২৪৮ প্রাথমিক শিক্ষককে পছন্দমাফিক সংযুক্তি!

১২৬ জনই ঢাকায়, তদবির ও লেনদেনের অভিযোগ
নীতিমালা অনুযায়ী সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার বাইরের কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সিটি বা পৌর এলাকার বিদ্যালয়ে বদলি হতে পারবেন না। কিন্তু প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সংযুক্তির নামে দুই দিনেই ২৪৮ জন শিক্ষককে ঢাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরে বদলি করেছে।

এর মধ্যে ১২৬ জনই ঢাকায় সংযুক্ত হয়েছেন। পদ না থাকার পরও এঁদের অনেককে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। অনেককে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা নির্দিষ্ট করে ওই সব এলাকার যেকোনো বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করতে বলা হয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বিভিন্ন স্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী অভিযোগ করে প্রথম আলোকে বলেন, মূলত তদবির ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সংযুক্তির নামে বেশির ভাগ বদলি হয়েছে। মন্ত্রণালয় গত ১১ ও ১২ মার্চ গোপনে এ কাজটি করে। এটা প্রকাশ পেতে থাকায় শিক্ষকদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি যেন সবাই না জানতে পারে, সে জন্য সংযুক্তির আদেশটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও রাখা হয়নি।

এ বিষয়ে প্রবীণ প্রাথমিক শিক্ষক নেতা ও প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার সুরক্ষা ফোরামের আহ্বায়ক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ঢালাও সংযুক্তি কোনোভাবেই সঠিক হয়নি। বিশেষ অসুবিধার কারণে কোনো কোনো শিক্ষকের সংযুক্তি মানা যায়। কিন্তু একসঙ্গে এত সংযুক্তি বিদ্যালয়গুলোতে একধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান সংযুক্তিতে অনিয়ম ও লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করে প্রথম আলোকে বলেন, একসঙ্গে এতগুলো সংযুক্তি হওয়ার কারণেই এমন কথাবার্তা উঠেছে। সংযুক্তি আগেও হয়েছে। তবে সংযুক্তির জন্য তদবির হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে মন্ত্রী বলেন, হয়তো ১০ হাজার আবেদন জমা পড়েছে, সেখান থেকে কিছু সংযুক্ত করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

এ রকম পরিস্থিতিতে মন্ত্রণালয়ের হাতে বদলির ‘অসীম’ ক্ষমতা রেখে বদলির আগের নীতিমালা সংশোধন করে ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলি নীতিমালা, ২০১৫’ জারি করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। নীতিমালা অনুযায়ী প্রশাসনিক কারণে মন্ত্রণালয় যেকোনো শিক্ষককে যেকোনো সময় যেকোনো বিদ্যালয়ে সংযুক্তি করতে পারবে। শুধু তা-ই নয়, সংযুক্তির মেয়াদ এক বছর হলেও নতুন নীতিমালা বলা হয়েছে, ‘বিশেষ প্রয়োজনে’ এ মেয়াদ বৃদ্ধি করা যেতে পারে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, ১২ মার্চের সইয়ে নীতিমালাটি জারি করা হয়। কিন্তু এর ঠিক এক দিন আগে এক আদেশেই মন্ত্রণালয় ২২৫ জন শিক্ষককে তাঁদের সুবিধামতো জায়গায় সংযুক্তির আদেশ জারি করেছে। এর মধ্যে ১০৬ জনকে ঢাকায় সংযুক্ত করা হয়েছে। বাকিদের গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, রাজশাহী, রংপুর সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এলাকাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে সংযুক্ত করা হয়। এর এক দিন পর আরও ২৩ জনকে সংযুক্তি করে আদেশ জারি করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে ২০ জনকেই ঢাকায় সংযুক্ত করা হয়েছে। এঁদের মধ্যে অনেককে সরাসরি বিভিন্ন বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। কাউকে কাউকে তাঁদের সুবিধামতো বিভিন্ন এলাকায় বদলি করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বেশির ভাগ বিদ্যালয়ে পদ না থাকার পরও সংযুক্ত করা হয়েছে।

১১ মার্চের এক আদেশে কেরানীগঞ্জের ফিরোজা পারভীনকে ঢাকার মতিঝিল আইডিয়াল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। অথচ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই বিদ্যালয়ে এই মুহূর্তে কোনো পদ ফাঁকা নেই। আবার একই আদেশে নওগাঁ জেলার রানীনগরের এনায়েতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা মোছা. জান্নাতুল ফেরদৌসিকে ঢাকা মহানগরের যেকোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।

ওই আদেশের ১৪ নম্বর ক্রমিকে মুন্সিগঞ্জ টঙ্গিবাড়ীর নিতিরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কমলা আক্তারকে রাজধানীর খিলগাঁও গভ. কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। কাউকে কাউকে আবার শুধু থানার নাম নির্দিষ্ট করে ওই সব থানার অধীন কোনো বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করতে বলা হয়েছে।

জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে গবেষণা করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, গ্রামের বিদ্যালয়গুলোতে এমনিতেই শিক্ষকের স্বল্পতা রয়েছে। এ অবস্থায় তাঁদের পদ না থাকলেও ঢাকায় আনার কারণে গ্রামের বিদ্যালয়গুলোতে সমস্যা বাড়বে। তিনি আরও বলেন, একটি সমতাভিত্তিক নীতিমালার ভিত্তিতে এসব বদলি করা উচিত।

সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের বদলির নতুন নীতিমালায় অধিকাংশ নিয়মকানুন আগের মতো রাখা হলেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এত দিন পদ না থাকায় পৌরসভা, জেলা সদর ও সিটি করপোরেশন এলাকায় স্থায়ী ঠিকানা হলেও অনেককে বাইরে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা এখন নিজের স্থায়ী ঠিকানায় ফিরে আসার সুযোগ পাবেন।

প্রথম আলো

Comments are closed.