লিটন বনে যান খোদ রাজধানীর সেরা জ্যোতিষরাজ। এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। আলাদিনের চেরাগ হাতে পাওয়ার কাহিনীর মতো রাতারাতি পরিণত হন বড় এক ধনকুবের।

হাত দেখে পাথর ধরিয়ে দেয়া হয়। বিনিময়ে হাতিয়ে নেন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। যার হিসাব নিজেও রাখতে পারেন না। তাই চেম্বারে তাকে রাখতে হয়েছে একাধিক কর্মচারী। অথচ এই লিটন দেওয়ানই র‌্যাবের অপরাধ তথ্যভাণ্ডারে (ক্রিমিনাল ডাটাবেজ) একজন পেশাদার প্রতারক। গ্রেফতার হয়ে যিনি প্রতারণার সব তথ্য ফাঁস করে দেন। কিন্তু জেলের ভাত তাকে বেশিদিন খেতে হয়নি। বিচিত্র দেশ। জেলখাটা এ প্রতারকের সঙ্গে ছবি তুলেছেন সমাজের বহু নামিদামি ব্যক্তি। আর গত ৭ বছরে ধরে দিব্যি তিনি বহাল-তবিয়তে হাইপ্রোফাইল চেম্বার খুলে চুটিয়ে প্রতারণার ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

লিটন দেওয়ানের গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার কুকুটিয়া ইউনিয়নের বাগবাড়ি গ্রামে। তার পিতার নাম মৃত আবদুর সাত্তার দেওয়ান। চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। দেশ স্বাধীনের আগে লিটন দেওয়ানের বাবা দেশের বিভিন্ন জেলায় গিয়ে ফেরি করে অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিল বিক্রি করতেন। বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের টানাটানি বেড়ে যায়। বাধ্য হয়ে পেটের তাগিদে লিটন দিনমজুরি শুরু করেন। কিন্তু দ্রুত ধনী হওয়ার জন্য তার মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা ও জিদ কাজ করত। গ্রামের সমবয়সী লোকজনের কাছে তিনি প্রায় তার এমন মনোবাসনার কথা বলতেন।

স্থানীয়রা জানান, বেশি টাকা আয় করার জন্য ১০-১৫ বছর আগে তিনি এলাকা ছেড়ে ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জে গিয়ে গাড়ির গ্যারেজে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচলকারী বিভিন্ন পরিবহনে হেলপার (চালকের সহকারী) হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরিবহন শ্রমিক হিসেবে কাজ করার একপর্যায়ে রাজধানীর পল্টন এলাকায় ফুটপাতে বসা ল্যাংড়া আমিন নামের এক জ্যোতিষের সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে ওঠে। তার নজর পড়ে বিনা পুঁজির এই লোভনীয় ব্যবসার প্রতি। অল্প কিছুদিনের মধ্যে তার কাছ থেকে কিছু কৌশলও রপ্ত করে নেন তিনি। এরপর নিজেই ফুটপাতে বসে পড়েন। নিজেকে জ্যোতিষ শাস্ত্রের গুরু দাবি করে লিটন দেওয়ান পাথর ব্যবসা শুরু করেন।

অবস্থার একটু উন্নতি হলে রাজধানীর পলওয়েল মার্কেটের ৫ম তলায় জ্যোতিষ চর্চার আস্তানা খুলে বসেন। কিন্তু লিটনের হাতে প্রতারিত হওয়ার বিভিন্ন অভিযোগ আসতে থাকলে পলওয়েল মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা তাকে মার্কেট থেকে বের করে দেন। কিন্তু নাছোড়বান্দা লিটন দেওয়ান হাল ছাড়েননি। কাকরাইলের ভূঁইয়া ম্যানশনে খুলে বসেন চেম্বার। সেখানে তিনি একটি কৌশলের আশ্রয় নেন। কিছু বন্ধু-বান্ধব জুটিয়ে তাদের দিয়ে উপকার পাওয়ার গল্প ছড়াতে শুরু করেন। নতুন কোনো কাস্টমার এলেই এ চক্র লিটন দেওয়ানের গুণগান শোনাতেন। এভাবে দ্রুত তার এই প্রতারণা ব্যবসার প্রসার ঘটে। ঝড়ে বক পড়ে, আর ফকিরের কেরামতি বাড়ে এমন সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি উঠে আসেন অভিজাত এক বিপণিবিতানে।

লিটন দেওয়ানের বিষয়ে যুগান্তরের শ্রীনগর (মুন্সীগঞ্জ) প্রতিনিধি আওলাদ হোসেন জানান, ১০-১৫ বছর আগেও লিটন দেওয়ানসহ তার অন্য ভাইয়েরা সবাই দিনমজুর ছিলেন। ঢাকায় গিয়ে নিজেকে বড় মাপের জ্যোতিষ জাহির করার পর গ্রামে তার পিতার কবরকেও পীরের মাজার হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। বর্তমানে তার বড় ভাই শহিদুল ইসলাম পিতার মাজারের খাদেম সেজে তাবিজ-কবচ ও পাথর বিক্রি করেন। অন্য দুই ভাই দুলাল দেওয়ান ও রিপন দেওয়ান রাজধানীতে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের গাড়িচালক পদে চাকরি করেন।

এলাকাবাসী জানান, লিটন দেওয়ান প্রাথমিক স্কুলের গণ্ডিও পার হননি। অবশ্য লিটন দেওয়ান দাবি করেন তিনি স্থানীয় রুসদী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। বিদেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রিও নিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রুসদী প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক ও ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি কাজী আজিজুল হক যুগান্তরকে বলেন, আমি তো ওই স্কুলের শিক্ষক ছিলাম। তিনি আমার ছাত্র ছিলেন বলে মনে পড়ে না। লিটন দেওয়ানের পিতা পীর সাহেব ছিলেন কিনা জানতে চাইলে কাজী আজিজুল হক বলেন, না তিনি কখনই পীর সাহেব ছিলেন না। তার মৃত্যুর পর লিটন দেওয়ান ঢাকা থেকে লোকজন নিয়ে এসে ওরস না কি যেন পালন করে।

এ বিষয়ে এলাকাবাসীর কোনো আগ্রহই নেই। এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তি জিয়াউদ্দীন যুগান্তরকে বলেন, আমি লিটন দেওয়ানকে তো বটেই তার পিতাকেও ঘনিষ্ঠভাবে চিনতাম। তিনি একজন দরিদ্র ও দুস্থ ব্যক্তি ছিলেন। তার ছেলে লিটন দেওয়ান জ্যোতিষগিরি করে প্রচুর অর্থ-বিত্তের মালিক বনে গেছেন। এসব নিয়ে এলাকায় অনেক কথাবার্তা প্রচলিত আছে। শুনেছি লিটন দেওয়ান সম্প্রতি হীরার (ডায়মন্ড) ব্যবসা শুরু করেছেন। এলাকায় অনেকে লিটন দেওয়ানকে প্রতারক ও ভণ্ড বলে জানে।

বিশাল বিত্তবৈভব : সূত্র বলছে, প্রতারণার মাধ্যমে লিটন দেওয়ান বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন। তার সম্পদের খোঁজ করতে গিয়ে বিস্ময়ে হতবাক না হয়ে কারও উপায় নেই। রাজধানীর একটি একটি অভিজাত বিপণিবিতানে তার মালিকানাধীন দোকান রয়েছে অন্তত ১৫টি। এর মধ্যে ৬টি দোকানের ঠিকানা পাওয়া গেছে। এগুলো হল লেভেল-১ এর ডি ব্লকের ৭০, ৭১, ৭৩, ৭৪, ৮৭ ও ১০০ নম্বর দোকান।

এসব দোকানে রয়েছে লিটন দেওয়ানের পাথর, সুগন্ধিসহ নানা ধরনের পণ্যের শোরুম। প্রতিটি দোকানের দাম অন্তত দেড় কোটি টাকা। লিটন দেওয়ান আগে পাজেরো জিপে চলাফেরা করতেন। এখন চড়েন দামি ব্যান্ডের প্রাইভেট কারে। সূত্র বলছে, লিটন দেওয়ান রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২০টি ফ্ল্যাটের মালিক। তবে যুগান্তরের অনুসন্ধানে রাজধানীর ৩, চামেলীবাগে একটি বহুতল অ্যাপার্টমেন্টে লিটনের ৫টি ফ্ল্যাটের সন্ধান পাওয়া গেছে।

বর্তমানে এসব ফ্ল্যাটের প্রতিটির মূল্য অন্তত ৮০ লাখ টাকা। বিশ বছর আগেও ভিটেবাড়ি ছাড়া কোনো সম্পদ না থাকলেও বর্তমানে লিটন দেওয়ান তার পরিবারের সদস্যদের নামে শ্রীনগরে পাঁচ একর কৃষি জমি কিনেছেন। তার পিতার কবরেও বিশাল মাজার কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হয়েছে।

তালিকাভুক্ত অপরাধী : র‌্যাবের অপরাধী তথ্যভাণ্ডারে (ক্রিমিনাল ডাটাবেজ) লিটন দেওয়ানের নাম রয়েছে। তথ্যভাণ্ডারের তথ্য অনুযায়ী লিটন দেওয়ান একজন পেশাদার প্রতারক। তার সম্পর্কে অন্যান্য তথ্য হচ্ছে, লিটন দেওয়ানের উচ্চতা ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি। গায়ের রং ফর্সা, সুশ্রী ও মায়াবী চেহারা। চোখের রং কালো। বর্তমান বয়স (২০০৭ সালে রেকর্ডকৃত) ৪৫ বছর।

র‌্যাবের ডাটাবেজে বলা হয়েছে, লিটন দেওয়ানের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। তবে সময় ও আবহাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলমান রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংগতি রেখে চলেন। তিনি বিবাহিত এবং বাংলা ভাষায় শুধু ভাষা জ্ঞান রয়েছে। ঢাকায় তার ঠিকানা কাকরাইলের ইস্টার্ন পার্ক অ্যাপার্টমেন্ট। তার প্রধান সহযোগীর নাম জাহাঙ্গীর আলম। পিতার নাম আবদুর রাজ্জাক মোল্লা। গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা থানার বারাংকোলা।

আরও দুই সহযোগীর একজন হলেন শামীম। পিতা আলী আজম হাওলাদার। স্থায়ী ঠিকানা বরিশাল জেলার বাখেরগঞ্জ থানার কাশিনা গ্রাম। অপরজনের নাম সারোয়ার। তবে সারোয়ারের সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। র‌্যাবের তথ্যভাণ্ডারে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে লিটন দেওয়ানকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে রমনা থানায় নারী শিশু নির্যাতন দমন আইনে পৃথক দুটি মামলা রয়েছে (মামলা নং ২৯ ও ৩০)।

লিটন দেওয়ানের বক্তব্য : প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ খণ্ডন করে তিনি বলেন, সব সম্পদ নিয়ম অনুযায়ী তার আয়কর ফাইলে প্রদর্শিত। বৈধ ব্যবসা করেই এসব সম্পদ অর্জন করেছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে একাধিক রিপোর্ট প্রকাশিত হলেও তার প্রতি ভক্তদের বিশ্বাস এতটুকুও কমেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়ে তিনি বলেন, জ্যোতিষ শাস্ত্রের সাধনা লেখাপড়া করে হয় না। এটা সাধনার বিষয়। দীর্ঘ সাধনার মাধ্যমে তিনি জ্যোতিষ হিসেবে খ্যাতি ও দক্ষতা অর্জন করেছেন। তার দাবি, কোনোকালেই তিনি পরিবহন শ্রমিক ছিলেন না।

যুগান্তর

Comments are closed.